kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মুক্তিসংগ্রামে শহীদ দুই বিদেশি সাংবাদিক

চৌধুরী শহীদ কাদের

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিসংগ্রামে শহীদ দুই বিদেশি সাংবাদিক

দীপক ব্যানার্জি ও সুরজিৎ ঘোষাল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে শহীদ দুই ভারতীয় সাংবাদিক। দীপক ছিলেন অমৃতবাজার পত্রিকার সাব-এডিটর, বয়স পঁচিশের কোটায়। সুরজিৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র, আনন্দবাজার পত্রিকার শিক্ষানবিশ সাংবাদিক, বয়স বিশের কাছাকাছি। দুজনেই ছিলেন কাছের বন্ধু, স্বভাবে দুরন্ত, অ্যাডভেঞ্চারের নেশা ছিল খুব বেশি। একাত্তরের শুরুতে সরকার গঠন নিয়ে যখন অস্থিরতা চলছিল, ক্রমে উত্তাল হয়ে উঠছিল পূর্ব পাকিস্তান, তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন পূর্ব পাকিস্তানে আসবেন। ১ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের খবর সংগ্রহের জন্য তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়লেন পূর্ব বাংলায়। সঙ্গী দুটো ছোট ব্যাগ ও ক্যামেরা। শুরু করলেন খবর সংগ্রহ, তুললেন উত্তাল মার্চের অনেক ছবি। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তাঁরা এসে পৌঁছান চাঁদপুরে। সম্ভবত তারিখটা ছিল ২৬ মার্চ। চাঁদপুরে এসে তাঁরা দেখলেন সারা শহর কামান, সাঁজোয়া যান ও মেশিনগানে ভর্তি। দেখলেন নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার চিত্র। গোপনে এসব সামরিক অভিযানের কিছু ছবিও তুললেন।

কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা দেখে দীপক ও সুরজিৎ ভয় পেয়ে গেলেন। এই বিপন্ন সময়ে তাঁদের পরিচয় ঘটে চাঁদপুরের ছাত্রলীগ নেতা মুনীর আহমেদের সঙ্গে। মুনীর কলকাতা থেকে আগত এই দুই সাংবাদিককে রক্ষায় এগিয়ে এলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন গোপনে সোনামুড়া সীমান্ত দিয়ে তাঁদের আগরতলায় পাঠিয়ে দেবেন। ২৭ মার্চ ১৯৭১ সোনামুড়া সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরা প্রবেশের পথে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে আটক হন সবাই। তাঁদের নিয়ে আসা হয় আগরতলা বিএসএফ ক্যাম্পে। তাঁরা বিএসএফ কমান্ডারকে তাঁদের পরিচয় দেন। কমান্ডার কালিয়া অমৃতবাজারের আগরতলা প্রতিনিধি সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যকে ফোন করে তাঁদের বিষয়ে অবহিত করেন। দীপক অনিল ভট্টাচার্যের কাছে পরিচয় দিয়ে তাঁদের ছাড়িয়ে নিতে অনুরোধ করেন। অনিল ভট্টাচার্যের অনুরোধে বিএসএফ তাঁদের ছেড়ে দেয়। মুনীর সবাইকে নিয়ে অনিল ভট্টাচার্যের মেলার মাঠের বাসায় আশ্রয় নেন।

সম্ভবত অনিল ভট্টাচার্যের বাড়ি থেকে বের হয়ে তাঁরা সাংবাদিক রবীন সেনগুপ্তের বাড়িতে যান। উদ্দেশ্য অবরুদ্ধ বাংলাদেশের যে ছবিগুলো তুলেছিলেন সেগুলো প্রিন্ট করানো। কারণ রবীন সেনগুপ্তের একটি স্টুডিও ছিল, সেন স্টুডিও। চিত্রসাংবাদিক হিসেবে রবীন সেনগুপ্তের একটি সর্বভারতীয় পরিচিতি ছিল। রবীন সেনগুপ্ত আমাকে যে সাক্ষাত্কার দেন, তাতে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন। তাঁদের ধারণকৃত ছবিগুলোর রিল ডেভেপলপ করে সেগুলো প্রিন্ট করান। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার অনেক আলোকচিত্র সেখানে ছিল, ছিল বেশ কিছু দুর্লভ ছবি। এরপরই তাঁরা আবার অবরুদ্ধ পূর্ব বাংলার দিকে রওনা দেন।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশে এসে তাঁরা কী করেছিলেন, সেটা সুস্পষ্ট জানা যায় না। তবে তাঁরা মুনীরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মুনীর তাঁদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। আখাউড়া থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে তাঁরা চাঁদপুর যান, এরপর সম্ভবত যান কুমিল্লায়। কুমিল্লার কাছে কোথাও ছবি তুলতে গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলিতে তাঁরা শহীদ হন। ’ অন্য একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায়, ছবি তুলতে গিয়ে মুনীরসহ তাঁরা ধরা পড়েন। পাকিস্তানি সেনারা পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তাঁরা মুসলিম ও পূর্ব বাংলার লোক বলে পরিচয় দেন। কিন্তু কলেমা পড়তে বললে তাঁরা অসমর্থ হয়, এর পরপরই দুজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মুনীরের মাধ্যমে তাঁদের শহীদ হওয়ার খবর অনিল ভট্টাচার্যের কাছে পৌঁছে। তিনি তাঁদের পরিবারকে সেই সংবাদ দেন। অনিল ভট্টাচার্যের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, তাঁদের মৃত্যু নিয়ে একাত্তরে ভারতীয় পার্লামেন্টে ব্যাপক হইচই হয়। সুরজিতের মায়ের ধারণা, তাঁর ছেলে এখনো বেঁচে আছেন, পাকিস্তানে বন্দি।  

গত সাড়ে চার দশকে এই দুই শহীদ সাংবাদিক প্রায় বিস্মৃত। কেউ মনে রাখেনি তাঁদের, রাখেনি তাঁদের স্বজনদের খোঁজ। স্বাধীনতার মাসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই দুই শহীদ তরুণ সাংবাদিককে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক,

ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য