kalerkantho


বেলজিয়ামের ‘নাইন-ইলেভেন’, এ দায় আমাদের সবার

অনলাইন থেকে

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বেলজিয়ামের ‘নাইন-ইলেভেন’, এ দায় আমাদের সবার

বেলজিয়ামে যে জঙ্গি হামলা হলো, বলা যায়, দেশটির জন্য এ হচ্ছে আরেক নাইন-ইলেভেন। খবরটি একই সঙ্গে বেদনা ও আতঙ্ক হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। এরপর অনেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করছে। কিন্তু কেউ জানে না, পরবর্তী হামলাটি কোথায় হবে। বেলজিয়ামে যা ঘটে গেল তার দায় তাদের একার নয়। এ দায় সবার। ইউরোপ, আমেরিকা—এক কথায় বিশ্বের গোয়েন্দাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। ব্রাসেলসের মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে এখন অনেকে বাঁকা চোখে তাকাবে। এ-ও ঠিক না।

হ্যাঁ, বেলজিয়ামেও মুসলমানদের কেউ কেউ চরমপন্থী হয়ে গেছে। তার কারণও আছে। বেলজিয়ামে মুসলমানদের দ্বিতীয়  ও তৃতীয় প্রজন্ম রয়েছে। তবে রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থা তাদের জন্য পর্যাপ্ত কিছু করেনি। মুসলমানদের মধ্যে বেকারত্ব প্রকট। তরুণদের একটি অংশ সিরিয়ায় গিয়েছিল আসাদের বিরুদ্ধে লড়তে। কারণ তাদের কাছে খবর এসেছিল আসাদ শিশুদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। আর একবার সিরিয়ার রণাঙ্গনে ঢুকে পড়ার পর কে ভালো, কে মন্দ, কোন পক্ষ সত্য, কোন পক্ষ মিথ্যা তা নির্ণয় করার কাজটি আর সহজ থাকে না। তখন কেউ কেউ চরমপন্থীদের দলে ঢুকে পড়ে জঙ্গি আদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আমাদের দায়িত্ব ছিল ইউরোপের মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্যদের সামাজিক বন্ধনকে মসৃণ করার, যাতে প্রত্যেক মুসলমান তরুণ ইউরোপীয় মুসলমান হিসেবে গর্ব করতে পারে। এ কাজে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ফলে অসংখ্য হতাশ তরুণ সিরিয়ায় যাচ্ছে লড়াই করতে। তারা যখন দেশে ফিরছে নিজেদের আর ইউরোপীয় সমাজের সদস্য ভাবতে পারছে না। তাদের কাছে তখন পশ্চিমা মানেই শত্রু। অতএব, আঘাত হানো।

কোথাও জঙ্গি হামলা হলেই আমরা নিরাপত্তা দুর্ভেদ্য করা নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু কেন, কোন প্রেক্ষাপট থেকে একটি তরুণ জঙ্গি হয়ে ওঠে এ বিষয়ে আমরা খুব কমই মনোযোগ দিই। অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য থেকে কেউ কেউ অপরাধজগতে ঢুকে পড়ছে। এরপর কারাগারে গিয়েও তারা এমন কিছু মানুষের সংস্পর্শে আসছে, যারা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। পাকিস্তানসহ কোনো কোনো দেশের মধ্যবিত্ত সমাজের তরুণরাও যে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হচ্ছে তার কারণ যতটা সামাজিক, তার চেয়ে বেশি আদর্শিক। ভুল শিক্ষা থেকে তরুণরা পশ্চিমা বিদ্বেষ নিয়ে বেড়ে উঠছে এবং প্রতিশোধ নিতে তারা ভিড়ছে তালেবান বা আল-কায়েদার মতো চরমপন্থী সংগঠনগুলোয়।

পশ্চিমে কেউ কেউ প্রশ্ন করছে, অনুরূপ হামলা যুক্তরাষ্ট্রে কি সম্ভব? আশঙ্কা জিরো তথা শূন্যভাগ নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থাটি দুর্ভেদ্য। দূরত্বও একটা আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ইসলামিক স্টেটের প্রাণভূমি থেকে অনেক দূরে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী সমস্যাও তেমন নেই। ইউরোপে আজ যে নিরাপত্তাহীনতার আবহ শরণার্থীরা তা বাড়িয়ে দিয়েছে বৈকি!

