kalerkantho

26th march banner

এপার-ওপার

আম নয় আফিম

অমিত বসু

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘মাল’ ফারসি শব্দ। অর্থ সম্পদ। ‘দহ’ মানে সমুদ্র। দুইয়ে মিলে মালদহ। সম্পদ সমুদ্র। এত দিন মালদহের সম্পদ বলতে ছিল আম। রাজশাহীর মতোই আমে মাতাত দুনিয়া। বৈশাখেই গাছে গাছে আমের মুকুল। সুগন্ধে উদ্ভাসিত মালদা জেলা। এবার আমের জায়গায় আফিম। ইংরেজ শাসনের শুরুতে মালদা আলাদা জেলা ছিল না। এর কিছু অংশ ছিল পূর্ণিয়া জেলায়। বাকিটা দিনাজপুরে। ১৮৭৬ পর্যন্ত রাজশাহীতে। পরে ভাগলপুরে। ১৯০৫ সালে আবার রাজশাহীতে ফেরে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী মালদা ভারতের অংশ হলেও শিবগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাচোল, গোমস্তাপুর এখন বাংলাদেশে। মধ্যে দীর্ঘ ১৭৭ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া। মালদার আফিম সীমানা পেরিয়ে ঢুকছে বাংলাদেশে। বাধা দেবে কে? পুলিশ নিষ্ক্রিয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী নীরব দর্শক।

মালদার কালিয়াচকে চলছে আফিমের চাষ। পোস্ত গাছের রস থেকে আফিমের উদ্ভব। নেশার খোরাক। সীমান্ত পারাপারে আফিমের রসে মাতাতে চাইছে মাফিয়ারা। তাদের রোখার কেউ নেই। পকেটে টাকার থলি, হাতে বন্দুক। টাকায় কেনা, নয়তো অস্ত্রের শাসন। পুলিশ ভয়ে জেরবার। ৩ জানুয়ারি দিনে-দুপুরে আক্রান্ত কালিয়াচক থানা। দুষ্কৃতকারীদের বাধা দেওয়া দূরের কথা, প্রাণ বাঁচাতে পুলিশই পালায় থানা ছেড়ে। উর্দি পাল্টে মিশে যায় মানুষের মধ্যে। ফাঁকা থানায় অবাধে তাণ্ডব চলে। লুট হয় সব কিছু। প্রমাণ লোপাট করতে নথিপত্র পোড়ানো হয়। পুলিশের জিপে আগুন ধরিয়ে দেয় লম্পটরা। জেলার পুলিশ কর্তারা অনেক পরে ঘটনাস্থলে যান। গিয়েও কিছু করতে পারেননি। কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে কাগজ-কলমে রিপোর্ট লিখেছেন। পুলিশের বক্তব্য, থানায় এত লোক জড়ো হবে ভাবা যায়নি। ইন্টেলিজেন্সও আগে খবর দেয়নি। এ কথা অস্বীকার করেছে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ। তারা বলেছে, এ ব্যাপারে আগাম প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছিল। বিপুলসংখ্যক মানুষ যে জড়ো হবে তা-ও বলা হয়। আসলে কালিয়াচকে  অপরাধীরাই শাসক। ওদের হাতে এত অস্ত্র আছে যে পুলিশের কাছেও নেই। এলাকায় ঢুকতে হলে যথেষ্ট নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে যেতে হয়।

আফিম মাফিয়াদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষও কম নয়। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল। কারো কিছু বলার নেই। আফিমের সঙ্গে জাল নোটের ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে। কালিয়াচকে আফিমের চাষ হয় ১০ হাজার বিঘা জমিতে। গোটা মালদায় হয় ৮০ হাজার বিঘায়। টাকার জোরে সব কাঁটা উপড়ে আফিম ঢুকছে বাংলাদেশে। নির্বাচনের মুখে মাফিয়াদের অবস্থা পোয়াবারো। একমাত্র তারাই সেখানে ভোটের গ্যারান্টি দিতে পারে। তাদের আটকালে ভোট কাটা যাবে। মাঠে মরবে প্রার্থীদের বিধায়ক হওয়ার স্বপ্ন।

