kalerkantho


আজ বিশ্ব আবহাওয়া দিবস

মানুষের লোভেই দুর্যোগ

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মানুষের লোভেই দুর্যোগ

১৯৫০ সালে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিষ্ঠা, ১৯৫১ সালে তার স্বীকৃতি। প্রতিবছর ২৩ মার্চ আন্তর্জাতিক আবহাওয়া দিবস পালিত হয়। প্রকৃতির ওপর যেমন বাড়ছে মানুষের নির্যাতন, বিপরীতে প্রকৃতি প্রদর্শন করছে বৈরী আচরণ। মানুষের অপরিণামদর্শী ভোগবাদিতার ধ্বংসাত্মক প্রভাবেই বর্তমানের বৈরী আবহাওয়া। পারমাণবিক বিপর্যয়ের চেয়েও বড় বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে আবহাওয়া। আবহাওয়ার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক মাটি, পানি ও ফসলের। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াজুড়ে যে নজিরবিহীন শীত, তুষারপাত, বন্যা, খরা, লু হাওয়ার দুর্যোগ ও সুনামি, ক্যাটরিনা ও সিডরের যে তাণ্ডব, তার সবই বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাব। এ প্রভাব শুধু বাংলাদেশের নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও ছোবল হানছে। এ বিরূপতার কারণে ১. মেরু অঞ্চলের চির তুষারাবৃত বরফ গলছে; ২. বরফ গলা এ পানি সমুদ্র ও নদীকে স্ফীত করছে; ৩. বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানলের মাত্রা বাড়ছে; ৪. নানা ধরনের জীবাণু সংক্রমণ বেড়ে রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণী, এমন দিন আসন্ন, যখন পৃথিবীতে সুপেয় পানির সব আধার আবৃত হবে লবণাক্ত পানির স্রোতে। বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, প্রতিবছর লবণাক্ততার জন্য আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে, বার্ষিক এ ক্ষতির পরিমাণ ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এ ছাড়া গবাদি পশুর বিচরণ ভূমি কমছে। গোখাদ্য কিনে এনে এখন গরু-ছাগলকে খাওয়াতে হয়। বাংলাদেশে ফসল উত্পাদনের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ২০-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ গরমকালে দিনের তাপমাত্রা এখন ৩৫ ডিগ্রি অতিক্রম করছে, আবার রাতের তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির নিচে নামছে। এতে ফসলের জীবনচক্র হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে ধান, গমের চাষাবাদ হুমকিতে পড়েছে। রাজধানীতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের বৈশ্বিক পরিবেশ তহবিল ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে মধ্যম থেকে উচ্চ মাত্রার খরায় আক্রান্ত ভূমির পরিমাণ ৫৫ লাখ হেক্টর। পরিবেশ অধিদপ্তরের  আওতায় দুই বছর পরিবেশ রক্ষা অভিযানের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শিল্পায়নের প্রভাবে আবহাওয়া ও পরিবেশ কি নির্মমভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। শিল্পের প্রয়োজনে ভূগর্ভ থেকে শত শত টন পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। মিঠা পানির উৎস বিল, পুকুর, জলাশয় ভরাট করে দ্রুতলয়ে এগিয়ে চলেছে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন। প্রকৃতির ফুসফুস বনজঙ্গল উজাড় করা হচ্ছে নির্বিবেকে। প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ না করা পর্যন্ত চলবে মানুষের প্রকৃতিবিধ্বংসী এ তত্পরতা।

বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টে ধনীদের কোনো ঝুঁকি নেই, যত ক্ষতি ও কষ্ট প্রান্তিক মানুষের। উন্নত দেশগুলোর স্বপ্ন, কার্বন পুড়িয়েই তাদের সমৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজার দখল ও পৃথিবী শাসন। আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। এতে অতিমাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে পুষ্টি সংকট এবং পতঙ্গ, পানিবাহিত ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ। কৃষিতেও পড়ছে অভিঘাত। ফলে জমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, জলজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, ফসলহানি বাড়ছে, বিশুদ্ধ পানির অভাব বাড়ছে। এভাবে ২০২৫ সালে পৃথিবীর অন্তত ৫০০ কোটি মানুষ পানি সংকটে পড়বে। পানি ও খাদ্য সংকটে পুষ্টি সমস্যা প্রকট হবে, দুর্যোগে বিপর্যস্ত হবে জীবন-জীবিকা, বেড়ে যাবে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা। কমে যাবে মানুষের উত্পাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা ও বাড়বে অসুস্থতা, বিরূপতা।

