kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।

আলোকের এই ঝরনাধারায়

আলোর পথে যাত্রা!

আলী যাকের

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আলোর পথে যাত্রা!

৩ মার্চ ১৯৭১। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন এক অসহযোগ আন্দোলনের। সেই আন্দোলনে আমরা দেখতে পাই যে বাংলাদেশ যেন সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন হয়ে গেল। একটা সমান্তরাল সরকার চলতে লাগল তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং তা চলতে লাগল বঙ্গবন্ধুর হুকুমে। অফিস-আদালত, কল-কারখানা, এমনকি ব্যাংকের কার্যক্রমও বঙ্গবন্ধুর দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী চলতে থাকে। এই সময় পাকিস্তানিরা এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সংলাপের ইচ্ছা প্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধু যদি বুঝতেও পারতেন যে এই সংলাপটি হচ্ছে সময়ক্ষেপণের একটি পথ, তবু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিশাল হৃদয়ের এই মানুষটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন শান্তিপূর্ণভাবে সব বিরোধের নিষ্পত্তি করতে। সংলাপ চলাকালীন আমরা সবাই প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিন সংলাপস্থলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতাম। আশা, আমরা হয়তো স্বাধীনতার পথে এক ধাপ অগ্রসর হব। এ সময় তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সর্বদাই ছিলেন তাঁর দুই পাশে। সংলাপটি হতো বর্তমানে যেটি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা নামে পরিচিত, সেই বাড়িটিতে।

দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে। বাঙালি অবলীলায় প্রাণ দিচ্ছে। সংলাপের নামে চলছে এক প্রহসন। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করলেন যে পাকিস্তানিরা সহজে কোনো বোঝাপড়ায় আসবে না। ওদিকে ছাত্র-জনতার রুদ্ররোষ বেড়েই চলেছে। মার্চের প্রথম থেকেই বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিসন্ধ্যায় নানা রকম দেশাত্মবোধক সংগীত, নৃত্য ও নাটকের অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছে। আমরা পাঁচ-ছয় বন্ধু তখন শহীদ মিনারের ঠিক উল্টোদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ের নিচতলায় একটি ঘরে সন্ধ্যাবেলায় সমবেত হতাম, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উত্তেজিত কথাবার্তা হতো। সারা বাংলাদেশে যখন স্বাধীনতার দাবিতে এক চরম উত্তেজনা বিদ্যমান, লোকের মুখে মুখে যখন স্লোগান চলছে, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, তখন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ অপরাহ্নে বঙ্গবন্ধু তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে হাজির হলেন। বঙ্গবন্ধু এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। আমাদের মধ্যে অনেক বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী তরুণের ধারণা ছিল যে শেখ মুজিব শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের সঙ্গে আপসরফা করবেন এবং সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলবেন না। তাদের এই শঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত করে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে, আমার জানামতে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ওই বক্তৃতা একটি শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হবে। আমরা বাক্যহীন হয়ে পড়লাম। কয়েক মুহূর্তমাত্র...। রেসকোর্সের সব মানুষ ফেটে পড়ল স্লোগানে, স্লোগানে। আমরা বাতাসে স্বাধীনতার গন্ধ পেলাম যেন।

৭ মার্চের ভাষণ আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে দিল। বঙ্গবন্ধু তো স্পষ্টতই বলে দিলেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। ’ এসবই সম্মুখ সমরের আহ্বান ছাড়া আর কী? কিন্তু তখনো বঙ্গবন্ধু হাল ছাড়েননি। তিনি ভেবেছিলেন, যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ছয় দফার ভিত্তিতে একটা সমঝোতায় পৌঁছানো যায়, তাহলে হয়তো রক্তক্ষরণ ঠেকানো যাবে। তিনি জানতেন যে এতে আমাদের বিস্তর মানুষ মারা পড়বে, নারীদের সম্মানহানি হবে এবং সম্পত্তি বিনষ্ট হবে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন এবং সেই কারণেই অতি সাবধানে তিনি সামনে এগোতে চেয়েছিলেন। তিনি সম্মান করতেন মহাত্মা গান্ধীকে, টমাস জাফারসনকে। অতএব, শান্তির পথে স্বাধিকার অর্জনই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

