kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


উপাচার্যরা কতটা অসহায়

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উপাচার্যরা কতটা অসহায়

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের অবস্থাটা সবারই জানা। আমি একা কী করতে পারি। তার পরও ক্যাম্পাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। ’ একজন উপাচার্যের এমন অসহায়ত্ব আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা ও বহিরাগত এবার আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ভাঙিয়ে চাকরি দাবি করেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে তিন ঘণ্টা তাঁর কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় তাঁরা উপাচার্যের কক্ষের সামনে সাদা কাপড় বেঁধে অবস্থান নেন। তাঁদের চাকরির আন্দোলনের পেছনে নেতাদের হাত রয়েছে—পত্রিকার খবরে এমনটি প্রকাশ পায়। অবশ্য নেতারা এমন দাবি অস্বীকার করেছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে চাকরিপ্রত্যাশী নেতাদের আন্দোলনের বিষয়টি বহুবার আমরা লক্ষ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়টি পত্রিকার পাতার শিরোনাম হয়েছে এ কারণে বহুবার। কিন্তু কার্যত কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। আর উপাচার্যকে অসহায়ের মতো সব কিছু মেনে নিতে হচ্ছে।

আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কী রকম অসহায় তা আমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দিকে তাকালে এবং তাঁর মন্তব্য শুনলে বুঝতে পারি। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটি শতভাগ সত্য। বিষয়টি আরো বড় হয়ে দেখা দেয়, যখন উপাচার্য হন বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যিনি সমঝোতা করে চলতে পারেন, তাঁর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা সহজ হয়। এমনটি করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। নিজস্বতাকে পরিপূর্ণভাবে বিসর্জন দিতে সবাই পারেন না। আবার পদ ছেড়েও চলে যাওয়া যায় না। স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ অনেক সময় থাকে না। যখন একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এমন নিশ্চয়তা দিয়েই নিয়োগ দেওয়া উচিত। সৎ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ পেলে উপাচার্যদেরও ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও নিরপেক্ষ থাকার এক সুযোগ তৈরি হয়। তখন উপাচার্যকেন্দ্রিক সমস্যা থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারি। নামে স্বায়ত্তশাসন আর কার্যত বিপরীত অবস্থা বিরাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বর্তমানে বিষয়টি এমন একটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে অনেক বিষয়ে বাইরের একটি প্রচ্ছন্ন প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এখানে প্রভাব বিস্তার করাও সহজ। একটি নির্দিষ্ট ও ছোট ভূখণ্ডে একজন ব্যক্তির ওপর যতটা প্রভাব বিস্তার করা যায়, একই প্রভাব রাষ্ট্রের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে করা সহজ হয় না। বিষয়টি সহজ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে যা দাঁড়ায় তা হলো, উপাচার্য যেহেতু অনেক ক্ষমতা ভোগ করেন, সেহেতু তাঁকে কুপোকাত করতে পারলেই কাজ হাসিল। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে যখন অন্যদের এগিয়ে আসা দরকার তখন সঠিক কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় সব কিছু উপাচার্যের কাঁধেই পড়ে। এমনটি বেশি ঘটে প্রচণ্ড বিভাজনে থাকা শিক্ষকসমাজের মধ্যে। বিভাজন একমাত্র দলগত কারণে হলে সমস্যা কম; বরং পাওয়া ও না পাওয়ার বিভাজন বড় জটিল বিষয়। এমন অবস্থায় পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো লোকের সংখ্যা কম। এতে তৈরি হয় বিভাজন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা দেখে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, ওই অঞ্চলে চাকরির একমাত্র সুযোগ যেন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ কি চাকরি দেওয়া? আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করি, যাঁরা দেশে ও দেশের বাইরের বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার সামনে তুলে ধরেন। সাধারণ মানুষ ও চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে। গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকে যাঁরা সর্বোচ্চ মেধাবী, তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কেউ শিক্ষক হবেন। প্রতিবছর নতুন নতুন বিভাগ খোলা হলে এ সুযোগ বেশ বাড়ে। তবে অফিসার নিয়োগের সংখ্যা সীমিতই থাকে। সীমিত এই নিয়োগের ওপরই আমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ লক্ষ করে আসছি। উপাচার্যদের অসহায়ত্বের বড় একটি কারণ, তিনি প্রথমে শিক্ষক পরে প্রশাসক। এটি ঠিক যে তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতা ভোগ করেন; কিন্তু সব সময় তা প্রয়োগ করতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগেও সমস্যা হয়। তাঁর নেই নিজস্ব পুলিশ বাহিনী। একজন উপাচার্যকে চাকরির জন্য অবরুদ্ধ করা যত সহজ, তেমনি একজন আমলা কিংবা পুলিশ বাহিনীর কোনো বড় কর্মকর্তাকে করা সহজ নয়। কেননা তাঁদের রয়েছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা। সাজা ভোগের ভয়ে আমার বিশ্বাস, এ কাজটি তাঁরা করবে না।

উপাচার্য আরো অসহায়বোধ করেন, যখন তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না হন। শিক্ষকরা সহজে মেনে নিলে সমস্যা কম হয়। শিক্ষকদের ধারণা, তিনি চার বছরের জন্য এসেছেন, তারপর চলে যাবেন। উপাচার্য না হতে পারার বেদনা থেকে অসহযোগিতার মনোভাব তৈরি হতে পারে। পারে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়ার কারণেও। আবার যিনি উপাচার্য তাঁর মনোভাবও ভিন্ন হতে পারে। তিনি নিরপেক্ষ থেকে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় পেরে ওঠেন না। নিজের ইচ্ছা থাকলেও সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত এবং পরিপূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া দায়িত্ব পালন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পারস্পরিক এই স্বার্থ, আশা, পাওয়া, বেদনা থেকে তৈরি হয় এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। যার সুযোগও নেয় চাকরিপ্রত্যাশী কোনো কোনো পক্ষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কয়েক বছর ধরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে যে আন্দোলন আমরা লক্ষ করে আসছি, তাতে সরকারের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি শুধু দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখলে কম দেখা হবে। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। যাদের কারণে এমনটি হচ্ছে, তারা হয়তো মহাশক্তিধর। আমাদের ভেবে দেখা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শক্তিধর মহাবলয়ের কারণে এমনটি ঘটছে কি না। কেননা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বার্থ খুব সহজে শিক্ষার্থী ও অন্যদের আন্দোলন প্রভাবিত করতে পারে। এর মধ্যে অন্য কোনো কারণ থাকলে তার দায় কেন সরকারকে নিতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা বিরাজ করলে তা সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের ভালো ভালো অর্জন ছোট ছোট কারণে ম্লান হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আর যদি রাজনীতিবিদদের ইন্ধনের কারণে এমনটি হয়ে থাকে, তা দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত। রাজনীতিবিদদের উচিত তাদের নেতাকর্মীদের কঠোরভাবে দমন করা। বর্তমান উপাচার্য একজন মেধাবী, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক শিক্ষক। উপাচার্যকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে দেওয়ার জন্য এ ধরনের চাকরির আন্দোলন বন্ধ হওয়া উচিত।  

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com


মন্তব্য