আশঙ্কার কথা হচ্ছে, আইএস আর হামলা চালাবে না—এমন দাবির কোনো অবকাশ নেই। আইএস প্রমাণ করেছে, তারা দুর্ভেদ্য, অদম্য, ধারাবাহিক। ইউরোপীয়দের সতর্ক পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যেও তারা ব্রাসেলসে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। ব্রাসেলসে নিরাপত্তাব্যবস্থা তো তেমন দুর্বলও ছিল না। তারা তা ভেঙে দিতে পেরেছে। বেলজিয়াম আগে থেকেই প্রভাবশালী দুই ধারার সংস্কৃতির বিরোধের সঙ্গে লড়াই করছে। এই বিরোধটা হচ্ছে ফরাসিভাষী ও ডাচভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যে। মুসলমানদের বিষয়ে অনেকেই বলে থাকেন, মসজিদগুলোয় নিয়োগ দেওয়ার মতো স্থানীয় কোনো ইমাম পাওয়া যায় না। বিদেশ থেকে ইমাম আনা হয় এবং প্রায় সময়ই এমন দেশ থেকে ইমামরা আসেন যেখানে ইসলামী শিক্ষায় চরমপন্থা ঢুকে আছে। আজ সময় এসেছে ইউরোপের মানুষকে আত্মরক্ষার বিষয়টিকে আরো গুরুত্ব দিয়ে দেখার। ব্রাসেলসে আমরা দেখলাম, বিমানবন্দরে নিরাপত্তাব্যবস্থার বাঁ পাশটিতে আঘাত হানা হয়েছে। হামলাকারীরা নিরাপত্তাব্যবস্থা না ভেঙে টিকিট এলাকাটি বেছে নেয়। তাই নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখাগুলোকেও আরো দক্ষ হতে হবে। একের পর এক হামলার মধ্য দিয়ে তাদের দুর্বলতা প্রমাণিত হচ্ছে।

আসলে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বেস্ট ডিফেন্স ইজ দ্য স্ট্রং ডিফেন্স। ইউরোপ বলি, কিংবা বিশ্বের অন্য কোনো ভূখণ্ড, আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে আনতে চাইলে আইএসের হৃৎপণ্ডে আঘাত হানতে হবে। তাদের নেতৃত্ব গুঁড়িয়ে দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে তারা এখনো সেফ হেভেন তথা এক নিরাপদ স্বর্গব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে। তাদের ‘খিলাফত’ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার কাজটিতে আমরা সফল হতে পারিনি। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস এখন চাপের মুখে আছে, সত্যি; তবে তাদের শিকড়সমেত নির্মূল করার কৌশল নিয়ে ইউরোপ, ওয়াশিংটন, মধ্যপ্রাচ্যকে অবশ্যই ভাবতে হবে।

প্যারিস হামলার অন্যতম হোতা সালাহ আবদেসলামকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করার পরপরই পাল্টা আঘাতটি এলো। বড় সাফল্যের পর দুঃখজনক ব্যর্থতা। আসলে জঙ্গিদের সেলের তথ্য হাতে না থাকলে, গোয়েন্দা তথ্যের অভাব হলে, সর্বোপরি জঙ্গিদের যোগাযোগ প্রযুক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে বোঝা মুশকিল, আঘাত কখন আসছে। তাই বলা যায়, অনেকের জন্যই সময়টি জটিল, বিপজ্জনক।

তথ্যপ্রযুক্তির নানামুখী ব্যবহারের এই যুগে সব কিছুর ওপর একসঙ্গে নজর রাখাও কঠিন। যেমন এমন অ্যাপও আছে মোবাইলে, যেগুলোর ওপর বাইরে থেকে নজরদারি রাখা অসম্ভব। তার মানে হচ্ছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কী তথ্য আদান-প্রাদন করছে, খুব কাছে থাকার পরও হয়তো আমরা তা জানতে পারব না।

নজরদারির পথটিও আবার মসৃণ নয়। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে আর যাই হোক অস্বীকার করা যায় না। বেলজিয়ামের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন হয়রানির আতঙ্কে আছে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজটি অবশ্যই জোরদার করতে হবে। তবে তল্লাশির নামে কাউকে হয়রানি করা উচিত হবে না। ইসলামী জঙ্গিবাদ প্রকট হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে অনেকেই মুসলমানদের ঢালাওভাবে অভিযোগ করেন। এটাও ঠিক না। সবাইকে মনে রাখতে হবে, মুসলমানদের মধ্যেও অনেক ধারা, উপধারা রয়েছে। ইসলামিক স্টেট সদ্য গজিয়ে ওঠা একটি বিভ্রান্ত গোষ্ঠী মাত্র। তারা সব মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করে না।

আর আজ শুধু বেলজিয়াম বা ফ্রান্স নয়, লন্ডনসহ আরো অনেককে কমবেশি জঙ্গিবাদ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। আসলে বিপুলসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে কিংবা মুসলমান শরণার্থীর প্রবেশ ঘটেছে, এমন যেকোনো অঞ্চলকেই এখন সাবধান থাকতে হবে। ইউরোপে যে লাখ লাখ শরণার্থী ঢুকেছে, তাদের মূল সমাজে সমন্বিত করার কাজটিও একই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার শরণার্থী শিশু এখন স্কুলে যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ তো স্কুলে টিপ্পনীর শিকার হচ্ছে। এই শিশুরা এই অসম্মানের কী অর্থ করবে? কিভাবে তারা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে? তারা যদি ঠিকঠাক শিক্ষা না পায় প্রতিবাদের রূপটা কেমন হবে?

সূত্র : ব্রালেসল হামলার পর সিআইডির সাবেক পরিচালক মাইকেল হেইডেন, উপপরিচালক মাইকেল মুরেল ও বেলজিয়ামের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হাওয়ার্ড গুটম্যানের পৃথক সাক্ষাত্কার নেয় আটলান্টিক কাউন্সিল ডট ওআরজি। ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর


মন্তব্য