kalerkantho

এপার-ওপার

পতনের শব্দ

অমিত বসু

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শুধু বাংলাদেশে কেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় ওয়েবসাইটে দেখা যাবে মমতার মন্ত্রী-নেতাদের ঘুষ নেওয়ার ছবি। সাইটটা হচ্ছে, ডাব্লিউডাব্লিউডাব্লিউ.নারদনিউজ.কম। ৫২ ঘণ্টার ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ফুটেজ এডিট করে দেখানো হয়েছে মাত্র ২৩ মিনিট। তাতেই তোলপাড় রাজ্য-রাজনীতি। ঝড় সারা দেশে। একপেশে অবস্থায় তৃণমূল। শঙ্কিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভয় কাটাতে আরো জোরে চেঁচাচ্ছেন। বলছেন, আমায় ধমকে-চমকে চুপ করানো যাবে না। তাঁকে চুপ থাকতে কেউ বলেনি। তিনি সত্যিটা স্বীকার করুন, নয়তো ভিডিওটা যে জাল সেটা প্রকাশের দাবি তুলুন। দুয়ের কোনোটাই করছেন না। কলঙ্কের আগুন নেভাতে চাইছেন ফুঁ দিয়ে। আক্রমণই আত্মরক্ষার সহজতম উপায় মনে করে বলেছেন, বিদেশি টাকায় এসব রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তাঁর কথায় চিড়ে ভিজছে না। বড় সংবাদপত্রের বজ্রপাত মমতার মাথায়। ভরসা ছোট ছোট কাগজের বন্ধুত্বের হাত। তাঁকে আগলাচ্ছে জাল কবুল করে। মমতা হারলে মোটা টাকার বিজ্ঞাপন বন্ধ। তখন কী হবে! এই আতঙ্কই তাদের মমতারক্ষী করে তুলেছে। তাতেও কাজ হচ্ছে না। তারা যে ছোট্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ।

২০১১ সালের নির্বাচনে গোটা মিডিয়া ছিল মমতার পক্ষে। বৃহৎ নিউজ চ্যানেলও মমতাকে তুলে ধরেছিল চরম উৎসাহে। ফ্লোরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মমতা ৩৪ বছরের বাম অপশাসনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। সঞ্চালক মুচকি হাসিতে সমর্থন জানিয়েছিল। আজ তারাই মমতাকে ছিন্নভিন্ন করছে পোস্টমর্টেমের ছুরিতে। এই দুরবস্থা যে হবে তিনি দুঃস্বপ্নেও কি ভেবেছিলেন! রাস্তা থেকে উঠে আসা নেত্রীর স্বভাবগত পরিবর্তনই এর জন্য দায়ী বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। পায়ে হাওয়াই চটি, আটপৌরে শাড়ি পরা ইমেজটার প্রতি তিনি অবিচার করেছেন। কালো টাকার জোরে দলকে এবং নিজেকে বলীয়ান করতে চেয়েছেন। তাঁর নেতা-মন্ত্রীরা শুধু নন, অসংগতিপূর্ণ আয়ের অভিযোগে তিনিও অভিযুক্ত।

২০০১ সালের মমতা আর ২০১৬ সালের মমতাকে মেলানো যায় না। ২০০১ সালের অটল বিহারি বাজপেয়ি মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী ছিলেন মমতা। সে সময় এখনকার মতোই তেহেলকা স্টিং অপারেশন চালায়। তাতে বিজেপি সভাপতি বাঙ্গারু লক্ষ্মণ আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ অভিযুক্ত হন। ছবিতে বাঙ্গারুকে ঘুষ নিতে দেখা যায়। ফার্নান্দেজ নিজে না হলেও তাঁর বাড়িতে জয়া জেটলির উেকাচ নেওয়ার ছবি ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মমতা মন্ত্রিত্বে ইস্তফা দেন। বাজপেয়ির এনডিএ সরকারের সঙ্গে সব সম্পর্কও ত্যাগ করেন। আজ সেই তেহেলকারই অন্যতম সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েলস নারদনিউজের হয়ে দুই বছর ধরে স্টিং অপারেশন চালান। তাতে ক্যামেরাবন্দি হয় তৃণমূলের ১২ জন রথী-মহারথীর ৬৩ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের ছবি। তাতেও অনড় মমতা। ইস্তফা দেওয়া দূরের কথা, উল্টো ভিডিওটা জাল বলে সাফাই গাইছেন। ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করছেন। সামান্য সময়ে ফরেনসিক টেস্টেই জানা যায় ভিডিওটি জাল না খাঁটি। মমতা সেটা পরখ করার সাহসও দেখাননি। তিনি ভালো করেই জানেন, ভিডিওতে জালিয়াতি নেই। সাংবাদিক স্যামুয়েলস জানিয়েছেন, তিনি যেকোনো পরীক্ষা বা তদন্তের জন্য প্রস্তুত। তেহেলকার মতো নারদ ঘুষকাণ্ডের পুরোটাই সত্যি। দুই বছর ধরে কলকাতায় স্টিং অপারেশন চালিয়ে দুর্নীতির সত্যিটা আবিষ্কার করা গেছে।

