kalerkantho


ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কী

ইসহাক খান

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কী

২২ মার্চ প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন।

প্রার্থীরাও প্রচারণায় নেমেছে জোরেশোরে। তবে নির্বাচনী আমেজ নেই। এবার ভিন্নধারায় ইউপি নির্বাচন হচ্ছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীকে রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রতিটি দলেই বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। তবে সরকারি দলের প্রার্থীর দাপটে অন্যরা নির্বাচনী প্রচারণা ঠিকমতো চালাতে পারছেন না বলে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

তৃণমূলের এই নির্বাচন নিয়ে বরাবরই মানুষের আগ্রহ থাকত সীমাহীন। জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে ইউপি নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ ও উৎসাহ দেখা যেত বেশি।

এবার সেই আগ্রহ ও উৎসাহে ভাটা পড়েছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দল থেকে নমিনেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তটি যথাযথ হয়নি বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

জাতি হিসেবে আমরা বড় বেশি রাজনীতিমুখী হয়ে পড়েছি। হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্র রাজনীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব। সবখানে রাজনৈতিক হানাহানি। সেই হানাহানিকে আরো উসকে দিয়েছে এবারের এই দল কর্তৃক চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়ন।

আমরা এতটাই রাজনীতিনির্ভর হয়ে পড়েছি যে রাজনীতি ছাড়া যেন আমাদের কিছুই চলে না। রাজনীতি নিয়ে আমাদের এই পাগলামি হাস্যরসের বিষয়। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ পাওয়া যাবে না, যেখানে আমাদের রাজনীতির শাখা নেই। লন্ডন আওয়ামী লীগ শাখা, লন্ডন বিএনপি শাখা, নিউ ইয়র্ক আওয়ামী লীগ শাখা, নিউ ইয়র্ক বিএনপি শাখা, দুবাই, আবুধাবি, লিবিয়া, ওমান, সৌদি আরব অর্থাৎ পৃথিবীর তাবৎ দেশে আমরা আমাদের রাজনৈতিক শাখা খুলেছি। পৃথিবীর তাবৎ দেশকে আমরা রাজনীতি শিখিয়ে তারপর ক্ষান্ত হব।

প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর আর কোনো দেশের রাজনৈতিক দলের শাখা কি আমাদের দেশে আছে? পৃথিবীর আর কোনো দেশে কি রাজনীতি নেই? তারা কি আমাদের মতো রাজনীতি নিয়ে এত মাতামাতি করে? যা আমাদের দেশের মানুষ করে। এবার সেই মাতামাতিতে ঘি ঢেলে দেওয়া হলো দল কর্তৃক চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়নে। ফল দাঁড়াল হানাহানির পরিমাণ বৃদ্ধি। এর মধ্যেই কয়েকজন নির্বাচনী সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে বিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা দেওয়ার। অনেক ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। প্রার্থী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রার্থী থাকবে না—এটাই বরং অস্বাভাবিক ঘটনা। সেই অস্বাভাবিক ঘটনা বেশুমার ঘটে চলেছে। যাঁরা স্বতস্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন তাঁদেরও ভয়ভীতি দেখিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথ সুগম হয়েছে সরকারি দলের প্রার্থীদের। এটা কী ধরনের নির্বাচন? এ নির্বাচনের মানে কী?

আমার দেখা মতে, সবচেয়ে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। বাজারের চায়ের দোকানগুলো সর্বত্র সরগরম থাকে নির্বাচনী আমেজে। এবার সেই আমেজ অনুপস্থিত। কারণ একটাই—দল কর্তৃক প্রার্থী মনোনয়ন। তৃণমূলের এই নির্বাচনে এমন নিয়মের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আগে যেমনটি হতো, যার যেমন ইচ্ছা তিনি প্রার্থী হতেন। তারপর নিজের সমর্থকদের নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করতেন। চারদিকে নির্বাচনী আমেজে মাঠ থাকত উৎসবমুখর। এবার সে চিত্র উল্টো।

