kalerkantho


ইউপি নির্বাচনে সরকারের দায়িত্ব কী

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইউপি নির্বাচনে সরকারের দায়িত্ব কী

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে এবং দলীয় প্রতীকে মুখোমুখি হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। সংগত কারণেই নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা ও প্রত্যাহারসহ নির্বাচনী সব প্রক্রিয়ায় জাতীয় নির্বাচনের যেমন ফ্লেভার রয়েছে, তেমনি উত্তেজনাটাও জাতীয় নির্বাচনের মতোই।

আর এই উত্তেজনার সূত্র ধরে দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বলা যায়, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও হতাহতের মধ্য দিয়েই চলছে ইউপি নির্বাচনী আয়োজন।

আর এই নির্বাচনী আয়োজন সামনে রেখে এখন সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, কেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন কঠোর হচ্ছে না? নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক ও সার্বভৌম ক্ষমতাশীল হওয়া সত্ত্বেও কেন স্থানীয় প্রশাসনকে যথাযথ ও ন্যায্যভাবে ব্যবহার করছে না—সে চিন্তাটিও আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সহিংসতায় অনেক হতাহত ও নানাবিধ অভিযোগ থাকলেও নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে শুধু উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেই কি ক্ষান্ত হচ্ছে? নির্বাচন কমিশন সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিধি প্রয়োগ করছে না কেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০১৬-এর ৩১ বিধি অনুসারে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তাত্ক্ষণিক জেল-জরিমানার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। সংগত কারণেই এমন শৈথিল্য কাজ করলে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফুরিয়ে যাবে। বিশেষ করে, পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোতে আরো খারাপ ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা যাচ্ছে।

নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ মানেই নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সরকার ও সরকারি স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ।

কারণ প্রবাদে আছে, ‘কান টানলে মাথা আসে’। এ রকম একটি প্রচলিত প্রবাদের সূত্র ধরে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন অতঃপর সরকারের দায় একীভূত হয়ে যায়। যেহেতু সরকারি দলও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে এবং সরকারি দলের প্রার্থীরা তথাকথিত প্রশাসনিক সুবিধা লাভের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, সেহেতু নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি সরকারও এ দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। ইতিমধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী ও সরকার সমর্থকদের বাধার কারণে অনেক ইউপিতে সরকারদলীয় প্রার্থী ছাড়া আর কোনো দলের প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি। নির্বাচন ঘিরে যদি জোরজবরদস্তি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব হয়, তাহলে সাধারণ জনগণ নির্বাচনের ওপর থেকে যেমন আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে, তেমনি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রতিও এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।

অনেক দিন থেকেই সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে গণতন্ত্রের পাশাপাশি সমার্থক করে আলোচনা-সমালোচনা চলেছে। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। আর সে ক্ষেত্রে কোনো সরকারের অধীনে যদি স্থানীয় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কালো দাগ লাগে, তাতে সরকারের জন্য তা শুভ লক্ষণ নয়। প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে ইতিমধ্যেই অনেক জায়গায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি ইতিবাচক না হলেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। যদিও এ নিয়ে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি মাঝেমধ্যেই টক শো কিংবা লেখালেখিতে অনর্থক সমালোচনায় লিপ্ত হন। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে। কথিত পণ্ডিতজনেরা প্রায়ই ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি এক ধরনের নির্বাচনহীনতা বলে উল্লেখ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষয়টি একবারেই তা নয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিও নির্বাচনেরই অংশ। কোনো দল যদি প্রার্থিতা না দেয় কিংবা কোনো প্রার্থী যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না চান, আর তাতে যদি কোনো প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, তাতে নির্বাচিত প্রার্থীর কোনো দোষ থাকার কথা নয়। কারণ সব প্রক্রিয়াই নির্বাচনের অংশ। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না আসার বিষয়টি স্বেচ্ছায় হতে হবে। কিন্তু যদি জোরপূর্বক প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলা হয় কিংবা মনোনয়নপত্র জমা দিতে না দেওয়া হয় সেটি নিঃসন্দেহে নির্বাচনের অপসংস্কৃতি। এমনকি সে ক্ষেত্রে প্রশাসনই যদি সরকারদলীয় প্রার্থীকে সহযোগিতা এবং বিরোধীদলীয় প্রার্থীকে অসহযোগিতা করে, তবে তার দায়ও নির্বাচন কমিশন যেমন এড়াতে পারে না, তেমনি সরকারের কাঁধেও চলে আসে।

বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বেশির ভাগ স্থানীয় নির্বাচন অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ায় ইতিমধ্যেই জনমনে কিছুটা আস্থার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৯-২০১৪) মাত্রাগতভাবে স্থানীয় নির্বাচন অনেক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিতব্য ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি এখন সবার সামনে। বিশেষ করে, একদিকে সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অন্যদিকে সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের দায়িত্বহীন আচরণ। আর এ দুটির কোনোটি থেকে বিচ্যুতি ঘটার মানেই হলো সংশ্লিষ্ট সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখি হওয়া।

ইউপি নির্বাচন কয়েক ধাপে হলেও দেশের মোট ভোটারের বড় অংশ (প্রায় সাড়ে আট কোটি) দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও হবে। কারণ আমাদের দেশে একটি নেতিবাচক ধারণা প্রায় সব সময় প্রচলিত আছে, নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবাহী হয় এবং সে কারণে তারা মেরুদণ্ডহীনও বটে। কাজেই নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ ও সফলভাবে নির্বাচন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে সেই নিরপেক্ষতা ও সফলতার ক্রেডিট যেমন পাবে, তেমনি তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণারও অবসান ঘটবে। এতে নির্বাচন কমিশনের সফলতা সরকারের সফলতা হিসেবেই বিবেচিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে প্রভাবমুক্ত নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য সরকার তথা সরকারি দলের নেতাকর্মীদেরও নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে উৎসাহিত করা উচিত।

নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মনোভাবের মাধ্যমে যাতে দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারে, সে জন্য সরকারি দলকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। আর সেটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলো আসন্ন ইউপি নির্বাচন। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সরকার জনগণের কাছে যে আস্থা অর্জন করেছে, সেই আস্থা ধরে রাখতে অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য