kalerkantho

26th march banner

বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে মা ও জারিফের শেষ দিনগুলো

ডা. মুহাম্মদ সাঈদ ইমরান

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কয়েক দিন আগেও কী আশ্চর্য সাজানো ছিল সুমাইয়া খানমের সংসার। স্বামী আর তিন পুত্র নিয়ে অনাবিল ভালোবাসা জড়ানো আদর্শ সুখী পরিবার। তারপর একটি ঘটনা ওলটপালট করে দেয় সব।

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। শুক্রবার। বইমেলার আবহ তখনো কাটেনি। নতুন স্বপ্ন নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে নতুন নতুন সব বই। মা সুমাইয়া ভাবলেন, পুরো পরিবার নিয়েই বইমেলাটা ঘুরে আসবেন একবার। শিশু জায়ানের জন্য একটা আদর্শলিপি কেনা যেতে পারে। মার্কিন দূতাবাসের ইংরেজির প্রভাব থেকে মুক্ত করা আর কি! বাবা আমেরিকান দূতাবাসের প্রকৌশলী শাহেনওয়াজও মুচকি হেসে সায় দেন। যে দেশের মানুষ নিজ ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে, সে জাতি তো বাংলা শিখবেই। ১৪ মাসের জায়ান ও ১১ বছরের জারিফের জন্য আদর্শলিপি আর কিছু ভূতের বই কেনা যাবে। পনেরো বছরের সারলিন সব সময় ফেসবুকে পড়ে থাকে। তাকে এবার বিভূতির চাঁদের পাহাড় কিনে দিতে হবে। তখন বুঝবে বইয়ের মজা কতখানি। সারলিন বিন নেওয়াজকে যে করেই হোক বইমেলা ঘুরে দেখাতে হবে। কিন্তু উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর বাড়ির সাততলার ফ্ল্যাটের সেই দিনের চিত্রনাট্য ভিন্নভাবে সাজানো। সেই দিন গ্যাস পাইপ বিস্ফোরণে সপরিবারে দগ্ধ হয় তারা। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে আনার পরপরই মারা যায় বড় ছেলে সারলিন বিন নেওয়াজ (১৫) ও ১৪ মাসের শিশু জায়ান বিন নেওয়াজ। একদিন পর মারা যান বাবা শাহনেওয়াজ (৫০)। প্রায় ১১ শতাংশ পোড়া নিয়ে বেঁচে যায় জারিফ। ৯০ শতাংশ পোড়া নিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যান মা সুমাইয়া খানম।

পৃথিবীতে মা-ছেলের ভক্তি ও ভালোবাসার অনেক ঐতিহাসিক গল্প আছে। বায়েজিদ বোস্তামি তাঁর মায়ের জন্য সারা রাত পানি নিয়ে নির্ঘুম দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের জন্য গভীর রাতে খরস্রোতা নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন। সে তো ইতিহাস। কিন্তু মা আর জারিফের এই ভালোবাসা? পৃথিবীবাসী তো এ ঘটনা মনে রাখবে না। জানতেও হয়তো পারবে না কোনো দিন। রাজধানীর সিটি হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউ চার তলায়। মা সুমাইয়া খানম এখন লাইফ সাপোর্টে। তাঁর স্মৃতিগুলো এখন ধূসর। জারিফ পাঁচ তলায় ৫০৪ নম্বর কেবিনের অস্থায়ী বাসিন্দা। মাকে মনে পড়ে খুব। তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার খেলার সাথি ছোট ভাই জায়ানকে। তাকে পেলে মজা করে খেলা যেত। ছোট্ট জারিফ কেবিনে সবাইকে দেখে; কিন্তু মাকে খুঁজে পায় না। মা নিজেও প্রতি মুহূর্তে জারিফের কথা বলে। জারিফকে দেখতে চায়। সিটি হসপিটালের আইসিইউ এবং ২ নম্বর ওটির মধ্যে পার্থক্য শুধু পাঁচ ইঞ্চির ইটের একটা দেয়াল। জারিফের যখন ড্রেসিং হয়, তখন মা সুমাইয়া আইসিইউর ২ নম্বর বেডে। দূরত্ব ছয় থেকে সাত হাত। দেয়াল না থাকলে হাত বাড়িয়েই ছোঁয়া যেত। জারিফকে একটু আদর করা যেত। অথচ তাদের দেখা হয় না। এত কাছে, তবু এত দূর। মায়ের যখন ড্রেসিং শুরু হয়, তখন তিনি সারা শরীরে তীব্র ব্যথায় একেবার কুঁকড়ে ওঠেন। ঠিক পরমুহূর্তে কিছুটা উদাসীন হয়ে চিকিৎসককে বলেন, আমার জারিফের ড্রেসিংয়ে খুব কষ্ট হয় তাই না ডক্টর? ডক্টর বলেন, একদমই না। ওর তো অল্প পোড়া! কথা বলতে বলতেই ড্রেসিং শেষ। আপনার শরীরের তো পুরোটাই পোড়া। আপনার মতো কষ্ট তো না। কী যে বলেন আপনি! ও তো ছোট। আমার জারিফ এই কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। কিছুতেই না। ওকে একটিবার দেখতে ইচ্ছা করে। ভীষণ ইচ্ছা করে। পরক্ষণেই সে বলে ওঠে, নাহ্, থাক স্যার। জারিফ আমার এই বীভৎস চেহারা দেখলে কষ্ট পাবে। কোনো দরকার নেই। জারিফের জন্য আমার ভালোবাসাই ওকে ঠিক সুস্থ করবে একদিন।