গণমাধ্যমের রিপোর্ট ও মাঠে সশরীরে থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য দলের প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা নেই। মোট কথা, তাঁরা জিততে পারবেন না। তাঁদের জিততে দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে তারা প্রমাণ করবে তাদের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। জোর করে ভোট নিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করা যায় না। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। যদি তারা মনে করে, দিন এমনই থাকবে, তাহলে ভুল করবে নির্ঘাত। দিন চিরকালই পরিবর্তনশীল। আজ যে ক্ষমতার শিখরে, কাল তার ক্ষমতার নিম্নস্তরে নেমে যেতে সময় লাগবে না। ইতিহাসে তার বহু প্রমাণ রয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। পরিণামে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করে না। সে তার শিক্ষা দিয়ে পথ চলতে থাকে।  

একমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটাই মানুষ উপভোগ করত। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা সেটাও জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন বলে অনেকে মত দিয়েছেন। তাতে জন্ম নিচ্ছে মানুষে মানুষে রেষারেষি, হানাহানি। সেই হানাহানি স্থায়ী রূপ নিল এবার এই দল কর্তৃক প্রার্থী মনোনয়ন পদ্ধতিতে। এর রেশ বহু দিন তৃণমূল পর্যায়ে থেকে যাবে। বহু মানুষকে ঘরছাড়া হয়ে বাঁচতে হবে। মোট কথা, রাজনৈতিক খুনোখুনিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হলো। এটা ভুল রাজনীতির ফসল। সবাইকে এর জের টানতে হবে। কথায় বলে, অপরের জন্য খাল কাটলে সেই খালে নিজেকেই পড়তে হয়।

উপরন্তু রয়েছে প্রার্থী বাছাই। তৃণমূল থেকে যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয় কেন্দ্রে এসে তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। তাতে কী হয়? নির্ধারিতভাবে দলে বিভক্তি দেখা দেয়। যদি তৃণমূলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তৃণমূলের মনোনয়নকে সম্মান দেখানো হতো তাহলেও অনেক হানাহানি কম হতো। আমাদের দেশে তা হওয়ার নয়। এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এমপি সাহেবের শ্যালক নির্বাচন করবে তৃণমূলের ভোটে সে নির্বাচিত না হলেও তাতে কিছু এসে যায় না। সে এমপি সাহেবের শ্যালক এই যোগ্যতার ওপর আর কোনো যোগ্যতা থাকতে পারে না। অবধারিতভাবে এমপি সাহেবের শ্যালক নমিনেশন পাবে। কেন্দ্র থেকে এমপি সাহেবের শ্যালকের ওপরই আস্থা রাখা হয়। এটাই হয়ে আসছে। আমার এলাকায় তাই দেখেছি। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হলো না। একদম আনকোরা এলাকায় অপরিচিত একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হলো। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হলেন।

এই যে মনোনয়ন বাণিজ্য, এর কি খারাপ প্রভাব নেই? অবশ্যই আছে। দেখা যাবে এই মনোনয়নের কারণে অনেক তৃণমূল কর্মী আগামী দিনেও মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর বিরোধিতায় নামবে এবং যারা বিরোধিতায় নামবে নির্ঘাত তাদের কপাল পুড়বে। আওয়ামী লীগের কর্মী হয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাতে তাদের নাজেহাল হতে হবে। বাড়িঘরে হামলা হবে। লুটপাট হবে। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচতে হবে।

কেন্দ্রে যাঁরা এমন রাজনীতির ধ্বজা ধরে আছেন, তাঁরা একসময় ঠিকই অনুধাবন করতে পারবেন দলের আসল কর্মী কে, আর নকল কর্মী কে? কিন্তু তখন আর শোধরানোর সময় থাকবে না।

এবারের নির্বাচনের ধরন দেখে অনুমান হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবু আশা করব, নির্বাচন কমিশন তাদের ন্যূনতম নিরপেক্ষতা প্রমাণ করার প্রয়াস চালাবে এবং দেশের মানুষকে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দেবে।

 

লেখক : গল্পকার, টিভিনাট্যকার


মন্তব্য