kalerkantho


কিউবায় ওবামা বন্ধুত্বের পালে হাওয়া লাগবে?

অনলাইন থেকে

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঐতিহাসিক কিউবা সফরে রবিবার কিউবা পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সঙ্গে আছেন পরিবারের সদস্যরাও।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওপাশে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি বেড়ানোই শুধু নয়, তিনি কিউবা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিও জানাবেন বিবৃতিতে। ওবামার সফর ঘিরে বহু বছরের বিচ্ছিন্নতা বনাম নৈকট্য, স্নায়ুযুদ্ধ বনাম সহযোহিতার মতো প্রসঙ্গগুলো এখন দুই পারেই আলোচিত হচ্ছে। প্রায় ৯০ বছর পর আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট কিউবা সফর করছেন। তাই গণতন্ত্রমনা মানুষের আশা, এবার দুই দেশের সম্পর্ক হয়তো স্বাভাবিক হবে। সূচিত হবে গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারা।

কিউবায় ওবামা প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা তো করবেনই, মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিউবা, ব্যবসায়ী সমাজ ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীর সঙ্গেও কথা হবে। এই বিষয়টিকেও গণতন্ত্রকামীরা বড় করে দেখছেন। সম্পর্কের বরফ গলছে! সেই আশায় ব্যবসা-বাণিজ্যের তরীতেও অনেকে পাল জুড়ছেন শিগগিরই জোর হাওয়া লাগবে এই আশায়। পর্যটনশিল্পেও প্রাণ ফিরে আসতে শুরু করেছে।

এরই মধ্যে ওবামা প্রশাসন কিউবা ভ্রমণের ওপর চাপিয়ে রাখা বেড়ি কিছুটা শিথিল করেছে। ফলে আমেরিকানদের জন্য কিউবা যাওয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে; কিউবানরাও মার্কিন ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি পেয়েছে। দুই জাতির মধ্যে বিরতিহীন বিমানসেবা ফের চালু হয়েছে এবং ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম সরাসরি ডাকযোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

অবশ্য স্বাভাবিক সম্পর্কের পথে আরো অনেক বাধাই এখনো রয়ে গেছে। বড় প্রতিবন্ধকতাটি হচ্ছে বাণিজ্য অবরোধ। রাজনৈতিক এই দণ্ডটি এখন শুধু মার্কিন কংগ্রেসই রহিত করতে পারে। ওবামা বহু আগেই এই নিষেধাজ্ঞা তোলার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের বাধায় এ নিয়ে এগোতে পারেননি। আমেরিকার আসন্ন ভোটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা তোলার পক্ষে তিনিও। গুয়ানতানামো বেতে মার্কিন নৌঘাঁটি নিয়েও দীর্ঘদিনের আপত্তি কিউবার। পর্যটনশিল্পসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে দুই দেশের সম্পর্ক আরো স্বাভাবিক হয়ে এলে, সেই সঙ্গে কিউবায় রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়লে বাণিজ্য অবরোধ প্রত্যাহারের পথের বাধাগুলোও হয়তো একে একে সরা শুরু করবে।

বলা যায়, বলটি শিগগিরই কিউবার কোর্টে পড়বে। পরিবর্তনের যে হাওয়া মৃদুভাবে হলেও এখন বইছে তাতে জোর লাগাতে হলে কিউবার রাজনৈতিক পক্ষের ভূমিকাটাই এখন বড়। বিশেষ করে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ব্যাপারে তাদের নমনীয় হতে হবে।

কিউবার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ওবামার এই ইতিবাচক নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অনেকে আবার ওবামার সমালোচনা করছেন। তাঁদের কথা হচ্ছে, কিউবা যে ছাড় দেবে তেমন কোনো আশ্বাস ওবামা অদ্যাবধি আদায় করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয়তার সুযোগে কিউবার স্বৈরতন্ত্র উল্টো আরো জাঁকিয়ে বসতে পারে—এমন আশঙ্কাও সমালোচকদের কেউ কেউ উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