প্রসঙ্গত, একটি কথা আমার বারবার মনে আসছে। আমরা আসলেই পাকিস্তানিদের মন-মানসিকতা জানতাম না। পাকিস্তানি সামন্তবাদী সমাজ স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। সামন্ত প্রভুরা সাধারণ মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করত না। অথচ বাংলাদেশের সমাজে একজন মানুষ যত ওপরেই উঠুক না কেন, তার শরীরের ত্বক ঘষলেই ভেতর থেকে বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ বেরিয়ে আসে। অথচ এই বিভাজিত দুই জাতি কী করে একটি দেশের অন্তর্গত হলো, শুধু একটি ধর্মের ভিত্তিতে! সেটি বুঝতে এখনো আমি অপারগ। পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নাহ সাহেব সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে বাস করতেন। তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল বিলেতি সাহেব-সুবোদের সঙ্গে অথবা ভারতীয় জমিদার নন্দনদের সঙ্গে এবং সহজেই সমাদৃত হয়েছিলেন অবাঙালি আশরাফ শ্রেণির মুসলমানদের দ্বারা। কিন্তু বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ জিন্নাহর মন-মানসিকতা কখনোই বুঝত না। তাদের বাংলাদেশের মুসলমান সামন্ত প্রভুরা বুঝিয়েছিল যে তোমরা যদি পাকিস্তানের পক্ষে ভোট প্রদান কর, তাহলে হিন্দু জমিদাররা এই ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হবে, ফলে তোমরা সবাই জমিদার হয়ে যাবে। অতএব, গণভোট যখন এলো, তারা দল বেঁধে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিল। এর পরপরই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট আমরা পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেলাম। ১৯৪৮ সালেই আপামর সাধারণ বাঙালি মুসলমান আবিষ্কার করল যে পাকিস্তানে তাদের ভাগ্যোন্নয়ন তো হয়ইনি বরং তাদের আজন্ম লালিত সংস্কৃতিকে পাকিস্তানিরা কেড়ে নিতে চাইছে। ভাষার ওপর আক্রমণ দিয়ে এই দুরভিসন্ধির সূচনা। আমরা কয়েকজন বন্ধু, যারা যেমন আগেই বলেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কক্ষে মিলিত হতাম, তত দিনে আমরা সবাই বুঝে গেছি যে পাকিস্তানিরা সহজে আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবে না। ওদের কাছ থেকে স্বাধীন হতে হলে একটি যুদ্ধ অনিবার্য।

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে চলল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অসহযোগ তখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সব পরিবহনব্যবস্থা অনিয়মিত হয়ে পড়ল। এমনি এক দিনে ওয়াহিদ ভাই, প্রয়াত রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হক, আমাদের বললেন যে সন্্জীদা আপা আটকে পড়েছেন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। তিনি তখন সেখানকার অধ্যাপক। যেহেতু পরিবহনব্যবস্থার এই অবস্থা, আমরা ঠিক করলাম যে আমার ওই আধভাঙা গাড়ি নিয়েই রংপুর যাব। আমরা তিন বন্ধু, ওয়াহিদ ভাই ও আমি রংপুরের উদ্দেশে রওনা হলাম। রাস্তাঘাট সুনসান ছিল। ফলে আরিচা থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত ফেরি থাকা সত্ত্বেও নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাওয়া গেল। সেখানে সন্্জীদা আপা এক তরুণ দম্পতির সঙ্গে থাকতেন। তাঁকে প্রস্তুত হতে বলে আমরা দিনাজপুরে রওনা হলাম। বুদ্ধিটা ওয়াহিদ ভাইয়েরই ছিল। এত দূর যখন এসেছি, কান্তজিওর মন্দির আর রামসাগর—ঐতিহাসিক নিদর্শন দুটি দেখে যাওয়া যাক। এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। আমরা দিনাজপুরের পথে চা খাওয়ার জন্য একটি পথের ধারের ছোট্ট চায়ের দোকানে গাড়ি থামালাম। তখন সন্ধ্যা। মোটা কাচের চশমা পরা এক বৃদ্ধ একা বসে চা খাচ্ছিলেন। আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন কি না? আমাদের এই প্রশ্ন শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তাঁর নিজস্ব রংপুরের ভাষায় বললেন, ‘দিয়েছি বৈকি। ’ আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কাকে ভোট দিয়েছেন? তিনি বললেন, ‘কেন? শেখের ব্যাটাকে। ’ জিজ্ঞেস করলাম, কেন শেখকে ভোট দিলেন? বললেন, ‘তাহলে শুনুন, শেখ যাবে এখান দিয়ে, আমরা সবাই রাস্তার দুই ধারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, শেখের গাড়ির বহর আসছে। শেখের গাড়ি এসে ঠিক আমার সামনে থেমে গেল। গাড়ি থেকে নামল শেখ মুজিবুর। আর কোনো দিকে না তাকিয়ে আমার কাছে এসে আমার দুই হাত ধরে বলল, বাবা, আমাকে একটু দেখবেন। তারপর ভোটের দিনে আমি ১০ গ্রামের মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে এসে শেখের পক্ষে ভোট দিয়েছি। ’ তাঁর এই সহজ-সরল কথায় আমরা অভিভূত হয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি সম্পর্কে আবারও একবার নিশ্চিত হলাম।

