kalerkantho

বুধবার । ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ । ১২ মাঘ ১৪২৩। ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮।


নির্বাচন কমিশনের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন

এম হাফিজউদ্দিন খান

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচন কমিশনের আরো কঠোর  হওয়া প্রয়োজন

নবম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথম ধাপে দেশের ৭১৭টি ইউনিয়নে গতকাল ভোটগ্রহণ হয়েছে। স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূলের এই নির্বাচনে এবারই প্রথম চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হচ্ছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। শান্তিপূর্ণ একটি নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারের প্রশাসন—সবার সহযোগিতা চেয়েছেন।

কিন্তু ভোটগ্রহণের দিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। ভোট শুরুর আগেই লক্ষ্মীপুর, সাতক্ষীরা, বরিশালের বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র দখল করে ক্ষমতাসীন দল ব্যালটে সিল মেরেছে বলে অভিযোগ এসেছে। দুই নির্বাচনী কর্মকর্তাকেও গুলি করার খবর পাওয়া গেছে। ৩৬টি জেলার ১০১টি উপজেলায় ৭১৭টি ইউনিয়নে ভোট হচ্ছে। কিন্তু প্রায় সবখানেই সংঘর্ষের খবর আসছে। ব্যালট ছিনতাই, প্রার্থীদের হয়রানি, ভোটারদের ঢুকতে না দেওয়া ইত্যাদি ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা ঘটার একটা কারণও আছে। নির্বাচনের আগের রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যে দেখেছিলাম, তিনি বলছেন যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সহযোগিতা তিনি তেমনভাবে পাচ্ছেন না। আমাদের মতো দেশে সরকার যদি সহযোগিতা না করে, সরকারের যদি সদিচ্ছা না থাকে, তাহলে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন করার সাধ্য কারো নেই। এখন সবটাই আসলে সরকারের ওপর নির্ভর করছে। সরকার যা চায় তাই হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বশক্তি নিয়ে নিয়োগ করার কথা প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন; কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি সেই দায়িত্ব স্বীকার করছে? তারা কি সর্বতোভাবে কমিশনকে সহায়তা করবে—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে? তেমনটা কিন্তু দেখা যায়নি।

প্রথম ধাপে শুরুতে ৭৫২টি ইউনিয়নে নির্বাচন করার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় ৩৫টি ইউনিয়নের নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলো ২৩ মার্চ ও ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। আসলে জানি না, কবে আবার গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আমাদের দেশে হবে। সকাল ৮টায় নির্বাচন শুরু হয়ে বলা যায়, দুপুর প্রায় ১২টা পর্যন্ত ১৬টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র প্রার্থী অনেক স্থানে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় পার্টির একজন নির্বাচন কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। যদিও শুরু থেকেই বিএনপি নানা অভিযোগ করে আসছিল। আর সরকারি দলের লোকজনও অভিযোগ করেছে। কারণ পার্টি একজনকে ঘোষণা দিয়েছে। এখন এলাকাগুলোতে তো অনেকেই নির্বাচনে দাঁড়াতে চান। ঘটনাটা আসলে তেমনি। তাই যখন পার্টি একজনকে নির্বাচন করে তখন অন্যরাও খেপে যায়। আর সরকারি দলের লোকজনের মধ্যে এটা খুব প্রকটভাবে দেখা যায় যে সে একাই নির্বাচন করবে এবং একাই জিতবে। অন্য কেউ কেন সেখানে আসবে! এই মনোভাবটা পাল্টাতে হবে। এটা করলেও তো গণতান্ত্রিক চর্চা করা যাবে না। এ জন্য পার্টির ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা বাড়াতে হবে।

আসলে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কিছু পদক্ষেপ না নিলে কোনোভাবেই একটি ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। প্রথমত, গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অবশ্যই একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে। যিনি হবেন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যিনি নিজে ও তাঁর পুরো টিমকে শক্ত হাতে পরিচালনা করবেন। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। দ্রুত অ্যাকশন নেওয়ার ক্ষমতা রাখতে হবে। যেমন সরকারের দলীয় পরিচয়ে কোনো ব্যক্তি, পুলিশ, প্রশাসন যে কেউ কোনো অনিয়ম বা উচ্ছৃঙ্খলতা প্রদর্শন করলে ত্বরিত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচনে কোনো কারচুপি হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করার ক্ষমতা রাখতে হবে।

মোট কথা, কমিশনের তো আসলে শক্তিশালী ক্ষমতা আছে। প্রয়োজন সেটা প্রয়োগ করা। আর কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেটা সে প্রয়োগ করতে পারে না। এর জন্য সরকারের সহযোগিতা অবশ্যই দরকার। আর এখন যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছে তাতে নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করলেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে কি না সে ব্যাপারেও যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়।

নবম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এটি প্রথম ধাপের নির্বাচন হলো। কমিশন যদি এখনো শক্ত না হয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে পরের নির্বাচনগুলোও যে এমনই হবে, সে সংশয় থেকেই যায়। তাই কমিশনের পাশাপাশি সরকার যেন নির্বাচন নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। কারণ সবদিক থেকে পরিস্থিতিটা এমন করে রাখা হয়েছে যে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে আমরা স্বাভাবিক নির্বাচনের সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারব না।    

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের

সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : শারমিনুর নাহার


মন্তব্য