kalerkantho

26th march banner

মগজ ধোলাই

এ কে আজাদ

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ কোনটি—এমন প্রশ্ন করলে মগজ মশাই যে নিজের দিকেই আঙুল দিয়ে দেখাবেন তাতে আর আশ্চর্য কি! নাতিদীর্ঘ এ দেহের তাবত রথী-মহারথী তা সে হূিপণ্ড বা ফুসফুস বা বৃক্ক—যেই হোন, মন খারাপ করলেও জটিলতার দৌড়ে যে তারা যোজন যোজন পেছনে এ কথা তাদের কবুল করতেই হবে! জটিল আমাদের দেহযন্ত্রের জটিলতম অংশটি ভারে ছোট হলেও কাজে মোটেও ছোট নয়। শরীর মহাশয় যে পরিমাণ শক্তি খাওয়াদাওয়া করে তৈরি করেন, তার ২০ থেকে ২৫ শতাংশই মগজের জন্য ব্যয় হয়।

এত কাজ করবেন আর জঞ্জাল হবে না—তা কী আর হয়? প্রতিদিন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মগজ প্রায় গ্রামপাঁচেকের মতো বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি করে। টিকে থাকতে হলে মস্তিষ্ককে হয় এ বর্জ্য বের করে দিতে হবে অথবা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে তার বিষাক্ততা মুক্ত করে অন্য কাজে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু মগজ কিভাবে বিষাক্ততা মুক্ত হয়? জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অভাবনীয় সব আবিষ্কার সত্ত্বেও এ প্রশ্নের কোনো জুতসই জবাব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

প্রায় বছরপাঁচেক আগে রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইকেন নেডারগার্ড ও স্টিভেন গোল্ডম্যান এ বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। বর্জ্য অপসারণের এ পদ্ধতি জানার চেষ্টা তাঁরা শুধু রহস্য উদ্ঘাটনের আনন্দের জন্যই করেছিলেন এমন নয়। অপসারণপদ্ধতি আলঝেইমারের মতো স্নায়ুবিনাশী রোগব্যাধির ওপর এ পদ্ধতি কতটা প্রভাব ফেলে সেটি জানাও ছিল তাঁদের এ গবেষণার উদ্দেশ্য। তাঁরা ভাবলেন, ভেঙে যাওয়া এসব প্রোটিন বের না হতে পারলে স্নায়ুকোষের আশপাশে জমা হবে। স্নায়ুবিনাশী রোগব্যাধিতে আক্রান্ত লোকজনের মগজের কোষের আশপাশে প্রোটিন যে জমা হয় সেটি আগেই জানা ছিল। আর এ তথ্যই তাঁদের এ কাজে আরো উৎসাহিত করে তোলে। এই দানা বাঁধা প্রোটিন স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে ইলেকট্রিক ও রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদানে বাধা দেয়। আমরা জানি, এ ধরনের সংকেত আদান-প্রদানের মাধ্যমেই মস্তিষ্ক কাজ করে। এ কাজ বাধাগ্রস্ত হলে মস্তিষ্কের পক্ষে কাজ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এর আগে গবেষণা প্রণালীতে এ ধরনের প্রোটিন বর্জ্যের অতিরিক্ত উত্পাদন করে তাদের মধ্যে আলঝেইমার, পার্কিনসনসের মতো স্নায়ুবিনাশী রোগের লক্ষণ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।

মস্তিষ্ক ছাড়া দেহের আর সব অঞ্চলের প্রোটিন বর্জ্য দেহের তরল পরিবহনব্যবস্থা, যাকে আমরা লিম্পফ্যাটিক সিস্টেম বলি, তার মাধ্যমে কোষ থেকে অপসারণ করে। শত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবে আসছেন, মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে লিম্পফ্যাটিক সিস্টেম নেই এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজটি মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ড নিজেই করে থাকে। মেইকেন ও স্টিভেন তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, এ ধারণাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালিগুলো ঘিরে আছে ডোনাটের আকৃতির একটি জায়গা। একে বলা হয় পেরিভাস্কুলার স্পেস। এই পেরিভাস্কুলার স্পেসের ভেতরের দেয়াল এন্ডোথেলিয়াল কোষ ও সাধারণ মাংসকোষ দিয়ে গড়া, কিন্তু দেয়ালের বাইরের অংশে থাকে এস্ট্রোসাইট নামে এক ধরনের বিশেষ কোষ, যা মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ড ছাড়া কোথাও দেখা যায় না। এই এস্ট্রোসাইটের বর্ধিতাংশ, যা এস্ট্রোসাইটের পা নামে পরিচিত, তা মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের সব শিরা-উপশিরাকে ঘিরে থাকে। এস্ট্রোসাইটের পা ও শিরা-উপশিরার মধ্যের টিউবের মতো দেখতে ফাঁকা জায়গা মস্তিষ্কের তরল সরিয়ে ফেলার একটি বাধাহীন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ক্ষেত্রটি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ওয়াকিবহাল থাকলেও এদের কাজ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। বছরতিরিশেক আগে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাট্রিসিয়া গ্রাডি এক গবেষণায় এই এলাকায় তরল প্রবাহের বর্ণনা দিয়েছিলেন। ভদ্রমহিলা কুকুর ও বিড়ালের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরসে বৃহদাকৃতির প্রোটিন ঢুকিয়ে দেখতে পান যে এরা শিরা-উপশিরাকে ঘিরে বর্ণিত ক্ষেত্রে চলে গেছে। তবে সে সময় এ-সংক্রান্ত গবেষণা আর খুব বেশি এগোয়নি।

