kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


শিল্পোদ্যোগ কার্যক্রমে মেধাবীদের অংশগ্রহণ

আবু তাহের খান

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শিল্পোদ্যোগ কার্যক্রমে মেধাবীদের অংশগ্রহণ

একসময় মনে করা হতো যে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, নয়া কিছু উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের মতো কাজগুলো যেহেতু বস্তুতই মেধাবীদের, সেহেতু মেধাবীরা মূলত এরূপ কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত পেশা হিসেবে শিক্ষকতা ও গবেষণায়ই যুক্ত হবেন। আর বাস্তবে ঘটেছিলও তাই।

তবে সময়ান্তরে সে ধারণা আমূল পাল্টে না গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যাখ্যা ও পরিধিতে অবশ্যই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আর সে পরিবর্তনের ধারায় যুক্ত হয়েছে এই অভিমত যে দার্শনিক জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মতো বিষয়গুলো এখন শিল্পের (industry) ক্ষেত্রেও প্রায় সমভাবে প্রযোজ্য এবং সে কারণেই এটা এখন বলার সময় এসেছে যে, যে কারণে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, সেই একই কারণে শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবেও মেধাবীদের এগিয়ে আসা জরুরি। এটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি সত্য অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও। তবে বিষয়টির বাস্তবতা উপলব্ধি করে অন্য বহু দেশে শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণরা যেভাবে এরই মধ্যে শিল্পোদ্যোগ কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছেন ও হচ্ছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনো সেভাবে ঘটেনি। অথচ এখানে এটি ঘটার সুযোগ ও সম্ভাবনা দুই-ই অন্য বহু দেশের চেয়ে অনেক বেশি। আর সে বিষয়টি নিয়েই এখানে খানিকটা আলোকপাত করা হলো।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাত পোশাকশিল্পে এখন নানা চরিত্রের ও মানের অসংখ্য উদ্যোক্তা থাকলেও মানতেই হবে যে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল একজন অত্যন্ত মেধাবী মানুষের হাত ধরে। বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা ‘দেশ গার্মেন্টসের’ প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নূরুল কাদের খানই বস্তুত তাঁর মেধা, দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা খাটিয়ে এ ধারণা ও উদ্যোগ সামনে নিয়ে এসেছিলেন যে বিপুল বেকারত্বের এ দেশে পোশাকশিল্পই আমাদের জন্য রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) চৌকস কর্মকর্তা ও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রথম ভারপ্রাপ্ত সংস্থাপন সচিব (এইচ টি ইমাম দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত) নূরুল কাদের খানের সেই মেধাবী চিন্তা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এ পোশাক খাতে পরবর্তী সময়ে এমন কিছু ধূর্ত উদ্যোক্তা যুক্ত হয়েছেন, যাঁদের কারণে এ খাতের ভাবমূর্তি       দেশ-বিদেশ উভয় স্থানেই মাঝেমধ্যে সংকটে পড়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যে এ খাতের শুরুটা যেমন একজন মেধাবী উদ্যোক্তার হাত ধরে হয়েছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ও বহু শিক্ষিত ও মেধাবী উদ্যোক্তার অংশগ্রহণে এ খাতে এমন বহু পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলোর আন্তর্জাতিক মান নিয়ে রীতিমতো গর্ব করা যায়।

পোশাক খাতের মতো বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিল্পের যাত্রাও বলা যায় মেধাবী উদ্যোক্তাদেরই হাতে। ড্যাফোডিল আইটির মতো প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের আইসিটি শিল্পে বিনিয়োগ ও টার্নওভারের ক্ষেত্রে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের তরুণ শিক্ষিত মেধাবী উদ্যোক্তাদের হাত ধরে নিকট-ভবিষ্যতের দিনগুলোতে এ হার আরো দ্রুতগতিতে বাড়বে বলেই আশা করা যায়। এটাও ধারণা করা যায়, আগামী দিনে এ খাতে যেসব নতুন উদ্যোক্তার আগমন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে, এ শিল্পের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যগত কারণে তাঁরাও হবেন তরুণ ও মেধাবী। আর তাঁদের হাত ধরে আগামী এক-দেড় দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের আইসিটি শিল্প খাত যদি পোশাকশিল্পের মতোই দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

প্রক্রিয়াজাতকৃত চিংড়ি রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? মূল কারণ প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির গুণগত মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের অসাধুতা। জানা যায়, এ অসাধুতার সঙ্গে এ খাতের শিক্ষিত মেধাবী উদ্যোক্তারা কখনোই জড়িত নন। কিন্তু পোশাক খাতের মতো শিক্ষা ও সচেতনতাবিহীন উদ্যোক্তা এ খাতেও রয়েছে; এবং বস্তুত তাদের কারণেই সম্ভাবনাময় এ চিংড়ি রপ্তানি নিয়ে বাংলাদেশকে বারবার সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

