স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যেভাবে-335196 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যেভাবে গেলাম

রথীন্দ্রনাথ রায়

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যেভাবে গেলাম

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ অসহযোগ আন্দোলন যখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয়ে গিয়েছে, তখন আমি জগন্নাথ হল থেকে আমাদের লক্ষ্মীবাজারের বাসায় চলে আসি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। তখন কোনো কোনো মহল্লায় বিহারিরা মাঝেমধ্যে অ্যাটাক করত। ফলে পালাক্রমে সারা রাত ধরে হাতে লাঠি বা হকিস্টিক নিয়ে আমাদের মহল্লা পাহারা দিতাম। এর মধ্যে ক্রমান্বয়ে ২৫ মার্চ এসে গেল। সেই নিষ্ঠুর ইতিহাস সবারই জানা। ২৭ মার্চ যখন কিছুক্ষণের জন্য কারফিউটা উঠে যায়, তখন আমি এবং আমাদের পাশের বাসার কাজল বলে একটি ছেলে, সে জগন্নাথ কলেজে পড়ত, এই দুজন মিলে হেঁটে হেঁটে শাঁখারীবাজারের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। লক্ষ্মীবাজার থেকে যখন আমরা ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে এলাম, তখন দেখি ভিক্টোরিয়া পার্কের ভেতরে পাক আর্মিরা কেউ শুয়ে, কেউ বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমরা পার্কের সামনে দিয়ে রাস্তা পার হলাম। রাস্তাটি পেরিয়ে আমরা কোর্ট-কাচারির বাউন্ডারি এবং আরেক দিকে পাকিস্তান ব্যাংক (এখন যেটি বাংলাদেশ ব্যাংক), সেটির অফিসের সামনে চলে এলাম। এই দুটি ভবনের মাঝখানে যে লাগোয়া দেয়াল, সেখানে কতগুলো ঝুপড়ি ছিল। সেগুলোতে শ্রমজীবী কিছু মানুষ থাকতেন। আমরা দেখলাম, ঝুপড়ির ভেতরে ওই লোকগুলো আছেন; কিন্তু সবাই মৃত। কাউকে বেয়নেট চার্জ করে মেরেছে, কাউকে ব্রাশফায়ার করে মেরেছে। লাশগুলো তখনো ওখানে পড়ে আছে। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে দেখতে সামনে এগিয়ে গেলাম। আরো সামনে এগিয়ে দেখি, শাঁখারীবাজারের মুখে অনেক লোক জটলা বেঁধে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা গিয়ে দেখলাম, প্রায় ১২ থেকে ১৪টি লাশ তারা গোল করে ফেলে রেখেছে আর মানুষজন সবাই কাঁদছে। আমাদেরও এসব লাশ দেখে কান্না পেয়ে গেল। এমন সময় ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে ওরা ব্রাশফায়ার করল। সঙ্গে সঙ্গে দিগ্বিদিক ছুটে কোর্টের ভেতরে আমি আর কাজল লাফ দিয়ে পড়লাম। তারপর আজাদ সিনেমা হলের ওপাশ দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে নবাবপুর রোড ক্রস করে রোকনপুরের ভেতর দিয়ে অনেক কষ্টে বাসায় গেলাম। ২৯ তারিখ পর্যন্ত অবরুদ্ধ হয়ে থাকলাম। প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় রাতের বেলা আগুন দেখা যেত। ট্যাংকের আওয়াজ, মিলিটারির গুলির আওয়াজ, আর্তচিত্কার—এগুলো আমরা শুনতাম। ২৯ তারিখ যখন কারফিউ ব্রেক করল, কাজলদের বাড়ি ছিল বিক্রমপুর, ওরা রেডি হচ্ছে। আমাকে এসে বলছে, রথীন, আমরা তো বাড়ি যাচ্ছি, তোমরা এখন কী করবে? আমাদের বাড়ি রংপুর আর ছোট ছোট