স্বীকার করতেই হবে, কিউবাকে একঘরে করার উদ্দেশ্যটি ব্যর্থ হয়েছে। আশা করা হয়েছে, অবরোধ চাপিয়ে কিউবার অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা হবে, তাতে ফিদেল কাস্ত্রোর সাম্রাজ্যও দমবন্ধ দশায় পড়বে। হিতে বিপরীত হয়েছে। কিউবার সরকার কার্যকরভাবে এই বার্তাটি সবাইকে দিতে পেরেছে : সব দোষ যুক্তরাষ্ট্রের। নতুন কিছু করার চেষ্টা সময়ের দাবি ছিল এবং এ ক্ষেত্রে ওবামা সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। ব্যবসায়ের থেমে থাকা চাকায় ধীরে হলেও গতি আনা দরকার ছিল। কিউবায় ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে এর চেয়ে উত্কৃষ্ট কোনো পন্থা নেই।

১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট ফুলগেনসিও বাতিস্তাকে গদিচ্যুত করেছিলেন বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। বাতিস্তার মার্কিনপ্রীতি কারো অজানা ছিল না। কাস্ত্রোদের অভিযোগ ছিল, তাঁকে সামনে রেখেই কিউবার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল আমেরিকা। বাতিস্তার পতনের পর কাস্ত্রোর নেতৃত্বে নতুন ইতিহাস তৈরি হয় কিউবায়। আর আমেরিকা-কিউবা মুখ দেখাদেখি কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তখনই।

নিজের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হওয়ার আগে দুই দেশের সম্পর্কের সেই শৈত্য কাটাতে উদ্যোগী হন ওবামা। আসলে নেলসন ম্যান্ডেলার স্মরণসভায় কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে তাঁকে হাত মেলাতে দেখে নড়ে বসে গোটা দুনিয়া। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ফোনে প্রায় ৪৫ মিনিট কথা হয় দুই প্রেসিডেন্টের। ওবামা ঘোষণা করেন, ফের হাভানার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করতে উদ্যোগী হোয়াইট হাউস। সেই বন্ধুত্বের সেতুবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন পোপ ফ্রান্সিসও।

ওবামার ঘোষণার পরপরই দুই দেশের কয়েকজন বন্দিকে মুক্তি দেয় আমেরিকা ও কিউবা। আগস্টে দরজা খোলে ৫৪ বছর বন্ধ থাকা হাভানার মার্কিন দূতাবাস। সেই থেকে এ পর্যন্ত শিক্ষা থেকে ভ্রমণ পর্যন্ত কিউবার ওপর জারি থাকা একের পর এক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নির্দেশ দিয়েছেন ওবামা।

কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে কংগ্রেসের এক শুনানিতে রিচার্ড ফেইনবার্গ সম্প্রতি যেমন বলেন, ‘অর্থনৈতিক বিনিময়ই নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক বাহিনী হতে পারে। কারণ কিউবাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যটি তো পরিষ্কার। কিউবাকে একটি বহুত্ববাদী ও সমৃদ্ধ সমাজে রূপান্তর ও বিশ্বের কাছে আরো মুক্ত করে দেওয়া; যেখানে পণ্য, পরিষেবা, মূলধন ও আদর্শের প্রবাহটি হবে অবাধ। ’ রিচার্ড ফেইনবার্গ ক্লিনটন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কিউবার অর্থনৈতিক সংস্কারবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ।

দৃশ্যত দ্বীপভূখণ্ড কিউবার মানুষও এই পরিবর্তন চাইছে। তারা আশা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো প্রশাসন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই ইতিবাচক যাত্রাকে ভণ্ডুল করে দেবে না। বরং ওবামার উত্তরসূরি হবেন এমন একজন দূরদর্শী ব্যক্তি, যিনি ওবামারই মতো কিউবাকে সুপ্রতিবেশী হিসেবেই মেনে নেবেন, শত্রু বলে গণ্য করবেন না। আপাতত ওবামার সফরের উষ্ণতায় এখন বরফ কতটা গলে, সেটাই দেখার।

 

সূত্র : কিউবাভেরদাদ ডটনেট। তারা লেখাটি প্রকাশ করেছে বোস্টন গ্লোব থেকে নিয়ে


মন্তব্য