kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল

ইকরামউজ্জমান

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ফুটবল খেলোয়াড়দের অসাধারণ ভূমিকা ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। আর কোনো দেশে স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ফুটবল খেলোয়াড়রা একটি পর্যায়ে তাঁদের অস্ত্র জমা রেখে ফুটবলের মাধ্যমে নতুন আরেকটি ‘ফ্রন্ট’ খুলে স্বাধীনতার সপক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা এবং সমর্থন লাভের জন্য এ ধরনের ভূমিকা রেখেছেন, তার নজির নেই! আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে ফুটবল ছিল আরেকটি শক্তিশালী ‘হাতিয়ার’। মুক্তিযোদ্ধা ফুটবলাররা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। ক্রীড়াঙ্গনের শ্রেষ্ঠ সন্তান। বাঙালির জীবনে সশ্রস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চির অম্লান।

‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুটবল খেলেছে ভারতের পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থান ছাড়াও বিহার, বেনারস ও মুম্বাইয়ে। কৃতী ফুটবলার মো. জাকারিয়া পিন্টু ছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক। কোচ ও ম্যানেজার ছিলেন যথাক্রমে ননি বসাক ও তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না। মোট ১৬টি প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নিয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ৯টি জয়, ৪টি পরাজয় এবং ৩টি খেলা ড্র করেছে। ম্যাচ খেলা থেকে অর্জিত পাঁচ লাখ ভারতীয় রুপি জমা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে।

দেশের জন্য খেলোয়াড়রা সব সময় খেলেন, খেলবেন; কিন্তু বাঙালি খেলোয়াড়রা আর কখনো স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার শপথ নিয়ে খেলার সুযোগ পাবেন না। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা অনন্য গৌরবের অধিকারী।

পরিতাপের বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের ভূমিকা ক্রমেই পর্দার অন্তরালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। এটা কাম্য নয়। জাতির উচিত ক্রীড়াঙ্গনের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথাযথ সময়ে সম্মানিত করা।

খেলার মাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে যেভাবে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন, এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপমহাদেশে একসময় রাজনীতিবিদরা যা পারেননি, তা পেরেছে মাঠের ফুটবল। একটি চিহ্নিত সময়ে ফুটবল শুধু ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেনি, পরাধীন ভারতে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সাহস, জড়তা ভঙ্গ এবং জাতীয়তাবাদ জন্ম দিয়েছে।

কলকাতা মোহন বাগান ১৯১১ সালে প্রথম স্থানীয় দল হিসেবে আইএফএ শিল্ড জয় করে। ত্রিশের দশকে স্থানীয় দল হিসেবে কলকাতার ফুটবল লিগে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। এই বিজয় ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাস বেগবান করেছে স্বাধীনতাসংগ্রামে। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন আইলিংটন করেনথিয়ান এফসি ক্লাবকে ১-০ গোলে পরাজিত করেছে ‘ঢাকা স্পোর্টিং’। দলের ১১ জন খেলোয়াড় ছিলেন আমাদের পূর্ব বাংলার। ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর ২৪ বছর লড়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ফুটবলার, কয়েকজন ক্রীড়া সংগঠক, আমলা, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী বৈষম্য আর অবিচারের বিরুদ্ধে। ভূমিকা রেখেছেন স্বাধিকার আন্দোলনে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধিতে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার ভিত্তি হচ্ছে এই চেতনা, তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সর্বশেষে ১৯৭১ সালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ গঠন এবং স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল খেলোয়াড়রা।

প্রবাসী সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৩ জুন গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’। সমিতির প্রথম প্রেসিডেন্ট ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে এমপি শামসুল হক ও লুত্ফর রহমান। একপর্যায়ে শামসুল হক সাহেবের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আশরাফ আলী চৌধুরী। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির দায়িত্ব ছিল সাংগঠনিক তত্পরতার মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত ফুটবল খেলোয়াড়দের একত্রিত করে একটি দল গঠন করে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করা। স্বাধীন বাংলা বেতার এবং আকাশ বাণী থেকে খেলোয়াড়দের রিপোর্ট করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এ সময় আলী ইমাম, সাইদুর রহমান প্যাটেল ও প্রতাপ শঙ্কর হাজরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ এবং তাদের কলকাতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’ গঠনকে স্বাগত জানিয়ে বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ লিখেছিল—‘আর এক মুজিব বাহিনী’।

১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে স্থানীয় দলের সঙ্গে প্রথম ফুটবল ম্যাচে অংশ নেয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। এই ম্যাচের সময় মাঠে ভারতের পাশাপাশি স্বাধীন দেশের জন্য সংগ্রামরত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভারত তখনো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। স্বীকৃতি না পাওয়া একটি দেশের এভাবে জাতীয় সংগীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা ছিল এক অভাবিত ঘটনা।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে ফুটবল খেলোয়াড়দের ভূমিকা সব সময়ই স্মরণীয়। ২৪ জুলাই ১৯৭১ আমাদের ক্রীড়া ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আমরা এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘জাতীয় ক্রীড়া দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে বেশ কয়েকবার আবেদন জানিয়েছি। আশা করছি, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার ফুটবল বীরদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২৪ জুলাই ‘জাতীয় ক্রীড়া দিবস’ ঘোষণা করবে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


মন্তব্য