kalerkantho


সময়ের প্রতিধ্বনি

ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার উপলব্ধি

মোস্তফা কামাল

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়ার উপলব্ধি

এপ্রিল ২০০৩। চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা তখন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট।

দুই দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন তিনি ঢাকার শেরাটন হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, শ্রীলঙ্কার সংবিধান দেশটির প্রেসিডেন্টকে এত বেশি ক্ষমতা দিয়েছে যে তিনি নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারীতে পরিণত করা ছাড়া সবই পারেন। তাঁর সেই শ্লেষাত্মক জবাব শুনে অনেকেই তখন হো হো করে হেসেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সে বক্তব্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ বলে মনে করি।

বাংলাদেশের সংবিধানও কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করেছে। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। অন্যদের কিছুই করার নেই। অন্যরা শুধু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক কাজ করেন। বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতা নেই।

স্রেফ একটি আলংকারিক পদ।

এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছিলেন, মৃত ব্যক্তির জানাজায় অংশ নেওয়া ও কোনো অনুষ্ঠানের ফিতা কাটা ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কোনো কাজ নেই। তিনি এ-ও বলেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি পদটিকে অপরিহার্য করে তুলবেন। তবে সেটা করতে গিয়েই তিনি বেশ বিপদে পড়েন এবং একপর্যায়ে পদত্যাগ করতেও বাধ্য হন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হয়তো তখনো উপলব্ধি করতে পারেননি, রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া দরকার। তিনি পূর্ণ মেয়াদে দুবার এবং অতি অল্প সময়ের জন্য একবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সব কিছুই চলত তাঁর নির্দেশ মোতাবেক। একচ্ছত্র সেই ক্ষমতার ভাগ রাষ্ট্রপতিকে দেওয়ার কথা চিন্তাও করেননি; বরং বি. চৌধুরী একটু নড়াচড়া করতে গিয়ে রীতিমতো বিপদে পড়েছিলেন। এখন খালেদা জিয়াই বলছেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতার শেয়ার দেবেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কিছু ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকেও দেওয়া হবে।

এ কথা শুনে বেরসিক লোকেরা বলা শুরু করেছে, ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খালেদা জিয়া হয়তো রাষ্ট্রপতির আসনে বসবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তো ছিলেনই। এখন তাঁর লক্ষ্য রাষ্ট্রপতি হওয়া। আসলে দেশের অভিভাবক তো রাষ্ট্রপতিই। সে কারণে তিনি আগে থেকেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি যে ক্ষমতা উপভোগ করেছেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ক্ষমতাশূন্য হবেন; তা কী করে হয়! শুধু ফিতা কেটে তো আর দিন পার করা যায় না!

তবে এটা ঠিক, বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকা দরকার। একচ্ছত্র ক্ষমতা অনেক সময়ই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে একনায়ক করে তুলতে পারে। তাতে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হয়। সহনশীলতা ও সহমর্মিতার পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারী রাজনীতির উদ্ভব ঘটায়। গণতন্ত্রের স্বার্থেই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রস্তাব ইতিবাচক বলে মনে করি।

একই সঙ্গে বিএনপি আরেকটি ভালো প্রস্তাব দিয়েছে। ক্ষমতায় গেলে তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ করবে বলে অঙ্গীকার করেছে। একসময় জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ব্যাপারে খুব সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যকে তখন বলা হতো পাগলের প্রলাপ। সেই একই ধরনের প্রস্তাব এবার বড় একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হলো।

আমাদের সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সংসদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সংবিধানও পরিবর্তন করতে পারে। সংগত কারণেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সংবিধানকে ওলটপালট করে দিতে পারে। এটা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সব সময়ই যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় অতি জনপ্রিয় দলও সংসদের বাইরে থাকতে পারে।

বর্তমান ব্যবস্থায় সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলের কোনো ভূমিকা নেই। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হলে সংসদের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো বিতর্কিত বিল পাস হওয়ার আশঙ্কা অনেকটা কমে যায়। সংবিধানকে কথায় কথায় কাটাছেঁড়া করাও কঠিন হবে। জনবিরোধী বিল পাসের ক্ষেত্রেও চরম বাধার মুখে পড়বে ক্ষমতাসীনরা।  

ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু রয়েছে। এর ফলে সংসদেও একটা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’-এর ব্যবস্থা আছে। এর মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পরিশীলিত হয়। গণতন্ত্রের মুখোশ পরে কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চায়, তাহলে আটকাবে কে? একটা ব্যবস্থা তো রাখতে হবে!  আমরা মুখে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে ফেনা তুললেও করি তার উল্টোটা। প্রতিপক্ষকে যতভাবে ঘায়েল করা যায়, তা করতে একটুও দ্বিধা করি না। আবার দেশের গণতন্ত্রের কথা যত বেশি জোর দিয়ে বলি, দলের গণতন্ত্রের ব্যাপারে ততটাই নীরব থাকি। আর ব্যক্তির গণতন্ত্র, সে তো অনেক দূরের ব্যাপার! খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা অন্যের মতকে গুরুত্ব দেন। সবাই ‘আমি’তে বিশ্বাসী। আর সেই আমিত্বই মানুষকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে।

আজকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যে সংকট, সেটা মূলত স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কারণে। কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিএনপি বলতে বাধ্য হচ্ছে, তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। কারো ওপর জুলুম করবে না। তার মানে কী? অতীতে তারা যে প্রতিহিংসার রাজনীতি করেছে, জোরজবরদস্তি করেছে, তা স্বীকার করে নিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে না করার অঙ্গীকার করেছে। এটা একটা শুভ লক্ষণ বলে মনে করি।

এ ধরনের উপলব্ধি ক্ষমতাসীন দলেরও হওয়া দরকার। ‘ধরি-মারি-খাই’ নীতি বাদ দিয়ে তারা যদি কিছুটা গণতন্ত্রের চর্চা করে, প্রতিপক্ষকে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়, তাহলে দেশের অনেক উপকার হবে। তারা যে প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র চর্চা করছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ভিন্নভাবে রচিত হবে। প্রতিপক্ষকেও রাজনীতি করার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিপক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই দৃশ্য কি আমরা দেখতে পাব?

 

২.

বিএনপি নেত্রী মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ান। অথচ তাঁর দলে কোনো গণতন্ত্র নেই। এত বছর পর একটা কাউন্সিল হলো; তার কোনো কার্যকারিতা আমরা দেখলাম না। শুধু লোকদেখানো কাউন্সিল করার কী দরকার ছিল? তিনি এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমান তো আগেভাগেই নিজেদের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। এটা না করে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হলে কী এমন ক্ষতি হতো? খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পদে কে লড়তে যেত? কার ঘাড়ে কয়টা মাথা? অথচ তাঁরা কাউন্সিলের আগেই কাজ সেরে ফেলেছেন। হাস্যকর সব কাণ্ডকীর্তি।     

এবার কাউন্সিলে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বিএনপি চেয়ারপারসনের ক্ষমতা নাকি আরো বাড়ানো হয়েছে। কাউন্সিলে দল পুনর্গঠন কিংবা পদ-পদবি পুনর্বণ্টনের কোনো ঘোষণা আসেনি। সব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে। তিনি যা ভালো মনে করেন তা করবেন এবং তাই মেনে নেওয়া হবে। স্থায়ী কমিটি, নির্বাহী কমিটি বাতিল ও পুনর্গঠনের ক্ষমতা খালেদা জিয়ার হাতেই ন্যস্ত করা হয়েছে। ঠিক যেন এরশাদীয় কায়দা। সব নিজের হাতে! তিনি নাকি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতিকে আরো বেশি ক্ষমতা দেবেন! তিনি নিজে রাষ্ট্রপতি হলে হয়তো নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে পারেন। সেটাই হয়তো বলতে চেয়েছেন।

তবে মুক্তিযুদ্ধ এবং জামায়াত ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান আরো পরিষ্কার করা দরকার ছিল। এ বিষয়ে তাঁদের অবস্থান যদি হয় ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’, তাহলে তা দেশের মানুষ ভালো চোখে দেখবে না। রাজনীতিতে নানা কৌশল করা যায়। কিন্তু জনগণের সঙ্গে ছলচাতুরী করা যায় না। তারা তা মেনে নেবে না। তা ছাড়া খালেদা জিয়া কেন জাতীয় শোক দিবসে জন্মদিন পালন করবেন? এ বিষয়েও তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার ছিল। তিনি বলতে পারতেন, জাতীয় শোক দিবসে তিনি জন্মদিন পালন করা থেকে বিরত থাকবেন। তাহলে তিনি আপামর জনগোষ্ঠীর বাহ্বা পেতেন।

আমরা মনে করি, দেশের এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকা দরকার। একই সঙ্গে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদও বর্তমান বাস্তবতায় খুবই প্রয়োজন। এ দুটি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হতে পারে। শুধু আলোচনার জন্য আলোচনা নয়, কার্যকর সমঝোতাও হতে হবে। এটা সময়ের দাবি।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com


মন্তব্য