kalerkantho


স্বাধীনতার ঊষালগ্নের শোকাবহ ঘটনা

লে. কর্নেল ওয়ালিউল্লাহ (অব.)   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পয়লা মার্চ একাত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে বিভাগের নবীনবরণ উৎসবের মহড়া শেষে যখন ফিরছিলাম তখনও বুঝে উঠতে পারিনি, আর ২৪ দিন পর এ দেশের নিরপরাধ মানুষের ওপর বর্বরোচিত অত্যাচার নেমে আসবে। সত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে অল্প কিছুদিন খ্যাতিমান শিক্ষকদের দেওয়া দীক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। মার্চ মাসেই জেগে উঠেছিল স্বাধীনতা লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। গভীর থেকে গভীরতর হয়েছিল একাত্তরের প্রতিটি মাস। মার্চের শুরুতে আশা করা গিয়েছিল আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানের সংকটের সমাধান হবে। মাসব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন বলে দিয়েছিল আর একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। ২৩ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব পাকিস্তানের ঘরে ঘরে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা পতাকাগুলো। ২৩ মার্চের পরবর্তী দিনগুলো খুব দ্রুত পেরিয়ে ২৫ মার্চ ১৯৭১ এসে গেল। সেই বিভীষিকাময় রাতে দেখেছি ঢাকাকে আতঙ্কের শহরে রূপান্তরিত হতে। ২৬ মার্চ সকালে রাজনৈতিক নেতারা তো বটেই, শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, আবালবৃদ্ধবনিতা স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ লাশের পাহাড় রক্তপ্লাবনে বয়ে চলা ক্রন্দনরত বুড়িগঙ্গা, আর বারুদের পোড়া গন্ধে ঢাকাকে প্রত্যক্ষ করেছি। জনশূন্য হয়ে পড়েছিল ঢাকা শহর। আশ্রয়ের জন্য শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত সবাই পালিয়ে বেড়িয়েছে। বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ধর্মই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে কাজ করেছে। শহর ছাড়ছিল হাজার হাজার মানুষ, কর্মচঞ্চল এক শহর যখন মৃতপ্রায় নগরীতে পরিণত হয়েছিল তখন স্বাধীনতার স্পৃহাকে অবদমিত করার প্রয়াস চলছিল। সেই মুহূর্তে ২৮ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যায় ঢাকার সন্নিকটে বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে জিনজিরার অচেনা এক গ্রাম শুভাড্যায় না দেখা এক আত্মীয়র বাড়িতে আমার মা, বাবা ও বোনদের নিয়ে এক রাতের জন্য আমাদের আশ্রয় হয়। যে নগরীতে আমার জন্ম, শৈশব-কৈশোর কেটেছে, সেই প্রাণপ্রিয় ঢাকা যখন ত্যাগ করি তখন বুড়িগঙ্গায় অজস্র লাশ ভাসতে দেখি। রাতে গ্রামের বাড়িতে গোলার আগুনের ঝলকানি এসে পড়ে। কাকডাকা ভোরে শস্যক্ষেত মাড়িয়ে হাজারো মানুষের সঙ্গে হেঁটে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে যথেষ্ট ক্লান্ত ও অবসাদমাখা অবয়ব নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি শ্রীনগর উপজেলার শমশপুর গ্রামে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাই। সেই গ্রামে পরবর্তী ৯ মাসের জন্য আমাদের আশ্রয়স্থল ছিল গ্রামের ঘরটি। শহরে মানুষ হওয়া পরিবারের সদস্যদের গ্রামের পরিবেশে খাপখাইয়ে নেওয়া কষ্টকর ছিল। গ্রামে আশ্রয় গ্রহণকারী শহুরে মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে দিনগুলো কেটেছে। রাজধানী ঢাকা যখন শূন্যপ্রায় তখন দখলদার বাহিনী পালিয়ে যাওয়া মানুষদের পথ রোধ করার জন্য নির্বিচারে গোলাবর্ষণ শুরু করে। ২ এপ্রিল ১৯৭১ শুভাড্যার খাল দিয়ে নৌকায় করে আমাদের শহুরে আত্মীয়স্বজন গ্রামের বাড়ির পথে যখন যাত্রা শুরু করে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আ ন হামিদুল্লাহর কিশোর পুত্র ঘটনাস্থলে হায়েনাদের গুলির আঘাতে মৃত্যুবরণ করে। অকালে হারিয়ে যাওয়া কিশোর ও অনেক আত্মীয়র রক্তে লাল হয়ে গেল শুভাড্যার খালটি। আমরা গ্রামে বসে সকালে খবর পেলেও সন্ধ্যা নাগাদ লাশটি গ্রামে এসে পৌঁছে। কিশোর টুটুলের লাশ এসে পৌঁছলে গ্রামে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মরহুম আ ন হামিদুল্লাহ ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের (বর্তমানে উত্তরা ব্যাংক) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ঢাকা থেকে এলে লাশ দাফনের সার্বিক ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। জীবন প্রদীপ নেভার শোকাবহ ঘটনাটির সংবাদ আকাশবাণী দ্রুত প্রচার করলে সারা দেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল টগবগে তরুণটির মৃত্যু মেনে নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। সেই দিন বিপুল মানুষের রক্তক্ষরণে শুভাড্যার খাল রঞ্জিত হয়েছে। নৌকায় আহত অন্যদের আকুতি তখন সবাইকে আবেগাপ্লুত করলেও অনেকে উত্কণ্ঠিত ছিল ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধরত জনাব হামিদুল্লাহর স্ত্রীর জন্য। ৭ এপ্রিল ১৯৭১ তিনি মৃত্যুবরণ করলে লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হলে আরো একবার আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। ২ ও ৭ এপ্রিল ১৯৭১ মা ও পুত্রের মৃত্যুর শোকাবহ ঘটনা আজ অনেকেই বিস্মৃতপ্রায়। পদ্মা সেতুর সন্নিকটে শমশপুর গ্রামে মা ও ছেলের সমাধিস্থল জানান দিয়ে যায় বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা অনেক ঘটনার পাশে সম্ভাবনাময় কিশোর ও তার মায়ের শোকাবহ গাথার কথা। বীর জননী ও তাঁর ছেলের আত্মদান রক্তঝরা ৯টি মাস সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে, করেছে উদ্দীপ্ত। শমশপুর একটি ছোট্ট গ্রাম হলেও ধারণ করে আছে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের গাথা, যা বলে দেয় ওরা মরেনি, বেঁচে আছে অনাদিকাল ধরে দেশপ্রেমের কথা বলতে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক

কর্মকর্তা ও কলামিস্ট


মন্তব্য