kalerkantho


বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ মাস

ড. মো. মাহবুবর রহমান

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ মাস

বাঙালি জাতির অহংকার ও গৌরবের মানসনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। শুধু তাঁর জন্মমাস হিসেবে নয়, অনেক কারণেই মার্চ মাস বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে সাফল্যমণ্ডিত ও তাত্পর্যপূর্ণ একটি মাস।

এ মাসেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নতুন রূপ লাভ করে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার, নিপীড়ন ও পাকিস্তানি বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এই মাসে। এই মাসের প্রতিটি দিন ছিল ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়। পুরো মার্চ মাস স্বাধীনতাকামী ও মুক্তিপাগল বাঙালি রাজপথ উত্তাল করেছে। বঙ্গবন্ধু সুশৃঙ্খল ও সাংবিধানিকভাবে তাঁর সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চক্রান্ত প্রতিরোধে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা দেশে শুরু হয় ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন। ‘পাকিস্তানে লাথি মারো, স্বাধীন বাংলা কায়েম করো’—এই স্লোগান সামনে নিয়ে সেদিন দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজপথে। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সফলতা হলো তিনি পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতাসংগ্রামের দিকে বেগবান করেন। প্রসঙ্গত পাকিস্তানি নেতা খান মোহাম্মদ ওয়ালি খান বলেছেন, ‘শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এবারের অসহযোগ আন্দোলন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের চেয়েও শক্তিশালী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক মাইলফলক। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের উত্তাল ভাষণের প্রতিফলন দেশ জন্মের পথে অগ্রসরতা। বস্তুত ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতারই ঘোষণা। সেই বক্তৃতায় পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বাঙালিদের অবস্থা, অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি, বাংলার প্রতিটি প্রান্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, শত্রুর মোকাবিলায় গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন ইত্যাদি তুলে ধরার পর বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। ’ বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সম্পর্কে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁর ‘ফেরারি ডায়েরি’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দলিল, লিংকনের গৃহযুদ্ধ ভাষণের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং শুধু ভাষণ হিসেবেও এমনি অনবদ্য যে তা নিঃসন্দেহে বিশ্বের ১০টি শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণের অন্যতম। এই ভাষণ শুধু যেন ভাষণ নয়, এক বীজমন্ত্র যা কোটি কোটি মানুষকে শুধু উদ্দীপ্ত করেনি, এক কঠিন সংগ্রামের দিকে পরিচালিত করেছে। যেন কোনো ব্যক্তি নয়, একটা আলোড়িত জাতির মর্মস্থল থেকে এই ভাষণের উত্পত্তি প্রাকৃতিক ঘটনার মতো। ’

১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর জেনারেলদের নিয়ে আলোচনার নামে ঢাকায় আসেন বাঙালি নিধনের নীলনকশা প্রণয়ন করতে। এর ফলে শুরু হয় ২১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বারা গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে তাঁর বাসভবনে বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন। সেদিন দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের কবল থেকে দেশ মুক্তিলাভের পথে পা বাড়ায় ও পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পায় প্রথম বাংলাদেশের নতুন পতাকা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদাত্ত আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। এরই মধ্যে সে রাতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে।

স্বাধীনতা লাভের পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে সংগ্রাম-লড়াই ও দিনরাত পরিশ্রম করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে  এগিয়ে নিয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে আজকের এই বাংলাদেশে পৌঁছতে অনেক চড়াই-উতরাই, জীবনদান ও কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে এই দলটির নেতাকর্মীদের। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যে সাহসী ও অদম্য পদক্ষেপে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্তমূলক ও প্রশংসনীয়। এখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও খাদ্য বিদেশে রপ্তানি করছি। সারা বিশ্বে খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও আমাদের এই সরকার দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের তুলনায় যথেষ্ট মজবুত ও ঊর্ধ্বগামী। তাই বিশ্বব্যাংককে তোয়াক্কা না করে এই সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দীর্ঘতম পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে। অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সামাজিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনায় অভাবনীয় সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছে।

 

লেখক : উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর


মন্তব্য