kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে আপস হয় না

ড. মোহাম্মদ সেলিম

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে আপস হয় না

২৬ মার্চ, ১৯৭১। বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় একটি দিন।

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে এমন দিন আর আসেনি। নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালি রণাঙ্গনের সশস্ত্র যোদ্ধায় পরিণত হলো। এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান, যারা পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল তারাই ধীরে ধীরে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করে। ভাষার প্রশ্নে যে বিরোধ, তা একসময় চূড়ান্ত বিভক্তি এনে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সরদার ফজলুল করিম তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের মার্চ, এই কয়েক মাসেই পাকিস্তান সম্পর্কে মোহমুক্তি হয়ে গেল। ’

দ্বিজাতিতত্ত্বের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের স্থলে ভাষা-সংস্কৃতিনির্ভর অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ঘটে। এটা দুর্ঘটনা নয়। বরং বাঙালির আবহমানকালের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্তর্গত। কারণ সাম্প্রদায়িক বাঙালির নজির ইতিহাসে নেই।

প্রাচীন বাংলার খ্যাতিমান গবেষক নীহাররঞ্জন রায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ দেখতে পাননি। তিনি লিখেছেন, ‘বরং এক সাম্প্রদায়িক ধর্মের সঙ্গে আর এক ধর্মের একটা নিরুক্ত অথচ গভীর সহৃদয় চেতনা বোধ এই পর্বে বেশ সক্রিয় ছিল। ’ ধর্মবিশ্বাস মানুষে মানুষে বৈরিতার জন্ম দেয়নি। কেউ দূরেও চলে যায়নি। রাজা বা রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মমতকে দমনের চেষ্টা করেনি। নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন, ‘রাজা বা রাজবংশের ব্যক্তিগত ধর্ম যাহাই হউক না কেন, তাহাতে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের নীতি, আদর্শ ও সংস্থার কোনও পরিবর্তন ঘটে নাই; জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও রাজার বা রাজবংশের ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয় নাই। ’ পরবর্তী সময়ে বাংলায় মুসলমান শাসকরা ধর্মীয় বিষয়ে প্রাচীন যুগের ধারা অব্যাহত রাখেন। সুলতানি আমলে এক ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ করা হয়। মূলত ধর্মকে বিভেদ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল ইংরেজরা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক শক্তি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধের বীজ বপন করেছিল। এই বিষবৃক্ষের ফল পাকিস্তান। অনাদিকাল ধরে বাঙালির রক্তে মিশে আছে উদার, অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তারা পাকিস্তান দাবি সমর্থন করেছিল অর্থনৈতিক মুক্তির প্রত্যাশায়।

স্বাভাবিক কারণে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের আজাদির দিনের বর্ণনা দিয়েছেন ২২ বছরের তরুণ মুসলিম লীগ কর্মী তাজউদ্দীন আহমদ এভাবে, ‘সাড়ে ৩টা নাগাদ শোভাযাত্রা শুরু হল... অনেক লোক এসেছে গ্রাম থেকে। পরিবেশ খুবই পীড়াদায়ক। ব্যবস্থাপনা বাজে। ’ কোনো রকমের আবেগ-উচ্ছ্বাসের ছিটেফোঁটা নেই। মনে হয় একজন দূরবর্তী দর্শকের নির্মোহ বিবরণ। বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ছিল আরো সুস্পষ্ট ও বৈপ্লবিক। স্বাধীনতার পর সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে কলকাতা থেকে বিশিষ্ট সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়সহ অনেকে ঢাকায় আসেন। সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলাপচারিতার বিষয়টি অন্নদাশঙ্কর তাঁর ‘ইন্দ্রাপাত’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবকে আমরা প্রশ্ন করি, বাংলাদেশের আইডিয়া প্রথম কবে আপনার মাথায় এলো?’

‘শুনবেন?’ তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে। ...তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নিই। কিন্তু আমার স্বপ্ন সোনার বাংলা। সে স্বপ্ন কেমন করে পূর্ণ হবে এই আমার চিন্তা। ...ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। ...আসলে ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি। জয় বাংলা বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলুম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয়, যা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে। ’

সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক হওয়া সহজসাধ্য নয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ জীবনচর্চায় থাকা বাঞ্ছনীয়। একটা রাজনৈতিক অভিব্যক্তিসহ সুনির্দিষ্টভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটে ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। যার চূড়ান্ত পরিণতি মুক্তিযুদ্ধ। আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মূর্ত প্রকাশ হলো ১৯৭২ সালের সংবিধানে গৃহীত রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে কিন্তু তাদের এ দেশীয় সশস্ত্র বাহিনীগুলো রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপতত্পরতা অব্যাহত রাখে। স্বাধীনতাবিরোধীরা পরাজয় মেনে নেয়নি। বরং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ পুনরুদ্ধারের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধিতাকারী রাষ্ট্রগুলো বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বিশেষভাবে সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণের কারণে পুঁজিবাদী ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর কাছে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়।

দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশে এখনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাজনীতি করছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছে তারা কোনো অবস্থায়ই স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৫ বছর হলো। দুটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে স্বাধীন দেশের আলো-বাতাসে, নতুন প্রজন্মই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে ২৫-৫৪ বছর বয়সী জনসংখ্যার হার মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছিল এই প্রজন্ম। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে ওরা আপস করবে না। তরুণ প্রজন্মের দেশপ্রেম, নিষ্ঠা, ত্যাগ বাংলাদেশকে জাতির জনকের প্রতিশ্রুত আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


মন্তব্য