kalerkantho


ইউনিয়ন নির্বাচনপূর্ব দৃশ্যপট

এ এম এম শওকত আলী

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইউনিয়ন নির্বাচনপূর্ব দৃশ্যপট

পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় সব নির্বাচনী এলাকায় উৎসবের আমেজ দৃশ্যমান হয়। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য দলে দলে বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা প্রচারণায় লিপ্ত হয়।

   চা-দোকানিদের আয় বেড়ে যায়। কারণ অভিযোগ রয়েছে, বিনা পয়সায় ভোটারদের চা পানে আপ্যায়িত করা হয়। নির্বাচনপূর্ব দৃশ্যপটের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, ইউনিয়ন নির্বাচনের প্রচারণা সবচেয়ে বেশি হয়। ইউনিয়নের সংখ্যা ও প্রার্থীর আধিক্যই এর মূল কারণ। আগে একমাত্র জাতীয় নির্বাচনই দলীয় ভিত্তিতে করার নিয়ম ছিল। সম্প্রতি এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রথমে সিটি করপোরেশন, পরে পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে করা হয়। সবশেষে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনও হবে দলীয় ভিত্তিতে। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের বড় একটি ঝুঁকি হলো একই দল থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীর উদয়। উৎসব-আমেজমুখর নির্বাচনী পরিবেশের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দৃশ্য হলো সহিংসতা। বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতা অপেক্ষাকৃত কম হয়। এরপর আসে সিটি করপোরেশনসহ পৌরসভা। তারপর উপজেলা। সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয় ইউনিয়ন নির্বাচনের সময়। প্রায় সব নির্বাচনেই যে দৃশ্যপটটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সহিংসতা হয়। এক. নির্বাচন-পূর্ববর্তী। দুই. নির্বাচনের সময় অর্থাৎ ভোটের দিন এবং তিন. নির্বাচনের পরে। সব নির্বাচনেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগও মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা। নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলো নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করা। এ দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ এ সম্পর্কে মিডিয়ায় অনেক তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া সাধারণ নাগরিকরা এসব বিষয় নিয়ে মিডিয়ায় চিঠি লেখেন, যা প্রকাশও করা হয়।

নির্বাচনের আগে প্রার্থীসহ সমর্থকদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টিই মুখ্য। বিধি লঙ্ঘনকারীদের আইন মোতাবেক শাস্তি দেওয়ারও বিধান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের শাস্তি প্রদানে কমিশন সক্রিয় ভূমিকা পালনে ব্যর্থ। গত ১২ মার্চ কালের কণ্ঠে বিভিন্ন ব্যক্তির মতামত এ প্রসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। এ সংবাদের শিরোনাম ছিল—‘আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করুন’। মতামতের মুখ্য বিষয় ছিল আচরণবিধি লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ করা হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রকাশিত মন্তব্যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এসব মতামত প্রকাশের আগেও জাতীয় সংসদের কিছু সদস্যসহ মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তবে সব অভিযোগের বিষয়েই যে নির্বাচন কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করে তা নয়। ১১ মার্চ প্রকাশিত একটি সংবাদে এ ধারণার সত্যতা পাওয়া যায়। সংবাদটির শিরোনাম ছিল —‘অবশেষে এমপি রিমনের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত’। ‘অবশেষে’ শব্দটি তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, এর আগে পৌরসভা নির্বাচনে দুই দফা আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এমপি রিমনের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারকে নির্দেশ পাঠাবে। পরে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। ধারণা করা যায়, পৌরসভা নির্বাচনের অভিযোগের সময় সঠিক ব্যবস্থা নিলে হয়তো বা পুনরায় অভিযোগ উঠত না। এ ক্ষেত্রে ১১ মার্চ প্রকাশিত অন্য একটি সংবাদও প্রাসঙ্গিক। এতে দেখা যায়, আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাত্কার শেষে এ প্রতিশ্রুতি প্রকাশ্যে দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, পৌরসভা নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন দল সংসদ সদস্যদের এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলেছিল। পরে ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, কমিশনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সতর্কবাণী ও দলীয় সতর্কবাণী কিছু ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি।