ভাইবোন। এদের নিয়ে তো আর রংপুর যাওয়া সম্ভব নয়। তখন আবার আমাকে বলল যে যদি কিছু মনে না করো তো চলো বিক্রমপুরে। নিশ্চয়ই এটা সাত দিন বা ১৫ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। আবার আমরা ফিরে আসব। বললাম, ভাই, তোমাদের যদি অসুবিধা না হয়, তাহলে তোমাদের সঙ্গে যেতে পারি। বলল—না, না; তাড়াতাড়ি রেডি হও, আমরা একটু পরেই বেরোব। বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী পেরিয়ে চলে গেলাম বিক্রমপুরের বালিগাঁও বলে এক জায়গায়। সেখান থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি, কাজল ও বালিগাঁও বাজারের নবদ্বীপ ডাক্তারের ছেলে মাখন—তিনজনে যৌবনের উন্মাদনায় ঠিক করলাম যে বর্ডার ক্রস করব। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। লুঙ্গি পরা, কাঁধে গামছা, শার্ট একটু ছেঁড়া, যাতে আমাদের ছাত্র বলে কেউ চিনতে না পারে। কিন্তু মুন্সীগঞ্জের কাছে গেলে দেখি লোকজন ‘পাটক্ষেত’ ‘পাটক্ষেত’ বলে দৌড়াদৌড়ি করে পাটক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে যাচ্ছে। আমরাও সেই পাটক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে পড়লাম। অনেকক্ষণ পরে কয়েকবার ব্রাশফায়ার হলো। আমরাও চুপচাপ। তারপর রাস্তাঘাটে ফিসফাস আওয়াজ শুনে বেরিয়ে পড়লাম। লোকজন বলল, আর্মিরা সাত-আটজনকে কাটাখালী ব্রিজের ওপর মেরে ফেলেছে। তারপর তাদের লাশ ব্রিজের নিচে ফেলে দিয়েছে। কারা এরা? একজন জানালেন, মুন্সীগঞ্জ শহরের নামকরা একজন মোক্তারের ছেলে আর তার বন্ধুবান্ধবসহ আরো কয়েকজন। তারপর আমরা নৌকায় করে দাউদকান্দি এবং এরপর কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্টের ঠিক আগে কাবিলার হাট বলে একটি জায়গায় চলে গেলাম। সেখান থেকে আধা মাইল দূরে গোমতীর বাঁধ। সেখানে ছোট একটি বাজার আছে। এক দোকানে খাবার কিনতে গিয়ে পড়ে গেলাম শান্তি কমিটির কয়েকজনের সামনে। তাদের জেরার মুখে আগে থেকে ঠিক করা মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছি। এ সময় একটি ছোট ছেলে ইশারা করল সেখান থেকে চলে আসতে। অন্যদের ‘আসছি’ বলে চলে এলাম। ছেলেটাই জানিয়েছিল, ওরা শান্তি কমিটির লোক। ছেলেটি আমাদের ওদের বাড়ি নিয়ে গেল। বলল, ‘আপনারা তো কিছু খান নাই। বসেন, ঘরে কিছু নেই, আমি কয়টা ডিম নিয়া আসি।’ দেখলাম, বাড়িতে সে একাই আছে, ঘর দেখে বুঝলাম, ও হিন্দু। বললাম, যাও, আর দুটো রিকশা ঠিক করে আসো। ভোরবেলা আমরা যাব। আমরা তো তিনজন আর তুমি যদি আমাদের সঙ্গে যাও তো চারজনে যাব। বলল, আমার তো কোনো কাজ নেই। আমিও যাব। আমার মা-বাবা, ভাইবোন সব চলে গেছে। সোনামুড়া বাজারের পাশেই আমার বোনের বাড়ি। আমি তিন-চার দিন পর চলে যাব। সেই ছেলে আমাদের সঙ্গে গেল। শেষ পর্যন্ত আমরা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারলাম। সবাই বুকভরে নিঃশ্বাস নিলাম। সোনামুড়া বাজারের আগেই একটি টিলা। সে বলল, আপনাদের কতক্ষণ লাগবে? বললাম, ঘণ্টা দেড়েক। আমাদের তো কোনো কাজ নেই। ভারতে আমাদের যে কয়জন আত্মীয় আছেন, তাঁদের চিঠি লিখেই চলে আসব।

