kalerkantho


রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ

হায়দার আকবর খান রনো

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ

গত ১০ মার্চ থেকে বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র ঢাকা থেকে রামপাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ দিনের লংমার্চ হয়। এ জাতীয় কমিটি রামপাল অভিমুখী লংমার্চ আগেও করেছে। এটি প্রতিবাদের একটি ফর্ম। কিসের প্রতিবাদ?

সুন্দরবনের গা-ঘেঁষে সরকার যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারই বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কেন? কারণটা খুবই সহজ। সুন্দরবনের একেবারে গা-ঘেঁষে, ৯ থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যেই (বাফার জোন ধরলে দূরত্বটি আরো কম) যে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে সুন্দরবন দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরিবেশ নষ্ট হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে গাছপালা, প্রাণহানি ঘটবে বনজ প্রাণীর ও নদীর মাছের। ইউনেসকো যে সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক হেরিটেজ হিসেবে নির্দিষ্ট করেছে, আমরা কি সেই সুন্দরবন ও তার অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে দেব শুধু কিছু বিদ্যুৎ উত্পাদনের জন্য? সুন্দরবনের আরেকটি বড় ভূমিকা আছে। সিডর, আইলা এ ধরনের বড় ঝড়-তুফানের হাত থেকে জনপদকে রক্ষা করে, মা যেভাবে তার সন্তানকে আগলে রাখে সেভাবে। সেই সুন্দরবনের অনিষ্ট আমাদের কারো কাম্য নয়।

১০ মার্চ লংমার্চ শুরুর দিনই কালের কণ্ঠ’র পাতায় বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আহমদ রফিক এক নিবন্ধে (রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিকল্প ভাবনা) লিখেছেন, ‘সরকারের প্রধান দাবি, জনগণকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্যই রামপাল প্রকল্প, যাতে প্রতি ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা চলে, ঠাণ্ডা যন্ত্র চলে। এ দাবির গুরুত্ব যথোচিত। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অবিকল্প সম্পদ সুন্দরবন নষ্ট করে বিদ্যুৎ উত্পাদনের পেছনে যুক্তি থাকতে পারে না। বিশেষ করে যখন পরিবেশ দূষিত না করে বিকল্প বিদ্যুৎ উত্পাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন—বায়ুচালিত বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ, জলস্রোত থেকে উদ্ভূত বিদ্যুৎ; এমনকি বর্জ্য পদার্থ থেকে বিদ্যুৎ উত্পাদন। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের গবেষকরা এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট আগ্রহী, যা বিবেচনার দাবি রাখে। ’

বাংলাদেশ সরকার ভারতের একটি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিডিবিকে যৌথভাবে রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে। নির্মাণ খরচের ১৫ শতাংশ দেবে ভারতীয় কম্পানি, ১৫ শতাংশ বাংলাদেশের পিডিবি। বাকিটা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করা হবে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে যে বাকি অংশের বেশির ভাগই ভারতের কাছ থেকে পাওয়া যাবে ঋণ আকারে। ঋণের চড়া সুদ ১৪ শতাংশ। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী হিসেবে থাকবে ভারতের বিভিন্ন কম্পানি। লাভটা যে ভারতেরই হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই কয়লা আসবে বাইরে থেকে। বঙ্গোপসাগর দিয়ে সুন্দরবনের নদীর মধ্য দিয়ে। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের ভেতর জাহাজডুবির কারণে যে বিরাট পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছিল, ভবিষ্যতে তেমন আশঙ্কা বাতিল করা যায় না। ভারতের কম্পানি ও বাংলাদেশের পিডিবি মিলিতভাবে উত্পাদন করবে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।

শুধু ভারতের কম্পানি কেন, ওরিয়ন নামে একটি দেশীয় কম্পানিকেও একবারে সুন্দরবনের ভেতরেই মংলা বন্দরের পাশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তারা উত্পাদন করবে ৬২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