প্রথম দফার অভিযোগ যে কমিশন আমলে নেয়নি সে বিষয়টি গত শনিবার অর্থাৎ ১৮ মার্চেও প্রকাশ করা হয়। বলা হয়েছে, এসব অভিযোগের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কমিশন তদন্ত করেনি। তবে দ্বিতীয় দফার অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে কমিশন কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। এ বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে আলোচ্য সংবাদে। প্রশ্ন করা হয়েছে—প্রথম দফার অভিযোগগুলোর কোনো তদন্ত হলো না এবং কোনো তদন্ত ছাড়াই কী ভিত্তিতে কমিশন সিদ্ধান্ত নিল যে এগুলো আমলযোগ্য নয়? আরো অভিযোগ করা হয়, প্রথম দফা ও দ্বিতীয় দফার এমন পার্থক্যের ফলে প্রথম ধাপের প্রার্থীরা আইনানুগ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অর্থাৎ কমিশন দ্বিচারিতার দায়ে অভিযুক্ত। জানা যায়, প্রথম ধাপের ৬২টি ইউনিয়নে একজন করে প্রার্থী থাকার ক্ষেত্রে তদন্ত করলে হয়তো কোনো অনিয়মের বিষয় জনগণ জানতে পারত। দুই ধাপের অভিযোগ একইভাবে গুরুত্ব দিলে সমতাভিত্তিক (খবাবষ চষধুরহম ঋরবষফ) ক্ষেত্র সৃষ্টি করে সুফল পাওয়া সম্ভব ছিল। প্রকাশিত সংবাদে কিছু পরিসংখ্যানে এ যুক্তির যথার্থতা পাওয়া যায়। যেমন প্রথম ধাপে বিএনপির অভিযোগ ছিল ৮৩টির বেশি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীরা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের বাধার কারণে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। অনেকের বাছাই প্রক্রিয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো সংখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে প্রশ্ন করা যায়, প্রচলিত আইন অনুসারে বাতিলের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করা যায়। সে বিষয়ে কোনো তথ্য সংবাদে ছিল না। তবে মূল অভিযোগ ছিল বাধার ফলে ১১৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। এর ফলে ৬২টি ইউনিয়নে একতরফা নির্বাচনে অন্য প্রার্থীরা জয়ী হবেন। প্রকাশিত সংবাদে আরো বলা হয়েছে, বাধা দেওয়ার অভিযোগ করতে রিটার্নিং অফিসারের দপ্তরে গেলেও কোনো ফল হয়নি। এরপর বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েও কোনো ফল হয়নি। কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রথম ধাপের অভিযোগ সম্পর্কে কমিশন সক্রিয় ও সচেষ্ট হলে এমন অবস্থা নাও হতে পারত। এর সপক্ষে কমিশনের কিছু কর্মকর্তার দাবি হলো, দ্বিতীয় দফায় সচেষ্ট হওয়ার ফলে অনিয়ম অনেক হ্রাস পেয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে একক প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৩।

১৩ মার্চ প্রকাশিত একটি খবরে নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙার প্রাসঙ্গিক তথ্য বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। স্থান ভোলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন। এ সংবাদের শিরোনাম ছিল—‘ভোলায় বিধি ভাঙার মচ্ছব, ব্যবস্থা নেই’। অর্থাৎ নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙার বিষয়টি নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ জেলায়ও কমিশনের স্থানীয় কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ও সচেষ্ট হওয়ার কোনো চিহ্ন নেই। প্রথম ধাপের নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচন কমিশন সক্রিয় হলে ৬৩টি ইউনিয়নের জন্য ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী হওয়া সম্ভব ছিল না। এ ধারণা কিছু বিশ্লেষকের। তাঁদের মধ্যে একজন বলেছেন, এ নির্বাচন নজিরবিহীন। এ ধারা চলতে থাকলে গণতন্ত্রের সুরক্ষা হবে না মর্মে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ মন্তব্যে আরো বলা হয়েছে, মোট ইউনিয়নের ৯ শতাংশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাশূন্য। এর সঙ্গে যোগ করা যায় অন্য একটি দৃশ্যপট। তা হলো নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা। সহিংসতা পূর্ববর্তী নির্বাচনেও হয়েছে। তবে মিডিয়ার কিছু প্রকাশিত প্রতিবেদনে মনে হয়, এবারের মাত্রা বহুলাংশে বেশি। উল্লেখ্য, ১২ মার্চ প্রকাশিত এক খবরে শিরোনাম ছিল সহিংসতা বাড়ছে। ১০ ও ১১ মার্চ নিহত এক, আহত ১৩০। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা চার। সহিংসতার জেলাগুলো হলো নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, বগুড়া, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ভোলা ও পাবনা। সহিংসতা বন্ধে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সতর্কবাণী দিয়েছে। ১৪ মার্চ প্রকাশিত খবরে নির্বাচনী সহিংসতা রোধে কমিশন জিরো টলারেন্স অর্থাৎ ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি বাস্তবায়ন করবে। শুধু কথায় নয়, কাজেও এ বিষয়টি দৃশ্যমান করতে হবে। পক্ষান্তরে এ কথাও সত্য যে বিভিন্ন জেলার আনাচকানাচে সহিংস ঘটনা রোধ শতভাগ করা যায় না। তবে এ কাজের জন্য তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পূর্ব পরিকল্পনার ও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না।

মিডিয়াসূত্রে জানা যায়, সর্বমোট ছয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। প্রতিধাপেই নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টির ইঙ্গিত প্রকাশিত কিছু খবরে দেখা গেছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনের দিন ও তারপর সহিংসতা হয়। কিন্তু জেলাওয়ারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার পরিকল্পনায় ভোটগ্রহণের দিনই এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিন পর্যায়েই সমান গুরুত্ব প্রদান করা শ্রেয়। বিশেষ করে নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা রোধ না করার ফলে ভোটাররা আশঙ্কাগ্রস্ত হবে। ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে সংশয়ে থাকবে। এ কারণেই তিন পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য