২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনের বিপরীতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দেশাত্মবোধক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। হঠাৎ সাড়ে ৯টার দিকে অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে লক্ষ করিনি, কিন্তু পরে দেখলাম যে চারদিকে কেমন এক ধরনের ভৌতিক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আমরা বেরিয়ে এসে দেখলাম শহীদ মিনার অন্ধকার, কেউ নেই। ওই ভবনের ক্যাফেটেরিয়ার মালিক বলাই আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, ‘মনে হয় অবস্থা খুব ভালো না। আপনারা বাড়ি চইলা যান। ’ আমরা পাঁচ বন্ধু, প্রায় পঞ্চপাণ্ডবেরই মতো, আমার গাড়িতে চড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যে আসলে কী ঘটছে জানার জন্য আমরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে, বঙ্গবন্ধু ভবনে যাব। গাড়ি করে রোকেয়া হলের সামনে এসে দেখতে পেলাম হলের সামনে সদ্য ফেলে রাখা একটি বিশাল শিরীষ বৃক্ষ কেটে সাফ করা হচ্ছে। এই বৃক্ষটি ওখানে রাখা হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যাত্রাপথে ব্যারিকেড দেওয়ার জন্য। এবং গাছটি কাটছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীরই কয়েকজন সদস্য। ডানে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে দুই ট্রাক ভর্তি অস্ত্রসজ্জিত সেনাসদস্য উপস্থিত। আমরা একটু অবাকই হলাম। কেননা ১ মার্চ থেকে পাকিস্তান আর্মি ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে কখনো শহরে প্রবেশ করেনি। ৩২ নম্বরে যখন পৌঁছলাম তখন চারদিক সুনসান। গেটে শুধু একজন দ্বাররক্ষী দাঁড়িয়েছিল। জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন যে আওয়ামী লীগের সব শীর্ষ নেতা কিছুক্ষণ আগেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলে গেছেন তাঁদের গন্তব্যে। পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ বিফল হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তিনি এ-ও বললেন, ‘আপনারা যার যার বাড়িতে চলে যান। কেননা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার রাস্তায় নামবে। ’ আমরা গাড়ি করে তড়িঘড়ি মগবাজারে এলাম। বন্ধুদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে আমি একা গাড়ি চালিয়ে রাজারবাগে আমাদের বাসস্থানে পৌঁছলাম। রাত তখন পৌনে ১১টা হবে। খেতে বসেছি এমন সময় হইচইয়ের শব্দ পেলাম। আমি খাওয়া ছেড়ে উঠে দ্রুত হাত ধুয়ে দৌড়ে গেলাম রাজারবাগের সামনের সদর রাস্তায়, যেটি আমার বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ছিল। গিয়ে দেখি সেখানে পাড়ার সব লোক জড়ো হয়েছে। কেউ কেউ ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দিচ্ছে। রাজারবাগে যেসব পুলিশ ভাই থাকতেন তাঁরা রাইফেল হাতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন এবং সবাইকে বোঝাচ্ছেন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে। তাঁরা এ-ও বললেন যে শেষ বুলেটটি থাকা পর্যন্ত ও তাঁদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে যাবেন। আমরা বাসায় ফিরে এলাম। মিনিট কয়েকের মধ্যে পাকিস্তানের ক্ষুদ্র ও