kalerkantho

মুজিব টেকস ওভার

ড. আবু সাইয়িদ

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুজিব টেকস ওভার

শিরোনামটি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপনীয় নথি (২০৫২০) থেকে নেওয়া। বলা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করেছেন। প্রাদেশিক পরিষদে তাঁর দলের সদস্যসংখ্যা ৩০০ জনের ভেতরে ২৮৮ এবং জাতীয় পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। শেখ মুজিব ও তাঁর দল ক্রমাগতভাবে সামরিক ফরমান অগ্রাহ্য করে চলেছেন। কিন্তু সামরিক জান্তা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে দুটি মূল সমস্যা ছিল—ক. বঙ্গবন্ধু কৌশলে অসহযোগ ও অহিংস কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রচলিত রীতি। খ. পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে যে বিদ্রোহ দেখা দেবে, তা দীর্ঘকাল দখলে রাখার সক্ষমতা তাদের ছিল না।

এ সময়ের মধ্যেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল অঙ্গ বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং সংসদ—তিনটিই তাঁর করায়ত্ত। বিচার বিভাগ অচল হয়ে পড়েছিল। কোর্ট-কাছারি বন্ধ। এমনকি টিক্কা খান ৭ই মার্চ এসে তাঁকে শপথ দেওয়ার জন্য প্রধান বিচারপতি এ বি সিদ্দিকীকে অনুরোধ জানালে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা প্রত্যহ ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে প্রদত্ত নির্দেশ পালন করতেন। সংসদ সদস্যরা বেশির ভাগই স্ব-স্ব নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে ৭ই মার্চে প্রদত্ত নির্দেশ বাস্তবায়নে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। অস্ত্রের দোকান ও বিভিন্ন পুলিশ ফাঁড়ি ও থানা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

এ অবস্থায় ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তড়িঘড়ি করে ঢাকার পথে রওনা দেন। তার আগেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ও তাঁর নির্দেশে তাজউদ্দীন আহমদ যিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তিনি ৩৫টি নির্দেশনা জারি করেন। অফিস-আদালত, কোর্ট-কাছারি কিভাবে চলবে, প্রশাসনযন্ত্র কিভাবে চলবে তারও দিকনির্দেশনা দেন। সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি ব্যাংক-বীমা, শ্রমিক সংস্থা, আইনজীবী, বেতার-টিভি সব কিছুই বঙ্গবন্ধুর আদেশে-নির্দেশে চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাপর যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, পাশাপাশি মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু যে ৩৫টি নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে। পাশাপাশি সামরিক কর্তৃপক্ষ ১১৫ নম্বর সামরিক আইন জারি করে। তাজউদ্দীন আহমদ এর প্রতিবাদ করে বলেন, ‘এই সব সামরিক ফরমান মানি না। আমরা আমাদের মতো চলব। ’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার হুকুম মতো দেশ চলবে। ’

১৫ মার্চ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করেন। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টকে ‘অতিথি’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তাঁর যেন কোনো অপমান না হয়। ’ প্রেসিডেন্ট ভবন রক্ষা থেকে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত রাজপথে দেওয়া ব্যারিকেডগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে ‘অতিথি’ বলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করলেন, তিনি একটি নতুন রাষ্ট্রে পদার্পণ করেছেন। যে নবরাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’। যার ‘পতাকা’ নির্ধারিত এবং দেশটির জাতীয় সংগীতও বিদ্যমান। সর্বোপরি একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জনগণ এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বাধিনায়ক ও রাষ্ট্রপতি পদে ৩ মার্চ বরণ করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের সঙ্গে শাসনতান্ত্রিক ব্যাপারে আরো আলাপ-আলোচনার জন্য ঢাকা এলেন। সেদিন ‘টাইম’ সাময়িকী নিউ ইয়র্ক থেকে লেখেন, আসন্ন বিভক্তির (পাকিস্তানকে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণতকরণ) পশ্চাতে যে মানবটি রয়েছেন তিনি হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। গত সপ্তাহে ঢাকায় শেখ মুজিব ‘টাইম’-এর সংবাদদাতা ডন কগিনকে বলেন, বর্তমান পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে, সমঝোতার আর কোনো আশা নেই। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক পৃথক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কথা বলেন এবং জানান যে তাঁর অনুগামীরা কেন্দ্রীয় সরকারের কর দিতে অস্বীকার করেছে, যা কি না পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত। মনে হচ্ছে, তিনি তাঁর ভাষায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছেন। এর দুই দিন আগে পূর্ব পাকিস্তানের এই নেতা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সম্পর্কে বলেন, ‘আমি তাদেরকে পঙ্গু করে দেব এবং তাদেরকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করব। এ ধরনের একটি বিবৃতির পর সোজাসুজি স্বাধীনতা ঘোষণা আর অতি নাটকীয় কিছু নয়। ’

লেখক : গবেষক ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী


মন্তব্য