kalerkantho


আমিও আসাদের অগ্রিম মৃত্যুসংবাদ লিখেছিলাম!

রবার্ট ফিস্ক

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আমিও আসাদের অগ্রিম মৃত্যুসংবাদ লিখেছিলাম!

গত মাসে আমি সিরিয়া ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, দামেস্কের এক কফির দোকানে আমার দিকে এগিয়ে আসেন একজন সুদর্শন, ফরাসি বংশোদ্ভূত লেবাননি; পরিচয় দিলেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রকৌশলী হিসেবে। বললেন, সিরিয়ার বিধ্বস্ত শহরগুলোর পুনর্নকশাকরণের কাজটি তিনিই করছেন।

সিরিয়া ট্র্যাজেডি শুরুর পাঁচ বছর পর এমন দৃশ্য হবে, কেউ কি ভাবতে পেরেছিল! গাদ্দাফিকে ধ্বংস করার পর বিপজ্জনকভাবে উদ্ধত পশ্চিমা শক্তি বরং ভেবেছিল আসাদের সাম্রাজ্যের বিনাশও আসন্ন। এই আসাদ আজ ধ্বসংস্তূপ পুনর্নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ওই সময় ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক বার্তা দিয়েছিল আসাদের দিন শেষ। মিসেস ক্লিনটনের মুখে শোনা গিয়েছিল, ‘আসাদকে যেতেই হবে’। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এই ধরিত্রীতে আসাদের বেঁচে থাকার অধিকারই নেই’! যদিও গ্যালাক্সির ঠিক কোন অংশটায় আসাদকে নির্বাসনে যেতে হবে তার নাম মন্ত্রী জানাতে পারেননি। এমনকি আমি নিজে আমার দৈনিক ইনডিপেনডেন্টের অনুরোধে আসাদের মৃত্যুসংবাদ আগেভাগে তৈরি করে ফেলতে বাধ্য হই। অফিসের আর্কাইভে সে খবর আজও যত্নেই তোলা আছে।

যখন পেছন ফিরি, বুঝতে কষ্ট হয় না আমরা সবাই কোথায় ভুল করেছিলাম। আমরা আসলে একের পর এক আরব বিপ্লবে চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।

তিউনিসিয়া, সেখান থেকে মিসর, তারপর লিবিয়া! সাংবাদিকরা বেশি বেশি করে আরব রাজধানীগুলোকে ‘স্বাধীন’ লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, সেসব দেশের স্বৈরশাসকরা সবাই ছিলেন সুন্নি মুসলমান। আমরা এ-ও ভুলে গিয়েছিলাম, সেই স্বৈরশাসকদের সমর্থনে কোনো আঞ্চলিক সুপার পাওয়ার নেই। সৌদি আরব মিসরে হোসনি মুবারককে রক্ষা করতে পারল না। কিন্তু শিয়া ইরান তাদের একমাত্র আরব মিত্র আলাবাইট-শিয়া নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার পতন দেখতে তৈরি ছিল না।

আসলে মধ্যপ্রাচ্যের গৃহযুদ্ধকে সাম্প্রদায়িক পরিচিতি দেওয়ার সময় অনেক তথ্যই লুকানো হয়। আমরা এই সত্যটি বলি না যে ১০০ বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্ব এই অঞ্চলে ‘জাতীয়’ সরকার গঠনের জন্য এমনভাবে সরকার সাজিয়েছে, যা ছিল চরিত্রগতভাবেই সাম্প্রদায়িক। ১৯১৪-১৯১৮ যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে এমনটি দেখেছি, সাইপ্রাস ও লেবাননেও দেখেছি। এসব জায়গায় যেমন সুন্নি সম্প্রদায়কে সামনে রাখা হয়েছে, সিরিয়ায় আনা হয়েছে আলাবাইট-শিয়া সম্প্রদায়কে এবং কাজটি করেছে ফরাসিরা ‘ফোসে স্পেশিয়ালে’ হিসেবে। ২০০৩ সালের পর ইরাকেও এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের খেলা চলেছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষকে চারিত্রিকভাবে সাম্প্রদায়িক হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছি। আমরা ভুলে গেছি, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও তাদের পছন্দের নেতাকে নির্বাচিত করার অধিকার রাখে।