ভারতের কম্পানি তো ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের কাছাকাছি কোথাও প্রকল্প নির্মাণ করতে পারত। হ্যাঁ, পারত। কিন্তু ভারত সরকার অনুমতি দেয়নি। কারণ একই। সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তারা চলে এসেছে বাংলাদেশে। এরা খুব সহজেই সরকারি অনুমতি পেয়ে গেছে। ভারতের ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনসংক্রান্ত গাইডলাইন ১৯৮৭’, ‘ভারতের ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২’ ও ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘পরিবেশ সমীক্ষা (EIA) গাইডলাইন ম্যানুয়েল ২০১০’ অনুযায়ী বনাঞ্চল বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য, জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান, জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি এলাকার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা যাবে না। ভারতের পরিবেশগত কারণে কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয় ২০১৪ সালে। একই কারণেই এনটিপিটি পশ্চিমবঙ্গে অনুমতি না পেয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশে। পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এই বিবেচনা থেকেই পরিবেশ সচেতন নরওয়ে ভারতের এই কম্পানি থেকে ৪৩০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে।

আমাদের বলা হচ্ছে যে রামপাল প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যাতে পরিবেশ দূষিত হবে না। আসলে কথাটা  সত্য নয়। যে প্রযুক্তি ব্যবহূত হবে তাতে বড়জোর ১০ শতাংশ ক্ষতি কম হতে পারে। এই প্রকল্প থেকে যে বিষাক্ত ছাই বাইরে ছিটকে পড়বে, তা গাছপালা-পশুপাখির জীবনে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করবে। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার এই যে সিলেটের সিমেন্ট কম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এই বলে যে সেই ছাই দিয়ে সিমেন্ট তৈরি হবে। বিদ্যুৎ উত্পাদনের বাই প্রোডাক্ট দ্বারা যদি অন্য একটি দ্রব্য উত্পাদিত হয়, তা ভালো কথা। কিন্তু একই সঙ্গে যে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। আমরা যে হারাব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সুন্দরবন, সেই দায় কে নেবে?

আজকাল উন্নত বিশ্বে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ ক্রমাগত কমে আসছে। কারণ এখান থেকেই সবচেয়ে বেশি বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়। সে জন্য জার্মানিতে বিশেষ করে বাতাসকে ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ নির্মাণ কেন্দ্রের প্রচলন  হয়েছে। অবশ্য এখনো প্রায় ২৭ শতাংশ বিদ্যুৎ উত্পন্ন হয় কয়লা থেকেই। মোট উত্পাদনের পরিমাণ ৩৮.৪৯৭–১০৩ গিগাওয়াট ঘণ্টা। সে তুলনায় ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার হয় বেশি—৩৩.৫০ শতাংশ। এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার হয় ২০.৯০ শতাংশ। নিউক্লিয়ায় পাওয়ার ব্যবহার হয় এখনো অনেক কম। এতে ঝুঁকিও বেশি। এমনকি উন্নত দেশও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার থেকে সরে আসছে। উন্নত দেশে সমুদ্র, পাহাড়ি নদী, বাতাস ইত্যাদির ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা যাচ্ছে। এনার্জি বিশেষজ্ঞ  ডিবি রহমতউল্লাহ এক লেখায় জোরের সঙ্গে দাবি করেছেন যে বিদ্যুৎ উত্পাদনে কয়লার বিকল্প আছে। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘...আর্থসামাজিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ দরকার তা কি কয়লা বাদে অন্যান্য জ্বালানি থেকে পাওয়া সম্ভব?’ তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন, ‘অবশ্যই সম্ভব এবং অনেক সাশ্রয়ী ও টেকসইভাবেই সম্ভব। ’ তিনি অভিযোগ করেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজস্ব মুনাফার স্বার্থে তা করতে দিচ্ছে না। তারা তাদের ওপর নির্ভরশীল সরকারগুলোর মাধ্যমে ‘আমাদের টেকসই পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উত্পাদনে বাধা দিয়ে পরিবেশ ধ্বংসকারী জ্বালানি প্রকল্প গ্রহণ করাচ্ছে। ফলে আমরা যেমন ব্যয়ও করছি বেশি, তেমনি আবহাওয়ায় বিপর্যয় ঘটাচ্ছি। ’

উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু সে জন্য কি পরিবেশ ধ্বংস করে? বিশেষ করে সুন্দরবনের এত বড় ক্ষতি সাধন করে?

সরকারকে আমরা গোটা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। প্রথমত, সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা হোক। দ্বিতীয়ত, কয়লার বিকল্প যখন আছে, তখন সেই বিকল্প পথেই বিদ্যুৎ উত্পাদন করা হোক, যা হবে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই।

লেখক : রাজনীতিবিদ


মন্তব্য