kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।

‘নিজেদের পাপ হইতে’

মাকিদ হায়দার

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আজকাল নিষ্কাম কর্মযোগী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, এমনকি দ্বিধাহীন অনুভূতির রাজনীতিবিদকে। আমাদের সেকালের পূর্ব বাংলায় এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে একদা যাঁরা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁরা ছিলেন নির্লোভ রাজনীতিবিদ। সেই সময়ে যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন কর্মযোগী।

সেই কর্মযোগীদের কাল ঊনবিংশ কিংবা বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের আগ পর্যন্ত নির্ণয় করা যায়। তাহলে আমরা সেখানে লক্ষ করি, নির্লোভেরা সগর্বে দাঁড়িয়ে আছেন, নেই ক্ষমতালিপ্সুদের কেউ। যাঁরা ছিলেন তাঁরা সবার চিন্তা ছিল ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশমাতৃকাকে উদ্ধার করা যায় কিভাবে। সেই চিন্তাই পেয়ে বসেছিল এক যুবককে। যিনি ছিলেন জাতিগতভাবে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের। ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুরের অধিবাসী। ১৭৮৫ সালে এক ব্রিটিশ সাহেবকে হত্যা করেছিলেন, নিজ হাতে তৈরি বাটুল বা গুলতির এঁটেল মাটির তৈরি গুলি দিয়ে।

ইংরেজদের অন্যায়-অবিচারের প্রথম প্রতিরোধ এবং প্রতিশোধ যে যুবকটি গ্রহণ করেছিলেন তাঁর নাম ছিল তিলকা মালি। মাত্র একটি মাটির তৈরি গুলি যেভাবে তিলকা মালি ইংরেজ অত্যাচারী স্কভল্যান্ডের মাথায় লক্ষ্য স্থির করে মেরেছিলেন, সেই ঘায়েই নিহত হয়েছিলেন ভাগলপুরের সেই ইংরেজ পুঙ্গব।

ইতিমধ্যে অষ্টাদশ, ঊনবিংশ, বিংশ পেরিয়ে একবিংশে এসে আমরা দেখতে পাই, অত্যাচারীর অত্যাচার চিরস্থায়ী হয় না। গত শতাব্দীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা যেভাবে অন্যায়-অত্যাচার করেছিল, সেটি অভাবনীয়। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে আমরা স্বাধীন জাতি হলেও মননে-মানসে এখনো সেই স্কভল্যান্ডের চরিত্রেরই ধারাবাহিকতায় জোর করে জমি দখল, কারো কন্যা অপহরণ এবং জাতির ভোট কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের সময় নিজ স্বার্থকে যতটা প্রাধান্য দিয়ে থাকি এবং আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় নিজ দলের ক্যাডারদের অন্যপক্ষের চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর অথবা মেয়র কিংবা মেম্বার—সবাই যখন চেয়ারলোভী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে, নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী কিংবা তাঁদের দলের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা উচ্চলয়ে তাঁর (চেয়ারম্যানের) জয়গান শুরু করেন, তখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তই থাকে। যখনই আবার চেয়ারম্যান সম্পর্কে বলেন, হামিদ আলীর (ছদ্মনাম) বাবা ছিল শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, চাচা ছিল রাজাকারের কমান্ডার। আমাদের দোহারপাড়ার টেংরা মিয়া, কোরবান আলীকে সঙ্গে নিয়ে পাবনা বাজারে যাওয়ার নাম করে সাইকেলের হ্যান্ডেলে পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ লাগিয়ে পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ বলতে বলতে কেন সেদিন পাবনা শহরের পশ্চিমে নূরপুরে পাকিস্তান আর্মির ক্যাম্পে গিয়ে খবর দিয়েছিল, দেখেছি ইউনিয়নে এখনো শত শত হিন্দু আছে, যারা সোনার পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু, ওদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে হবে, করতে হবে হত্যা। সেই সাইকেলের মাথায় পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ দেখেই পাঞ্জাবি মেজর বুঝতে পেরেছিলেন টেংরা মিয়া, কোরবান আলী খাঁটি পাকিস্তানি। তক্ষুনি ওই দুই খবরদাতাকে জিপে তুলে একদল পাকিস্তানি আর্মি নিয়ে গিয়েছিল চৌগাছার হিন্দু মহল্লায়। পাকিস্তানি আর্মিরা হিন্দু কিংবা আওয়ামী লীগারদের বাড়িঘর কিছুই চিনত না, চিনিয়ে দিয়েছিল ওই দুই রাজাকার। ওই দুজনই বেঁচে আছে। বয়সের ভারে বাড়ির বাইরে বের হয় না, হলেই তাদের গায়ে থুথু ছিটিয়ে দেয় দোহারপাড়ার অনেকেই।

আজ ওই দুজনের আশীর্বাদ নিয়ে চেয়ারম্যান পদে হামিদ আলী দাঁড়িয়েছে ভোটে। প্রথম পক্ষের চেয়ারম্যানের সাঙ্গাত থামতে না থামতেই শুরু হলো, শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষণ। মাঝামাঝি পর্যায়ে হাতাহাতি, মারামারি। সেই মারামারি শেষ হতে না হতেই নিহত হলেন প্রথম পক্ষের চেয়ারম্যান মহোদয়ের নিরীহ ভাগ্নে, যিনি কি না কোনো দলকেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কোনো দিনই সমর্থন করেননি। সবুর আহমদ কর্মজীবনে ছিলেন দোগাছি ইউনিয়নের কালীদহ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁকে আজ দুই পক্ষের রেষারেষির মাঝখানে পড়ে প্রাণ দিতে হলো স্কুলে যাওয়ার পথে।

