kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জমি জালিয়াতির মূল কারণ স্বত্বলিপি না থাকা নয়

এ এম এম শওকত আলী

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জমি জালিয়াতির মূল কারণ স্বত্বলিপি না থাকা নয়

৬ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে যে জমি জালিয়াতির মূল কারণ সাবরেজিস্ট্রার অফিসে স্বত্বলিপি না থাকা। স্বত্বলিপিই প্রমাণ করে সংশ্লিষ্ট জমির স্বত্বাধিকারী কে।

কারণ স্বত্বলিপিতে জমির মালিকের নাম-ঠিকানা ও পরিচয়সহ কোন মৌজায় জমি অবস্থিত, দাগ, খতিয়ান নম্বর, জমির পরিমাণ ও শ্রেণির উল্লেখ থাকে। তবে হালনাগাদ স্বত্বলিপি না থাকার কারণে ভূমি জরিপের মাধ্যমে স্বত্বলিপির মালিকানার রদবদল করা হয়। এর সঙ্গে শ্রেণিরও হালনাগাদ অবস্থা জানা যায়। ভূমি জরিপ কোনো কোনো জেলায় সম্পন্ন করা অধিকতর সময়সাপেক্ষ। ভূমি জরিপ দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভূমি জরিপ সম্পন্ন করতে পাঁচ থেকে ১০ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। এমনও তথ্য রয়েছে যে কোনো জেলায় ২০ বছর আগে ভূমি জরিপ করা হলেও এরপর আর জরিপ হয়নি। ফলে ২০ বছর আগের স্বত্বলিপিই থেকে যায়। অথচ এর মধ্যে জমির মালিকানার পরিবর্তন হয়। এর কারণ জমি বিক্রি। জমির মূল মালিকের মৃত্যুজনিত আইন অনুসারে উত্তরাধিকারীদের নাম যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি দপ্তরে লিপিবদ্ধ না করা। মৌজা, দাগ, খতিয়ান নম্বর সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে। তবে ভূমি জরিপের সময় তিন ধাপে কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রতি ধাপের ভিন্ন নাম সরকারিভাবে স্বীকৃত। এ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সরেজমিন ভূমি জরিপ কর্মকর্তাদের মালিক বা তার উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বত্বলিপি হালনাগাদ করা হয়। এরপর প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে আপত্তি উত্থাপনের সুযোগ। যে মৌজায় জমি অবস্থিত সে মৌজার অন্য কোনো ব্যক্তিদের এ সুযোগ দেওয়া হয়। উত্থাপিত আপত্তি নিষ্পত্তির পর স্বত্বলিপি চূড়ান্ত হয়। এর বিরুদ্ধেও ঊর্ধ্বতন ভূমি কর্মকর্তার কাছে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। স্বত্বলিপি চূড়ান্ত করার আগে প্রাথমিক স্বত্বলিপির কপিও ছাপানো হয়।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অনুসৃত প্রথা অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভূমির স্বত্বলিপি জরিপের মাধ্যমে হালনাগাদ করা হয়। সর্বশেষ জরিপের নাম রিভিশনাল সেটেলমেন্ট বা সংক্ষেপে আরএস। এ থেকে বলা হয়, আর খতিয়ানসংক্রান্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময় ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ (বরিশাল), রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে জরিপ কার্যক্রম চালানো হলেও একমাত্র ফরিদপুর ছাড়া অন্য সব জেলার জরিপ পাঁচ বছরে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে বরিশাল জেলার জরিপ ১৯৪০ সালে শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৪৫ সালে সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু জরিপের রেকর্ড প্রকাশ হয় প্রায় সাত বছর পর, অর্থাৎ ১৯৫২ সালে। রাজশাহীর জরিপ ১৯৬৫ সালে শুরু হলেও শেষ হয় ১৯৮৪ সালে। এতে সময়ের ব্যবধান ১৯ বছর। রেকর্ড ছাপানোয় কত সময় লেগেছিল তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামের জরিপ ১৯৭০ সালে শুরু হয়। কবে শেষ হয় তার কোনো তথ্য নেই। তবে এক ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের মন্তব্যে দেখা যায়, ৯২ শতাংশ জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। কুষ্টিয়া, পাবনা ও ময়মনসিংহ জেলার জরিপ শুরু হয় যথাক্রমে ১৯৭৫ (কুষ্টিয়া ও পাবনা) ও ময়মনসিংহ ১৯৭৯ সালে। তবে এর জন্য জেলাপ্রতি কত সময়ের প্রয়োজন হয় তার কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকাশনায় পাওয়া যায়নি। জমি জরিপসংক্রান্ত বিষয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ১৯৫৬-১৯৬২ সাল। ওই সময় প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি হয়। এ-সংক্রান্ত তথ্য ২০০২ সালে প্রকাশিত বইয়ে বলা হয়েছে যে ১৯৪৭ সালের পর সর্বক্ষেত্রেই ভূমি রেকর্ড ছিল ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরনো। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ সহজ ছিল না। কারণ জরিপ সংশোধনের কার্যক্রম ছিল দীর্ঘমেয়াদি। এ জটিলতা এড়ানোর জন্য এস্টেট একুইজিশন আইন প্রণীত হয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত বইয়ে এ বিষয়ে তিনটি মন্তব্য করা হয়েছে। এক, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের লঙ্ঘনের ফলে জমিদার ও অন্যান্য করগ্রহণকারীর বংশানুক্রমিক অধিকার সম্পর্কিত প্রশাসনিক অবস্থান; দুই, হালনাগাদ ভূমি অধিকারের রেকর্ড এবং তিন, নতুন ভূমি সংস্কার পদ্ধতি প্রয়োগের ব্যাপারে প্রশাসনিক ক্ষমতা।

