kalerkantho


বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা

৪ ও ৫ মার্চ ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে দুই দিনব্যাপী সপ্তম বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো। দুই দিনের সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন, দিল্লি। দুই দেশের রাজনীতিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা সেমিনারে অংশ নেন। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা, বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব, ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি, বিজেপির মুখপাত্র এম জে আকবর উল্লিখিত সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় দুই দেশের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে রাম মাধব বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী কথা বলেছেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে রাম মাধব বিশেষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, এ কথা তিনি নিজেই তাঁর বক্তৃতায় বললেন। বক্তৃতার শুরুতেই রাম মাধব উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র রক্ষায় শেখ হাসিনার পাশে থাকবে ভারত। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় উভয় দেশের একসঙ্গে কাজ করার ওপর তিনি জোর দেন। আমি নিজে সেদিন ওই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে রাম মাধবের বক্তৃতা শুনেছি। তাতে বক্তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখের ভাষা ও মুখের কথার একটা সম্মিলিত ভাষা আমার উপলব্ধিতে ধরা পড়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ভারতের একজন ঝানু রাজনীতিকের মতোই তিনি কথা বলেছেন।

তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা মানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্র ধ্বংসের লাইসেন্স নয়। স্বাধীনতা আমাদের বাস পোড়ানো, জনগণের সম্পত্তি পোড়ানো ও সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি দেয়নি। ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, সেটা তাঁর কথায় বোঝা গেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য উভয় দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিকল্প নেই, এই উপলব্ধি তাঁর চোখের ভাষা ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে ফুটে উঠেছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। আলোচ্য সেমিনারে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর সম্পূর্ণ আলাদা একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তা ইস্যুতে ধর্মান্ধ উগ্রবাদের উত্থান ও তা দমনের কৌশলসহ দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা ও আন্তদেশীয় অপরাধ দমনে দুই দেশের করণীয় ও সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পায়। জঙ্গিবাদের উত্থান ও তার বিস্তারে মূল কারণ হিসেবে ক্ষমতার রাজনীতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনা, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, চরম সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিকেই দায়ী করা হয়। একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির ভূরাজনৈতিক ও করপোরেট স্বার্থের নীতিমালা উগ্রবাদী জঙ্গি সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। উল্লিখিত কারণগুলোর বেশির ভাগই ভারত-বাংলাদেশ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। সুতরাং নিরাপত্তার হুমকি সৃষ্টিকারী কারণগুলো দূরীকরণে উভয় দেশের যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতা অবশ্যই অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। দুই দেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান উভয় দেশের নিরাপত্তার জন্য সমানভাবে হুমকি সৃষ্টি করে। ভারতের অভ্যন্তরে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানে মুসলমান সম্প্রদায় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ইসলামিস্ট উগ্রবাদীদের জন্য পাল্টা সুযোগ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে হিন্দু উগ্রবাদীদের দ্বারা ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস ভারতের জন্য বিশাল ওয়াটারশেড হয়ে আছে। ভারতে হিন্দু উগ্রবাদের ফলে বাংলাদেশে যারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করেন ও ভারতবিরোধী কার্ড ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে চান, তাঁদের হাতে বাংলাদেশের মানুষকে উত্তেজিত করার অতিরিক্ত সুযোগ আসে। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলে সেটি উভয় দেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি সরকারের সময় উভয় দেশের জন্য নিরাপত্তা হুমকির একটা স্বরূপ সবাই দেখতে পান। সে সময় বাংলাদেশের মসজিদ, মন্দির, গির্জা, আদালত, বিচারক, বিদেশি কূটনীতিক ও প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তির ওপর চলতে থাকে উগ্র জঙ্গিদের গ্রেনেড-বোমা হামলা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। দেশের কোনো কোনো জায়গায় জামায়াত-বিএনপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বরাজ কায়েম করে জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। অন্যদিকে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থরক্ষায় বিএনপি-জামায়াত সরকার ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়, প্রশ্রয় প্রশিক্ষণসহ সব রকমের সহযোগিতা দেয়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার (ইউএলএফএ) সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মুসলমানদের