আপনি দয়া করে চুপ করুন। আপনার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সুমাইয়া খানমকে ওটিতে অক্সিজেনের নল পরিয়ে দেওয়া হলো।

মা সুমাইয়ার লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার এক দিন আগের ঘটনা। মা-ছেলের টেলিফোনে কথোপকথন। স্থান বার্ন ইউনিটের চার ও পাঁচ তলা। মা জারিফের কথা শোনার জন্য ব্যাকুল। এই মাত্র চিকিৎসকরা সাত সিসি মরফিন (তীব্র ব্যথানাশক ইনজেকশন) দিয়েছেন। মাথাটা ঝিম ধরে আছে। শ্বাসটাও বন্ধ বন্ধ লাগছে। ব্যাগ মাস্কে ১০ লিটার করে অক্সিজেন প্রতি ঘণ্টায় যাচ্ছে। আমি ভালো আছি। তুমি ভালো আছ জারিফ? ভাঙা গলায় মমতা নিয়ে জিজ্ঞেস করেন মা। সুমাইয়া খানমের হর্সনেস অব ভয়েস (ইনহেলেশন বার্নের প্রভাবে গলার বিভিন্ন অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যাওয়া) হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে জারিফ বলে ওঠে, ‘তোমাকে আর কথা বলতে হবে না মা। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ’ এতটুকু ছেলে, কিন্তু সব বুঝতে পারে। ৫ মার্চ দিবাগত রাত ১২টায় লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার আগে বার্ন ইউনিটের কর্তব্যরত চিকিৎসক সুমাইয়ার বেডের কাছে গিয়ে বলেন, সারা দেশের মানুষ আপনাদের জন্য প্রার্থনা করছে। আপনাকে ভালো হতেই হবে। জারিফের জন্য হলেও আপনাকে সুস্থ হতেই হবে।

উত্তরে মোটা গলায় সুমাইয়া বলেছিলেন, আমি ধৈর্য হারাইনি। আমি শেষ পর্যন্ত আমার সন্তান জারিফের জন্য লড়ে যাব। আমি ছাড়া ওর এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। ও খুব একা হয়ে যাবে। এখানে চিকিৎসক তাঁকে থামিয়ে দেন। আপনি কথা বলবেন না, বিশ্রাম নিন। সব কিছু আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।

 

তারপর একদিন জারিফ ও তার মা সুস্থ হয়ে উঠল। তারা হাতে হাত ধরে বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে হাঁটছে। কিছু ভূতের বই কেনা দরকার। একদল দুষ্টু ভূতের বই। ঠিক জারিফের মতো। ঘটনার পরিসমাপ্তি এভাবে ঘটতে পারত। কিন্তু গল্প-উপন্যাসের মতো মা-সন্তানের এমন মধুর পরিসমাপ্তি হয়নি। সব মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে মা সুমাইয়া ৬ মার্চ না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ক্ষমতা থাকত, তবে শুক্রবারের ওই ঘটনাটাকে দুঃস্বপ্ন বানিয়ে দিতাম। ঘুম থেকে জারিফ উঠে বলত, মা, আমি দুঃস্বপ্ন দেখেছি। আমার ভয় লাগছে। অমনি মা জড়িয়ে ধরে বলত, তোকে ভূতের বই কিনে দেওয়াই ভুল হয়েছে। রাতে ভয়ংকর ভূতের স্বপ্ন দেখেছিস। আয়, খাবার রেডি। খেয়েদেয়ে জায়ানের সঙ্গে খেলা করবি। আমি সারলিনের স্কুল ড্রেস গুছিয়ে দিয়ে আসি। তোর বাবা অফিসে যাবে, টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার দিতে হবে। এখন থেকে ভূতের বই পড়া বন্ধ। সম্পূর্ণ বন্ধ। বুঝেছিস জারিফ বাবা!

কিন্তু আমি বাংলার পান্থ। অতি সাধারণ সুফি বাংলার পান্থ। এই পৃথিবীতে আমাকে এত ক্ষমতা দিয়ে পাঠানো হয়নি।

লেখক : মেডিক্যাল অফিসার [বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি (আইসিইউ)], সিটি হাসপাতাল লি.

sufibanglarpantho@gmail.com


মন্তব্য