ভারী অস্ত্রের গুলির শব্দ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ হচ্ছিল। তখন রাজারবাগের পুলিশ লাইনসকে মালিবাগ, শান্তিনগর ও মতিঝিল কলোনি এই তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। মাঝেমধ্যে পুলিশের একটি কি দুটি ৩০৩ রাইফেলের গুলির শব্দ পাচ্ছিলাম বটে, কিন্তু প্রতিটি গুলির জবাবে শত শত গোলা সেই শব্দ লক্ষ্য করে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। গোলাগুলির শব্দ এতই প্রচণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা সবাই প্রায় কানে তুলো গুঁজে দিলাম। আমি অতি সাবধানে বাড়ির ছাদে উঠে গেলাম। সেখানে ছাদের রেলিংয়ের আড়াল থেকে রাজারবাগের দিকে তাকিয়ে আছি। আকাশ দিয়ে অসংখ্য ট্রেসার বুলেট ভেসে যাচ্ছে। আকাশের তারা ম্লান হয়ে গেছে যেন। আর ভারী গোলা ভূপতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের হলকা উঠছে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের স্থাপনাগুলো থেকে। রাত ২টার মধ্যে রাজারবাগের বাঁশের বেড়ার তৈরি পুলিশ ব্যারাকগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সেই আগুনের লেলিহান শিখা ২০০-৩০০ ফুট উঁচুতে পৌঁছে গেল এবং সেই আগুনের উষ্ণতা এতই তীব্র হয়ে উঠল যে দ্রুত নিচে নেমে এসে যা হাতের কাছে পেলাম তা ভিজিয়ে শরীরে জড়িয়ে নিলাম। মনে হচ্ছিল চামড়া যেন পুড়ে যাবে। ভোর সাড়ে ৪টা কি ৫টা হবে। গোলাগুলির শব্দ স্তিমিত হয়ে এসেছে এমন সময় আমাদের সদর দরজায় হালকাভাবে কয়েকটি টোকার শব্দ পেলাম। দরজার পেছন থেকে পরিচয় জিজ্ঞেস করায় বাইরে থেকে জবাব এলো, ‘আমরা পুলিশ, ভাই। ’ আমি দরজা খুলতেই দেখলাম সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন প্রায় উলঙ্গ মানুষ। দুজনেই মালকোচা করে লুঙ্গি পরে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, ‘ভাই, আমাদের বুলেট শেষ। আমাদের অনেক বীর সহকর্মী আত্মদান করেছেন এই যুদ্ধে। এই রাইফেল দুটি আপনি নিন। কোথাও লুকিয়ে ফেলবেন, যেন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এগুলো খুঁজে না পায়। আমরা চলে যাচ্ছি। কোথায়, জানি না। তবে আমরা আবার ফিরে আসব এবং যুদ্ধ করে আমাদের দেশ স্বাধীন করব ইনশা আল্লাহ। জয় বাংলা। ’ এই বলে তাঁরা অন্ধকারে কোথায় যেন মিলিয়ে গেলেন। আমি সেই খোলা দরজার সামনে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। সংবিৎ যখন ফিরল তখন ভাবলাম একটি কর্ম তখনো বাকি আছে। রাইফেল দুটি কাঁধে করে অন্ধকারের মধ্যে আমাদের গলির দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে বাড়ির পেছনের জলাভূমিতে রাইফেল দুটি বিসর্জন দিলাম। তারপর কী হলো জানি না। চোখ বেয়ে এলো বাঁধভাঙা কান্না। হাঁটু গেড়ে ওই জলার পাশে বসে পড়লাম। কতক্ষণ বসেছিলাম মনে নেই। পূর্ব দিক যখন ফর্সা হয়ে এলো, সুদূর কোথাও থেকে ভেসে এলো আজানের আওয়াজ। আমার হৃদয়ে তখন এক নতুন প্রত্যয় জন্ম নিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই শহরে আর নয়। হাত মেলাতে হবে তাদের সঙ্গে, যারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। তারপর বিজয়ীর বেশে একদিন ফিরব আমার এই প্রিয় শহরে। ফিরবই।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য