স্বত্বলিপি প্রণয়নের মূল উত্স সময়মতো ভূমি জরিপ ও স্বত্ব সম্পাদিত হালনাগাদ তথ্য। এ কাজটি ব্রিটিশ আমল থেকেই সময়মতো হয়নি। ঐতিহাসিক গবেষণা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য একে সমর্থন করে, যা প্রমাণিত। এ কারণে স্বত্বলিপি সাবরেজিস্ট্রার অফিসে জমা দিলেও যে জালিয়াতি হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখন প্রশ্ন হলো—এক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর কেন সময়মতো জরিপকাজ সম্পন্ন করতে যুগ যুগ ধরে ব্যর্থ হচ্ছে এবং দুই, পুরনো স্বত্বলিপি কিভাবে জরিপ সম্পন্ন না হলেও সংশোধন করা হয়? প্রথমোক্ত সমস্যার কারণ একাধিক। জমিদারি আমলে ভূমি জরিপের জন্য পৃথকভাবে জমিদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করার প্রথা ছিল বলে শোনা যায়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির ফলে জমির মালিকরা নির্ধারিত ভূমিকর সরকারকে দেয়। এর পরিমাণ অতি সামান্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের ভূমিকর রহিত করা হয়। ফলে আদায়যোগ্য ভূমিকর আরো হ্রাস পায়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আগে ভূমিকর সরকারের সম্পদ আহরণের প্রধান উত্স ছিল। এ চিত্র বদলে যায়। ভূমি জরিপের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা সরকার কখনো দিতে পারে না। ভূমি জরিপের জন্য প্রতি জেলায় যে সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীর প্রয়োজন হয়, তা সহজে পাওয়া দুষ্কর। ২০০২ সালে একটি জেলায় ভূমি জরিপ করার আনুমানিক খরচ সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করা হয়। তথ্য পেতে একজন গবেষক ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরকে অনুরোধ জানালে এ দপ্তরের এক কর্মকর্তা লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন যে এক হাজার ৪০০ বর্গমাইলের একটি জেলার জন্য ব্যয়ের পরিমাণ হবে ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অনুমান করা যায়, বর্তমানে এ ব্যয় আরো বেশি হবে। ফলে বছরওয়ারি স্বত্বলিপি হালনাগাদ করতে যে অর্থ, দক্ষ লোকবল ও অনুপাতিক উপকরণের প্রয়োজন তা পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সব জেলায় একই বছরে জরিপ কাজ করা বাস্তবে সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে স্বত্বলিপি হালনাগাদ করার উপায় কী? ভূমি জরিপেও ভূমি ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ এক গবেষকের মতে, স্বত্বলিপি হালনাগাদ করার বিষয়টি বাস্তবে দৈনন্দিন ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এ বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভূমির মালিকানা বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়তই বদল হয়। যেমন— ভূমির মালিকানা বদলের জন্য জমি ক্রয়, বিক্রয়, বন্ধক এবং উত্তরাধিকার ও দানপত্র। ওই গবেষকের মতে, সাবরেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বিষয়টি আইনসম্মত করা হয়। মালিকানা রদবদলের জন্য অন্যান্য সূত্রও রয়েছে। যেমন—জমি বিভাজন বা partition deed, নিলামে বিক্রি ও অন্যান্য উপায়। রেজিস্ট্রেশনের দলিলের এক কপি তহশিল অফিসেও পাঠানো হয় এবং নতুন স্বত্বাধিকারী নামজারি বা mutation হ করার জন্য আবেদন করেন। ওই সময় ভূমি অফিসে নামজারির কেস হয়। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সহকারী ভূমি অফিসার প্রতিটি আবেদন তহশিলদারকে প্রেরণ করেন। তখনই শুরু হয় এ বিষয়ে তদন্ত। নামজারির আবেদনের নিষ্পত্তি অনেকাংশে তদন্তকারী কর্মকর্তা অর্থাৎ তহশিলদারের ক্ষমতা, সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার ওপর নির্ভরশীল। তহশিলদারকে যদি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ না করেন, তাহলেই আবেদনকারীর বিড়ম্বনা বা দুর্ভোগ শুরু হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে দীর্ঘসূত্রতাসহ ভোগান্তি হয়। কিছু ক্ষেত্রে অন্যরা তদন্ত ভিন্নপথে নেওয়ারও চেষ্টা করেন, আমাদের ভূমি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দুর্বল বিষয় হলো এটি।