আর আমরা সাংবাদিকরাও কম যাই না। আমরা প্রতিনিয়ত পাঠক ও দর্শকদের বলছি যে আসাদ সরকার মানেই আলাবাইট-শিয়া সম্প্রদায়ের সরকার। আমরা এ কথা ভুলে গিয়েছিলাম কিংবা মনে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি যে এই আসাদ সরকারেরই সেনাবাহিনীর সম্ভবত ৮০ শতাংশ সদস্য সুন্নি সম্প্রদায়ের। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, এই সুন্নি মতের সেনাসদস্যরা একই মতের অনুসারী বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়েছে। ২০১৪ সাল থেকে তারা যে আল-কায়েদা বা নুসরার সঙ্গে ও পরবর্তী সময়ে ইসলামিক স্টেট-আইএসের সঙ্গে লড়ছে তারাও সুন্নি ইসলামেরই অনুসারী।

সব গৃহযুদ্ধেই বিশেষ ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যেও হচ্ছে। মাদায়ার সুন্নি সম্প্রদায়ের মানুষ সিরীয় সৈন্যদের অবরোধের কারণে না খেয়ে মরছিল, বিদ্রোহী বিরোধীপক্ষগুলোর হাতেও অনেক গ্রাম ছিল। সেখানেও মানুষ খাবার পাচ্ছিল না। কিন্তু আমরা সংবাদ প্রতিবেদন থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিপীড়নের তথ্য অতি যত্নে মুছে দিয়েছি। যখন জাহরা ও নুবলের মতো কোনো শিয়া গ্রামকে সরকারি আধাসামরিক বাহিনীর হাত থেকে সাড়ে তিন বছর পর আল-নুসরা গোষ্ঠী কেড়ে নেয় তাদের এই ‘বিজয়’ আমরা কমই উল্লেখ করি।

কিছু ‘রেড লাইন’ বা লালরেখাও আমাদের সামনে এঁকে দেওয়া আছে, যেগুলো আমরা অতিক্রম করে যেতে পারি না। তার একটি জাতিসংঘ। আমরা সবাই বলি বা বিশ্বাস করি, দামেস্কে আসাদ তাঁর নিজের লোকজনের ওপর অস্ত্র হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করেছেন। অন্তত জাতিসংঘ প্রতিবেদন আমাদের এ রকমই বিশ্বাস করতে বলে। কিন্তু জাতিসংঘের এই দাবির পক্ষে তো যথেষ্ট ও জোরালো তথ্য নেই!

সিরীয় আর্মি জয়ের রথ উড়িয়ে চলেছে। সিরিয়ার শহরগুলোতে আমার চোখে পড়েছে একটি নতুন পোস্টার। বাসার আল আসাদের পাশে একটি নতুন মুখ। কর্নেল সোহেইল আল হাসান—আর্মিরা যাঁকে বলে থাকে ‘টাইগার’। অনেকের চোখেই সোহেল সিরিয়ার সফলতম সেনা অধিনায়ক, ‘রোমেল’ অব সিরিয়া। তাঁর সঙ্গে আমারও দেখা হয়েছে। সেও নিষ্ঠুর স্বভাবের। কিন্তু আসাদের পাশে তাঁর ছবি আমাদের দেখতে হচ্ছে। আর্মি এখন আসাদের অনুগত। আসাদ যখনই ভাষণ দেন, সেনাবাহিনীর ‘শহীদ’দের আত্মত্যাগের কথা বলতে ভোলেন না।

সিরিয়ার পতন হয়নি। আসাদ হারেননি। এ কারণেই এখন ফরাসি ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ফের বৈরুত থেকে দামেস্কে দৌড়াচ্ছেন সিরিয়ার গোয়েন্দা সার্ভিসে নতুন করে কনটাক্টের জন্য? এ জন্যই কি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এখন পরামর্শ দিচ্ছেন আমেরিকানরা আবারও আসাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে?

নীতিগতভাবে আমি সেনাবাহিনী পছন্দ করি না, তারা যার জন্যই কাজ করুক। তার মানে এই নয়, আমরা তাদের অবহেলা করতে পারি। আসাদও পারেন না।

 

লেখক : খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক; ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি

ইনডিপেনডেন্ট থেকে ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস


মন্তব্য