সংগঠন—দ্য মুসলিম ইউনাইটেড লিবারেশন টাইগারস অব আসাম (এমইউএলটিএ) এবং দ্য মুসলিম ইউনাইটেড লিংকস ফোর্স অব আসাম (এমইউএলএফএ) বা মুলফা নামের এই দুই সংগঠনের সঙ্গে বাংলাদেশের জামায়াত ও কয়েকটি জঙ্গিগোষ্ঠীর আদর্শগত সম্পর্কের সূত্র ধরে এরা সবাই সম্মিলিতভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনায় ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে সমরাস্ত্র ও বিস্ফোরক চালান বাংলাদেশের ওপর দিয়ে উলফার জন্য অবাধে পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। এ রকম একটা বিশাল চালান ১০ ট্রাক অস্ত্র ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামে দৈবক্রমে ধরা পড়ায় হাটে হাঁড়ি ভেঙে যায়। বিশ্বব্যাপী শুরু হয় হইচই। বাংলাদেশের সচেতন মানুষ হতভম্ব। ভারতের পক্ষ থেকে অনেক প্রশ্ন ওঠে। সেখানকার মিডিয়ায় ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। বিএনপি সরকার কর্তৃক উলফাকে সহায়তার খবর মানুষ জানলেও অন্য দেশের সুবিধার্থে নিজ দেশকে এত বড় বিপদের মধ্যে কোনো সরকার ফেলতে পারে, তা ছিল মানুষের চিন্তার বাইরে। তখন বিএনপি সরকার সব কিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে একে একে সব কিছু উন্মোচিত হতে শুরু করে। ২০১৪ সালে ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার রায় হয়েছে। আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিভাগের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা এবং জামায়াত-বিএনপি সরকারের মন্ত্রীসহ কয়েকজনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা সক্রিয় থাকলে সেটি বাংলাদেশের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠী ও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র ও অর্থের কমন উৎস পাকিস্তান। তাই ভারতের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে অস্ত্র ও টাকা এলে তার একটা অংশ চলে যায় বাংলাদেশের জঙ্গিদের হাতে। তা ছাড়া উল্লিখিত দুই দেশের দুই গোষ্ঠী একে অপরের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের জায়গা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি নিরাপত্তার হুমকির জায়গা হলো—ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে গহিন জঙ্গলে ও পাহাড়ে ক্যাম্প স্থাপন করে, যার ওপর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে সেটি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিরুদ্ধে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পাকিস্তান এখনো সক্রিয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের পাকিস্তান সহায়তা দেয় মূলত দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে। প্রথমত, যদি একটা রাজ্যকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ নেওয়া। আর নয়তো ভারতের সেনাবাহিনীর বড় একটা অংশ পূর্বাঞ্চলে নিয়োজিত থাকলে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে সামরিক ভারসাম্য পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে। একই উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের তত্ত্বাবধানে লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো জঙ্গি সংগঠন দ্বারা ভারতের অভ্যন্তরে নাশকতামূলক অপারেশন চালায়। ২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্ট ভবন, ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের তাজ হোটেল এবং সম্প্রতি পাঞ্জাবের পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ  এগুলোর বড় উদাহরণ। ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের জঙ্গিরা ভারতে আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসত। ২০০৯ সালে লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদের কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশের জঙ্গিদের যে সব রকমের সহযোগিতার দেয় তা এখন সবাই জানে। ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তা জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগে প্রত্যাহূত হয়েছেন। পাকিস্তানের নাগরিক ইদ্রিস শেখ ও বেসামরিক বিমান সংস্থা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মুস্তফা জামান জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত থাকায় আটক হয়ে এখন বাংলাদেশের জেলে আছেন। সুতরাং সার্বিক নিরাপত্তা ও জঙ্গি দমনে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতা একান্ত আবশ্যক। উভয় দেশের জনগণের আস্থা ও নিবিড় সম্পর্ক উভয় দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা উভয় দেশে টিকিয়ে রাখতে হলে জনগণের সমর্থন অপরিহার্য। এ কারণেই বাংলাদেশের মানুষের সংবেদনশীল জায়গা তিস্তার পানি চুক্তিসহ সার্বিক পানি ব্যবস্থাপনায় ভারতের জনগণ ও সরকারকে আরো খোলামেলা ও উদার হতে হবে। পাকিস্তানের কারণেই সব সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক স্থবির হয়ে আছে। তাই পাকিস্তান ছাড়া যে আঞ্চলিক সংস্থাগুলো সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার করা দরকার। বিমসটেক (ইওগঝঞঊঈ-ইধু ড়ভ ইবহমধষ ষহরঃরধঃরাব ভড়ৎ সঁষঃর ংবপঃড়ত্ধষ ঈড়-ড়ঢ়বত্ধঃরড়হ); বিসিআইএম (ইঈওগ) অর্থাৎ বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর এবং বিবিআইএন (ইইওঘ-ইধহমষধফবংয, ইযঁঃধহ, ওহফরধ ধহফ ঘবঢ়ধষ) এই উপ-আঞ্চলিক সংস্থাগুলো কার্যকর হলে পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং জঙ্গি তত্পরতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ-ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতা সুদৃঢ় ও কার্যকর হলে সেটি প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com


মন্তব্য