স্টিং অপারেশনটা হচ্ছে সাংবাদিকতার আধুনিকতম অস্ত্র। দুর্নীতিবাজরা ধড়িবাজও হয়। যাতে ধরা না পড়ে, তাই আটঘাট বেঁধে চলে। সাংবাদিকরা আঁচ করলেও অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। স্টিং অপারেশনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অপারেশনে নামা সাংবাদিকরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে অভিযুক্তদের ওপর অভিযান চালান। শিকারকে ফাঁদে ফেলতে প্ররোচিত করেন টাকার লোভ দেখিয়ে, বেআইনি কাজে উসকানি দেন। অসাধুরা তাতে সাড়া দেয়। তাদের টাকা দেওয়ার ছবি গোপন ক্যামেরায় তুলে নেওয়া হয়। নারদনিউজের স্যামুয়েলস তা-ই করেছেন। তেহেলকাতে হাত পাকিয়ে নতুন সাফল্য নারদের দায়িত্ব নেওয়ার পর। সাংবাদিক হিসেবে নিশ্চয়ই তিনি কৃতিত্বের দাবি রাখেন।

২০১১ সালে নির্বাচনী সাফল্যে তৃণমূল যখন উত্ফুল্ল, তখনই স্যামুয়েলসের নজর পড়েছিল তাদের দিকে। তাঁর প্রশ্ন ছিল দলটির জন্ম মাত্র ১৯৯৮ সালে। এইটুকু সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় এসে গেল। নতুন দলকে আঁতুড়ঘর থেকে টেনে তুলতে অনেক টাকা লাগে। তার জোগাড় হলো কিভাবে? ২০১৪ সালে তিনি অভিযানে নামেন। দুই বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তিনি যে একজন আনাড়ি লোক, দুই নম্বরি কাজের জন্য তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন সেটা বুঝিয়ে দেন। ক্রমে সেই পরিচয়টা নেতাদের কাছে বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। শিকার ধরা পড়তেই স্যামুয়েলসের ক্যামেরা রোল করতে থাকে।

মমতার মাথার ওপর সারদা কেলেঙ্কারির খাঁড়া ঝুলছে। বিজেপির সঙ্গে রফা করে সিবিআই তদন্ত আটকে রেখেছিল। পরিবর্তে বিজেপিকে সব ইস্যুতে সংসদে সমর্থন করতে রাজি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তুষ্ট রাখতে মমতার চেষ্টার কসুর নেই। তাঁর সমস্যা কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে নিয়ে। সোনিয়ার কাছে তাঁর অনুরোধ ছিল, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস যেন সিপিএমের সঙ্গে জোট না বাঁধে। সোনিয়া সেই অনুরোধে সাড়া দেননি। উল্টো পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে গ্রিন সিগন্যাল দেন সিপিএমের সঙ্গে জোট বাঁধতে। অধীর ঝাঁপিয়ে পড়েন জোট গড়তে। তিনি সেটা চেয়েই তদ্বির করেছিলেন সোনিয়া আর রাহুল গান্ধীর কাছে। একটা সময় মনে হয়েছিল সোনিয়া জোটে রাজি নাও হতে পারেন। তিনি মমতাকে হাতে রাখতে সিপিএমের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করবেন। সোনিয়ার আরেকটা চিন্তা ছিল কেরালা নিয়ে। সেখানে নির্বাচনী যুদ্ধে কংগ্রেস-সিপিএম মুখোমুখি। একদল হারবে, আর একটি দল জিতবে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে ব্যতিক্রম হয় কী করে। কোন যুক্তিতে সিপিএমের হাত ধরবে কংগ্রেস। দ্বিতীয় চিন্তায় সোনিয়া রাজি হন। জোটে সম্মতি দেওয়ার প্রথম কারণ মমতা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে চাইছেন। একই সঙ্গে বিজেপি-কংগ্রেসকে হাতে রাখতে মরিয়া। সেটা হয় না। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে মমতা বিজেপির দিকেই ছিলেন। পরে বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসের দিকে সরে আসেন। একই সঙ্গে দুটি দলকে নিয়ে চলার সিদ্ধান্ত কোনো দিন নেননি। তার উপায়ও ছিল না। এবার তিনি গাছেরও খাচ্ছেন, তলারও কুড়াতে ব্যস্ত। মমতাকে বাদ দেওয়ার আরো বড় কারণ ২০১১ সালের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা। গতবারের সেই ভোটে তৃণমূলের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল কংগ্রেস। তাতে উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। ৩৪ বছরের বাম সরকারের পতন ঘটেছিল। তাতে তৃণমূল ক্ষমতায় পৌঁছলেও কংগ্রেসের কোনো লাভ হয়নি। বরং ক্ষতি হয়েছিল। মমতা ক্ষমতা পেয়েই কংগ্রেসকে গিলতে শুরু করেন। কংগ্রেস নেতাকর্মীদের টোপ দিয়ে তৃণমূলে টানতে থাকেন। কংগ্রেস ক্রমেই শীর্ণ হতে থাকে। বাধ্য হয়ে কংগ্রেস তৃণমূলের সঙ্গ ছাড়ে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতায় সোনিয়া বুঝেছেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলই কংগ্রেসের চরম শত্রু। তারা বেশি দিন ক্ষমতায় মানে কংগ্রেসের ক্ষয় অনিবার্য। নারদ ঘুষকাণ্ডে জড়িত হওয়ার পর সসেমিরা অবস্থা তৃণমূলের। মমতাকে হারানোর সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করতে চান না সোনিয়া। আপাতত পতনের মুখে তৃণমূল। ভরসা বিজেপি। তারাই বা কতটা পারবে সন্দেহ।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য