১৯৮৭ সালে ভূমি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা নিরসনের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা, কমিটির চেয়ারম্যানের নামে এটি মুয়ীদ কমিটি হিসেবে আখ্যায়িত। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কমিটির একটি সুপারিশ ছিল, জমি রেজিস্ট্রেশন আইন মন্ত্রণালয়ের থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা। কিন্তু তা হয়নি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে গঠিত টাস্কফোর্সও এ ধরনের সুপারিশ করে। পক্ষান্তরে উল্লিখিত ১৯৯৫ সালের বইয়ে এ প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত হবে না মর্মে মত প্রকাশ করা হয়। এসব মতের মধ্যে ছিল—এক, টাস্কফোর্স স্বত্বলিপি যেভাবে সরেজমিন তদন্ত করে প্রণীত হয় যে বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, সরেজমিন তদন্তের সময় জমির মালিকরাসহ অন্য প্রতিবেশীরাও উপস্থিত থাকেন। এ প্রক্রিয়ায় যার স্বত্বলিপি ও জমির দখল যথাযথ রয়েছে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। কেউ যদি বেআইনিভাবে জমি দখল করে, সে বিষয়টিও লিপিবদ্ধ করা হয়। এরপর আসে প্রাথমিক স্বত্বলিপির যাচাই (attestation), আপত্তি (objection) ও আপিল (Appeal)। এরপর চূড়ান্ত স্বত্বলিপি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে সংরক্ষণের জন্য প্রেরিত হয়। এর ফলে নামজারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমির মালিকানা বদলের দৈনন্দিন প্রক্রিয়াও সহজ হয়। দুই, এ ছাড়া প্রণীত স্বত্বলিপি ও দাখিলা (খাজনার রসিদ) জমির মালিক তথা কৃষকরা সযত্নে সংরক্ষণ করেন। কারণ এ লিপি তাঁদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের সহায়ক উত্স। তিন, এসব ক্ষেত্রে সাবরেজিস্ট্রারের দায়িত্ব হলো জমির মালিকানা বদলের সময় সংশ্লিষ্ট মালিকানা রদবদলের ফরমটি সঠিকভাবে পূরণ করা। আলোচ্য প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

এ ছাড়া রয়েছে অন্য একটি বিষয়। তা হলো জমি কেনার আগে জমির মালিকানা সম্পর্কে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা। এ প্রক্রিয়ায় যেটা করা হয় তা হলো, সংশ্লিষ্ট জমির পূর্ববর্তী ২৫ বছরের স্বত্বলিপি, দখল ও খাজনার রসিদের কপি যাচাই করা। প্রায় শতভাগ ক্রেতা এ বিষয়টি সাবরেজিস্ট্র্রারের দপ্তরসহ তহশিল অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট অনুলিপি সংগ্রহ করেন। এ প্রক্রিয়াকে সাধারণত সব বায়া দলিলের অনুসন্ধান সার্চ বলা হয়। অনেকে আবার ভূমি বিষয়ে অভিজ্ঞ উকিলের পরামর্শও গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় সব বিক্রেতাকে একটি অ্যাফিডেভিটও সই করতে হয়। এতে বলা থাকে যে বিভিন্ন আইনের লঙ্ঘন এ বিষয়ে করা হয়নি। জমি ক্রয় করার ক্ষেত্রে স্বত্বলিপি, দখল ও হালনাগাদ খাজনার রসিদ সঠিকভাবে যাচাই করা জমি ক্রয়ের পূর্বশর্ত।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য