মানুষের অতিলোভী মানসিকতা সৃষ্টি করছে প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা। প্রকৃতির অপার দান ওজোন স্তরের ক্ষয়ে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে প্রাণঘাতী ক্যান্সার রোগ বেড়ে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১১ সালে ৩৪ বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ হয়েছিল, ২০২০ সালে তা উন্নীত হবে ৪০ বিলিয়ন টনে। ২০২০ সাল আমাদের দ্বারপ্রান্তে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত কার্বনের ৫০ শতাংশ শোষণ করতে পারে পৃথিবীর সমুদ্র ও বৃক্ষরাজি। বাকি অর্ধেক বায়ুমণ্ডলে অশোধিত অবস্থায় স্থিত থেকে মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে। প্রকৃতির কার্বন শোষণ ক্ষমতা শেষ অবস্থায় পৌঁছে গেছে; অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে আর শোষণ ক্ষমতা থাকবে না। বাকিটুকু বর্জ্য হিসেবে পৃথিবী থেকে বের করার উপায় নেই বিধায় মানুষই তার অসহায় শিকার হবে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, ২০৬০ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরে গত ২৭ বছরে বড় মাত্রার ৪৮টি ঝড় হয়েছে। গত ৪০ বছরে বঙ্গোপসাগরের উপরিতলের তাপমাত্রা ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে ঘন ঘন লঘুচাপ ও নিম্নচাপ। এমনকি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে লঘুচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে, যা অস্বাভাবিক। ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অতিক্রম করে যে ঝড়, তা এর প্রমাণ। অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামের এমন কিছু এলাকা এখন প্লাবিত হচ্ছে, যা ১০ বছর আগেও প্লাবিত হতো না। এমনকি চট্টগ্রামের অভিজাত আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আট-দশ বছর যাবৎ স্বাভাবিক জোয়ারে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূল্যবান অবকাঠামো, সম্পদ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরের উপরিতলের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠলেই সাইক্লোন সৃষ্টির পটভূমি তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঝড়গুলোতে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাও বেড়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে তীব্র শীত বা পশ্চিমা শীতল বাতাস অনুভূত হয়নি। বসন্তকাল সংকুচিত হয়েছে অনেক। এসব ঘটনা আবহাওয়ার বৈরিতা-বিরূপতা। প্রতিবছর ‘কপ’ সম্মেলনে বড় বড় ‘কমিটমেন্ট’ উচ্চারিত হয়। কিন্তু অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।

আজ ২৩ মার্চ, বিশ্ব আবহাওয়া দিবসে নিবেদন, আবহাওয়ার বৈরিতা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে প্রয়োজন বিদ্যুতের অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসী ব্যবহার হ্রাস, ফসিল ফুয়েলের বেহিসাবী ব্যবহার বন্ধ, বায়োগ্যাস ও সোলার এনার্জির ব্যবহার বৃদ্ধি, সিএফসি গ্যাস ও যানবাহনের ব্যবহার কমানো, সব শিল্প-কারখানায় আবশ্যিকভাবে ইটিপি স্থাপন, ইটভাটাকে আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর, রেফ্রিজারেটরের ব্যবহার কমিয়ে হিমায়িত খাদ্যের পরিবর্তে তাজা খাদ্য গ্রহণ। সবুজ জীবন, সবুজ পৃথিবী ও সবুজ অর্থনীতির চেতনায় আবহাওয়া বাঁচাতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাচ্ছি উষ্ণতম এক ঝুঁকিপূর্ণ পৃথিবী—ক্ষুদ্র বা বৃহৎ অর্থনীতির সব দেশই যার শিকার হবে। পরিবেশ বাঁচানোর আকুলতা নেই আমাদের, আছে শুধু সম্পদ আহরণের, প্রকৃতিকে ধ্বংসের ও জীবনকে ভোগের ব্যাকুলতা। দুই বছর পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ অভিযানে তা মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার অপার দান প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ। এসবের প্রতি মানুষের অন্যায় আঘাতে স্রষ্টার অমোঘ বিধানে এর প্রতিঘাত পড়বে মানুষের ওপর। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পৃথিবীর বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সঙ্গে অভিযোজিত হওয়ার আগেই যদি ধ্বংস হয়ে যায়?

 

লেখক : সাবেক পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সচিব, ডিপিডিসি

mmunirc@gmail.com


মন্তব্য