আঙুল উঠছে শাসকদল তৃণমূলের দিকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। পুলিশ তাঁর আজ্ঞাবহ দাস। পুলিশকে তিনি সক্রিয় করছেন না কেন? মমতাও কি আফিম মাফিয়াদের ভয় পাচ্ছেন? তিনি তো কালিয়াচকে নয়, কলকাতায় থাকেন। মাফিয়া দমনে দরকার হলে দিল্লির সাহায্য নিতে পারেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে কথা বলে আধাসামরিক বাহিনী বা সামরিক বাহিনীও আনাতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তাঁর। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেও মমতা যদি মৌনব্রত অবলম্বন করেন, তাহলে তাঁকে ঘিরে তো প্রশ্ন উঠবেই।

মালদার ঐতিহ্য সীমাহীন। ১২৮৭ সাল পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯ জন শাসক এই অঞ্চলে রাজত্ব করেন। স্বাধীন সুলতানি আমলের শুরু ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের আমলে।

সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময় ১৫০০ সালে শ্রীচৈতন্য দেব সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী প্রচার করতে মালদায় যান। হুসেন শাহের দুই সভাসদ রূপ ও সনাতনের সঙ্গে দেখা করেন মালদার রামকেলিতে। সেই ঘটনা স্মরণ করে আজও জ্যৈষ্ঠের শেষ দিনে রামকেলিতে মেলা বসে। হুসেন শাহের আমলে বাংলা সাহিত্য উত্কর্ষ লাভ করে।

১৭৬৩ সালে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আঁচ টের পেয়েছিল মালদাও। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ইংরেজদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে পুরুলিয়া, বীরভূম, বিহারের সাঁওতাল পরগনা থেকে সাঁওতালরা মালদায় চলে আসে। ১৯৩২ সালে এই সাঁওতালরাই জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তাদের তীর-ধনুক, বল্লম-তলোয়ারের সঙ্গে যুদ্ধ হয় ইংরেজ পুলিশের বন্দুকের।

লক্ষ্মণ সেনের সময় রাজধানী ছিল মালদার ইংলিশ বাজারের কাছে লক্ষেৗতিতে। জায়গাটা কালিন্দী নদীর দক্ষিণে, মহানন্দা নদীর পশ্চিমে দিয়ারা অঞ্চলে। ইংলিশ বাজারের পাশেই কালিয়াচক। যেখানে আজ মাফিয়া রাজত্ব। এবিএ গনি খান চৌধুরী যখন মালদা থেকে সাংসদ হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন, মালদাকে তিনি সোনা দিয়ে মুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সংসদে এ জন্য তাঁকে কম ঠাট্টা শুনতে হয়নি। সবাই বলত, গনি খান দিল্লির মন্ত্রী নন, মালদার মন্ত্রী। গনি খান জবাব দিতেন, মালদাটা কী ভারতের বাইরে!

গনি খান চলে যাওয়ার পর তাঁর উন্নয়নে ভাগ্নি মৌসম নূর মালদার সাংসদ। মালদায় তিনিও সক্রিয়। তাঁর দল কংগ্রেসের সহযোগিতা তিনি পান। মৌসমের সঙ্গে মমতার রেষারেষি রাজনৈতিক কারণে। তৃণমূলকে তিনি দুই চক্ষে দেখতে পারেন না। কালিয়াচকের এ অবস্থার জন্য পরোক্ষে তিনি মমতাকেই দায়ী করছেন। মালদায় তাঁর মাটির টান। মালদার কোনো অঞ্চলে কাঁটা বৃষ্টি হলে তিনি সইবেন কী করে! মমতা সত্যিটা উপলব্ধি করলেও কিছু করতে পারছেন না। গরজ বড় বালাই। যেখানে যাই ঘটুক দেখার চেয়ে, তৃণমূলের পালে হাওয়া লাগছে কি না সেটা দেখা তাঁর কাছে বেশি জরুরি। নির্বাচনে জয়ের দীপ যেন নিভে না যায়।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য