এভাবে উদাহরণের তালিকা হয়তো আরো দীর্ঘ করা যাবে। কিন্তু তালিকা দীর্ঘ করার চেয়েও এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে যেখানে মেধাবী উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করেছেন, সেখানেই অর্থাৎ সে শিল্পই গুণগত মান রক্ষা করে কাম্য মাত্রায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আর যেখানে মেধাবীদের ঘাটতি রয়েছে, সেখানেই তা মুখ থুবড়ে পড়ছে। জনশক্তি রপ্তানির মতো একটি সম্ভাবনাময় সেবা খাতের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বজুড়ে জনশক্তি রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমে শিক্ষিত উদ্যোক্তার অভাবে এটি হয়ে পড়েছে দালালসর্বস্ব তাচ্ছিল্যযুক্ত শব্দগুচ্ছের ‘আদম ব্যবসা’। অথচ শিক্ষিত উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ থাকলে এ খাতে একদিকে যেমন জনশক্তি রপ্তানির পরিমাণ বাড়ত, অন্যদিকে বিদেশ গমনেচ্ছু মানুষও প্রতারণামুক্ত পরিবেশে ও স্বল্প ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেত।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের মতে দেশে প্রাপ্য বর্তমান চামড়া ব্যবহার করেই এর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তত্পরবর্তী উত্পাদনপ্রক্রিয়ায় উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানির এ পরিমাণ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। তবে তা করতে হলে সর্বাগ্রে দরকার এ খাতে আরো বেশি সংখ্যায় শিক্ষিত-মেধাবী উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা। এ খাতের বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বলি, ঢাকার হাজারীবাগের যেসব ট্যানারি মালিক ক্ষতিপূরণের জন্য দরকষাকষি করে দুই দশক পার করেছেন সাভারের বিসিক শিল্পনগরীতে কারখানা স্থানান্তর করবেন কি না সে দোদুল্যমানতায়, সে আশায় না থেকে তাঁরা যদি নিজ দায়িত্বে আরো আগেই তা করে ফেলতেন, তাহলে এরই মধ্যে ওই ক্ষতিপূরণের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তাঁরা লাভবান হতে পারতেন। অনেকে বলেন, মেধাপ্রসূত চিন্তাভাবনার অভাবের কারণেই এমনটি ঘটতে পারেনি।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাবার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের কথা চিন্তা করেও শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে শিক্ষিত মেধাবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ধারণা করা যায়, অতীতের চালাক-চতুর উদ্যোক্তারা যেখানে ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিতে পারাটাকে নিজের ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জনের অন্যতম কৌশল হিসেবে গণ্য করতেন, সেখানে নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত উদ্যোক্তারা ভাববেন ব্যাংকঋণের সর্বোত্তম ও সৃজনশীল ব্যবহারের মাধ্যমে কিভাবে তা দ্রুত ফেরত দেওয়া যায় সেটি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ধারাবাহিকভাবেই সাড়ে ৬ শতাংশ বা তার কাছাকাছি পর্যায়ে অবস্থান করেছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়েই ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। আর এ উচ্চতর ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে অর্থনীতির যেসব খাতের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিল্প খাত। আশার কথা, এ খাতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে ১০ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করেছে এবং তাও শুধু ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের হিসাবে। সেবামূলক শিল্পকে এর সঙ্গে যোগ করা হলে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার আরো উচ্চতর হবে বলেই ধারণা করা চলে। আর এমনি প্রেক্ষাপটে বলা প্রয়োজন, শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির এ ধারাকে যদি ধারাবাহিকভাবে টিকিয়ে রাখতে বা তাকে আরো বেগবান করার চেষ্টা করতে হয়, তাহলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শর্তের পাশাপাশি সর্বাগ্রে এ খাতে শিক্ষিত মেধাবী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্প খাতে মেধা আকর্ষণের ওই কাজটি কিভাবে করা যাবে? প্রশ্নের জবাব বিস্মৃত হতে বাধ্য। এখানে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে শিল্পোন্নয়ন কার্যক্রমের সব পর্যায়ে অর্থাৎ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান থেকে শুরু করে শিল্পপ্লট, ঋণ, প্রণোদনা ইত্যাদি প্রাপ্তি ও আনুষঙ্গিক সব ক্ষেত্রে শিক্ষিত মেধাবী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর মনে রাখতে হবে যে এটি তার প্রতি কোনো পক্ষপাত নয়। এ খাতে উচ্চতর উত্পাদনশীলতা নিশ্চিতকরণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্যই এটি প্রয়োজন। আর এটাও মনে রাখা দরকার, ২০১৫-২০ মেয়াদি সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গড়ে ৮ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা শুধু বিনিয়োগ ও অবকাঠামো বাড়িয়েই হবে না—মেধাবী উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বস্তুত নয়া জ্ঞান সৃষ্টি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনার মতোই এ ক্ষেত্রেও মেধা সংযোজনের কোনো বিকল্প নেই, অন্তত আজকের এ প্রাযুক্তিক উত্কর্ষের যুগে তো নেই-ই।

 

লেখক :  গবেষক ও প্রাবন্ধিক

atkhan56@gmail.com


মন্তব্য