মেইকেন ও স্টিভেন তাঁদের গবেষণা শুরুর সময় তখনকার একটি নতুন আবিষ্কারের ওপর মনোনিবেশ করলেন। এতে দেখানো হয়েছে যে এস্ট্রোসাইটের পা একোয়াপরিন নামে এক ধরনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি ওয়াটার চ্যানেলে ভরা। এখানে ওয়াটার চ্যানেলের ঘনত্ব দেহের পানি পরিবাহী অঙ্গ কিডনির মতো। গবেষকরা দেখতে পেলেন রক্তনালি ও মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ নেই, বরঞ্চ তরল পেরিভাস্কুলার স্পেস ও এস্ট্রোসাইটের মধ্যে চলাচল করে। গবেষকরা ভাবলেন, তবে কি এই পেরিভাস্কুলার স্পেস মস্তিষ্কের লিম্পফ্যাটিকতন্ত্রের কাজ করে? তরল রং করার জন্য রাসায়নিক পদার্থ ও মস্তিষ্কের জীবন্ত কোষের গভীরের ছবি তোলার আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকরা মস্তিষ্কের বর্জ্য নিষ্কাশনের একটি সামগ্রিক চিত্র পেলেন। তাঁরা দেখতে পেলেন, ধমনির সংকোচনের মাধ্যমে প্রচুর মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের তরল ধমনির পেরিভাস্কুলার স্পেসে পৌঁছায়। এরপর এই তরল এস্ট্রোসাইটকে পরিবহন পথ হিসেবে ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিস্যুতে পৌঁছায়। এখানে এরা বাতিল প্রোটিনকে সঙ্গে নিয়ে নেয় এবং বাতিল প্রোটিনযুক্ত তরল মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে যাওয়া ছোট শিরার চারদিক ঘিরে থাকা পেরিভাস্কুলার স্পেসে পৌঁছায়। তারপর এরা শিরায় পৌঁছে, ছোট ছোট শিরা হয়ে এরা বড় শিরায় পৌঁছে, যেখান থেকে এরা দেহের গ্লিম্পফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে অপসারিত হয়। এস্ট্রোসাইটের মতো মগজের কোষগুলো গ্লায়া নামে পরিচিত, তাই গবেষকরা মস্তিষ্কের এই লিম্পফ্যাটিক সিস্টেমের নাম দিয়েছেন গ্লিম্পফ্যাটিক সিস্টেম।

বর্জ্য পরিবহনব্যবস্থার চিত্র পরিষ্কার হওয়ায় গবেষকরা বর্জ্য পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে স্নায়ুবিনাশী রোগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা দেখতে চেষ্টা করলেন। আগেই জানা ছিল, বিটা এমাইলয়েড নামের এক ধরনের প্রোটিনের সঙ্গে আলঝাইমারের মতো স্নায়ুবিনাশী রোগের সম্পর্ক আছে। গবেষকরা দেখলেন, বিটা এমাইলয়েড গ্লিম্পফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে অপসারিত হয়। বিটা এমাইলয়েড ছাড়াও ক্ষতিকারক প্রোটিন যেমন সিনিউক্লিন প্রোটিন, যা পার্কিনসন রোগের কারণ, গ্লিম্পফ্যাটিক সিস্টেমের মাধ্যমে অপসারিত হয়। আগের রোগতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব লোক মধ্যবয়সে নিদ্রাহীনতায় ভোগে তাদের স্নায়ুবিনাশী রোগের ঝুঁকি বেশি। গবেষকরা এবার ছবি তোলার নতুন পদ্ধতি টু ফোটন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে দেখতে পেলেন, ঘুমের সময় গ্লিম্পফ্যাটিক ব্যবস্থা জাগরণের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। কাজেই অবধারিতভাবেই বলা যায়, ঘুম গ্লিম্পফ্যাটিক ব্যবস্থা সক্রিয় রাখার মাধ্যমে রোগের ঝুঁকি কমায়। এখনো পর্যন্ত এ গবেষণা মৌলিক গবেষণাগারের চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ। গ্লিম্পফ্যাটিক ব্যবস্থার সক্রিয়তা বাড়িয়ে এ রোগের ঝুঁকি কমানো বা অসুস্থ রোগীদের সুস্থ করে তোলার ওষুধ আবিষ্কারের উদ্যোগ এখনো ুফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানিগুলো নেয়নি। তবে এ ধরনের ওষুধ তৈরির গবেষণা উদ্যোগ মানব জাতির এক বড় স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। আর সেদিন যত তাড়াতাড়ি আসে ততই মঙ্গল।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও

বিজ্ঞান লেখক


মন্তব্য