কেউ কেউ বললেন, একটি লাশের প্রয়োজন ছিল, যা পাওয়া গেল ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হামিদ আলীর পরিবার থেকে। মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল দোহারপাড়ার সঙ্গে আরিফপুরের খণ্ডযুদ্ধ। আরিফপুরের রাজাকার শিরোমণি আলিমুদ্দি আকন্দ তীর, ধনুক, বাটুল কিংবা গাদা বন্দুক না এনে, সঙ্গে আনলেন পৃথিবী বিখ্যাত পিস্তল, রিভলবার। পুলিশ এলো এবং তারা স্বচক্ষেই দেখল আকন্দের হাতে বিদেশি অস্ত্র। হাতে হাতে গ্রেপ্তারও হলেন। তবে পুলিশকে কেউ কেউ জানালেন, আমাদের আলিমুদ্দি ভাই, সরদার সাহেবের ঘরজামাই, এম এ পাশা ঠিকাদারি করেন এবং তিনি স্থানীয় অমুক লীগের সাবেক সভাপতি। বর্তমানে ... তবে আকন্দ ভাই আকাশের দিকে গুলি চালিয়েছেন। পুলিশের সাহেবরা সে কথায় কান না দিয়ে আলিমুদ্দি আকন্দের হাতে হাতকড়া এবং কোমরে ফিলিপিনো সাদা দড়ি দিয়ে [ম্যানিলা রোপ নামে পরিচিত] টেনে তুললেন গাড়িতে।

স্থানীয় সাংবাদিক, টিভি চ্যানেলগুলো ভীষণ তৎপর। যেহেতু তারা তৎপর, সেহেতু টিভি দর্শকরা স্বল্পক্ষণের ভেতরেই দেখতে পারেন দোহারপাড়ার হামিদ আলী দোগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর জনগণকেই অন্যপক্ষের রিভলবারের গুলিতে কিংবা ছুরিকাঘাতে পৃথিবী থেকে তাড়িয়ে দিল, আরিফপুরের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি গ্রামে আত্মীয়স্বজনের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে শুনলাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের চারিত্রিক গুণাগুণের যাবতীয় দুঃখকথা। চেয়ারম্যান প্রার্থীর আগের ইতিহাস—গম চোর, শিশু অপহরণকারী, গরুর দালাল আর চোরাকারবার করে কয়েক কোটি টাকার মালিক। তবে বকলম নন, কোনো রকমে নাম লিখতে পারেন। আরেক প্রার্থীর নাম শুনলাম, মি. ব্রেকার। ভেবেছিলাম হবেন তিনি খ্রিস্টান, তিনি খ্রিস্টান নন, মুসলিম। সেই ব্রেকার সাহেবের বিপক্ষের লোকই জানালেন, আমাদের ঈশ্বরদী ইউনিয়নের সবাই জানেন, বর্তমান চেয়ারম্যান রোকোনালী শেখ, স্বাধীনতার পর থেকে বেশ কয়েক বছর ট্রেনের মালগাড়ির ওয়াগন ভেঙে গম লুট করেছেন। মানুষের খাট-পালঙ্ক—এমনকি মোটরসাইকেল, লেপ, তোশক, লুট করেছে। সেই থেকে রোকোনালীর নাম হয়েছে মি. ব্রেকার। আজ সেই ব্রেকার যদি ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েই যান, তাহলে আমাদের ঈশ্বরদী ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ওই সব লোক তো রাজনীতিবিদ নন। এই ঈশ্বরদীতেই বিশিষ্ট রাজনীতিক ছিলেন ভাসানী ন্যাপের মোশাররফ ভাই। অন্যান্যের মধ্যে জসিম মণ্ডল ভাই। এঁদের নামে আজ পর্যন্ত কেউ কু-শব্দ ব্যবহার করতে পারেনি। কেননা তাঁরা সত্যিকারের লোভহীন রাজনীতিবিদ।

ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে পড়ল, সেই সাঁওতাল যুবক তিলকা মালিকার কথা। নিশ্চয়ই তাঁর সময়ে রাজনীতির গোড়াপত্তন হয়নি ভারতবর্ষে। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মোটেই ভয় পাননি তিলকা মালি। আর আজকাল আমাদের সমাজে তিনিই গ্রহণীয়, যিনি অন্যায় করেন এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, সঙ্গে খুন-খারাবি করতে একটুও সময় লাগে না। তাঁরাই হন সমাজের প্রতিনিধি, হন মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান, মেম্বার। লক্ষ্য তাঁদের একটাই—ভোটে দাঁড়ানোর জন্য যে অর্থ খরচ করেছি, যদি জিতে যাই তুলতে হবে তার পাঁচ গুণ। নির্লোভ রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক আর্থার জোনাথন হাওয়ার এক শ পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর আগেই লিখেছিলেন—‘সহমর্মিতাই হলো সব নৈতিকতার ভিত্তি। ’ অন্যদিকে আরেক দার্শনিক ব্রিটিশ নাগরিক বার্ট্রান্ড রাসেল [১৮৭২-১৯৭০] বলেছিলেন, ‘বাস্তবে দুই ধরনের নৈতিকতা আছে, একটি আমরা প্রকাশ করি, আর অন্যটি আমরা চর্চা করি; কিন্তু কদাচিৎই বলি। ’ এই দুই মনীষীর ভাষ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে নৈতিকতাই মানুষের সহমর্মিতার একমাত্র ভিত্তি।

আমাদের সব রাজনীতিবিদের জন্য সব শেষে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তির উদ্ধৃতি না দিয়ে পারলাম না।

স্বদেশ উদ্ধার।

‘স্বদেশকে উদ্ধার করিতে হইবে, কিন্তু কাহার হাত হইতে?

নিজেদের পাপ হইতে। ’

লেখক : কবি


মন্তব্য