আমরা নাশতা করে পোস্ট অফিসে গিয়ে ফেরার সময় দেখি যে পোলাপান রাস্তা দিয়ে হইহই করতে করতে আসছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, ওমা, সামনে সুভাষ দত্ত আসছেন। ওনাকে নিয়ে ছেলেপেলের এত উচ্ছ্বাস। আমি তো গিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ালাম। সুভাষ কাকু বললেন, আরে তুই কোত্থেকে আসলি? কোথায় যাবি? বললাম যে কাকু আমি তো আজকেই আসলাম। বললেন, চল, কলকাতায় আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আছে। বেতারে জয়েন করব। বললাম, না কাকু, আপনি যান, আমি তো যেতে পারব না। কেন? আমি তো আমার মা-বাবাকে রেখে এসেছি বিক্রমপুরে। তাহলে? আবার বিক্রমপুর যাব, ওনাদের নিয়ে আসব। বলেন, তোর মাথা খারাপ হয়েছে? কোথায় বিক্রমপুর আর কোথায় ত্রিপুরার সোনামুড়া। তুই তো পাগল। রাস্তাঘাটে তোকে মিলিটারিরা মেরে ফেলবে। তুই যাসনে। বললাম, না কাকু, মা-বাবাকে ফেলে যাব না।

একটা জায়গায় দেখি, মাঠের মধ্যে খুব ভিড়। সামনে এগিয়ে দেখলাম, একটি টেবিল নিয়ে ছেলেপেলে বসে আছে। জানলাম, মুুুক্তিবাহিনীতে লোক নেওয়া হচ্ছে। একপাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, একটি বাচ্চা ছেলে জোরে জোরে কাঁদছে। দুটি ছেলে একটু পর পর ওর সঙ্গে কথা বলে আবার চলে যায়। ছেলে দুটি ফেরার পর জিজ্ঞেস করলাম, এই! ও কাঁদে কেন? বলল, আমরা তো কেরানীগঞ্জ থেকে এসেছি, আমাদের মুক্তিবাহিনীতে নিয়েছে। ও তো ছোট, তাই ওরে নিচ্ছে না। বলেন তো ওরে কী করি? বললাম, তোমরা গিয়ে ওর জন্য একটু ভালো করে বলো। বলে, বলছি তো, ছোট ছেলে ওরা নেবে না। বললাম, দাঁড়াও একটু পরে আমিই যাব। এর মধ্যে একজন ফিরে এসে বলল, এই! তোরে নিছে নিছে, চল। যেই শুনল, ছেলেটি গলা-মুখের জল মুছতে মুছতে হাসতে হাসতে চলে গেল। আমার তখন মনে হলো, ওইটুকু বাচ্চা ছেলে দেশের জন্য বাবাকে ফেলে এসেছে। তখন বন্ধুদের বললাম, এইটুকু বাচ্চা ছেলে মায়ের বুক থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য যদি বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে আমার দেশকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। এখনো এই কথা মনে হলে আমার গায়ে কাঁটা দেয়।

কয়েক দিন পর আমি আবার বিক্রমপুরে ফিরে এলাম। ওখানে শান্তিবাহিনী গড়ে তোলার পর বলা হয়েছিল, বিধর্মীদের বাড়ি থেকে বের করে দাও। সেখানকার এক যুবকের মামা ছিল শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যান। সে মামাকে বলেছিল, একটা কথা যদি আপনি আর ওনাকে বলেন, একেবারে কল্লা নামিয়ে দেব। ও আমার বাবার ভক্ত ছিল। এ অবস্থার মধ্যে এখানে থাকা যাবে না, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বাবাকে বললাম, তুমি বলো যে রাস্তাঘাটে শেয়াল-কুকুরের মতো মরবে, এখানে আরো খারাপভাবে মারা যাবে কিন্তু। চলো আমরা এখনো সময় আছে চলে যাই। অনেক কষ্টে তাকে রাজি করালাম। তারপর ভারতে গিয়ে ১৪ জুন আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিলাম।

লেখক : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক

মন্তব্য