পাটই বদলে দেবে বাংলাদেশকে-334874 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


পাটই বদলে দেবে বাংলাদেশকে

ড. হারুন রশীদ

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাটই বদলে দেবে বাংলাদেশকে

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্র উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বেশ সংকুচিত। তবুও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বাংলাদেশি গবেষক ও বিজ্ঞানীরা দেশে-বিদেশে নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে নতুন নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তাঁরা যে আরো কৃতিত্বের প্রমাণ দিতে পারবেন, তার প্রমাণ এরই মধ্যে পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম ও তাঁর দল তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে ২০১০ সালে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে উন্মোচন করেন ছত্রাকের জীবনরহস্য। এবং সর্বশেষ তাঁরই নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী দেশীয় পাটের জিনরহস্য উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন।

পাটশিল্পের বিকাশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করেছেন। পাট উত্পাদন, বিপণন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য হিসেবে পাওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো এখানেও দেওয়া হবে। রাজধানীতে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘোষণা দেন। ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন (২০১০)’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে যে অনেক কিছু সম্ভব তার প্রমাণ যেন এই আইনটির বাস্তবায়ন। এতে পাটের ব্যবহারও বেড়ে গেছে।

দেশে উত্পাদিত বহুমুখী পাটপণ্য বিশ্বের ১১৮টি  দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বহুমুখী পাটপণ্যের খাতটি দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বর্তমানে পাটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এবং ভবিষ্যতে এ হার আরো বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকায় পাট ও পাটপণ্য দেশের অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এটি বলা যায় নিশ্চিত করেই। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জিডিপিসি) তত্ত্বাবধানে পাটপণ্য বহুমুখীকরণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণের ফলে এ পর্যন্ত ২৫০ জন সফল উদ্যোক্তা  তৈরি হয়েছে। বন্ধ পাটকলগুলোও আবার আলোর মুখ দেখছে।

এরই মধ্যে তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর দেশীয় পাটের জীবনরহস্যও উদ্ভাবন করেছেন আমাদের দেশের একদল মেধাবী বিজ্ঞানী। চারদিক থেকে যখন নানামুখী দুঃসংবাদ আর নেতিবাচক ঘটনার সমারোহ, তখন পাটের জিনরহস্য উদ্ভাবনের বিষয়টি নিঃসন্দেহে দেশবাসীর জন্য ছিল একটি বড় সুসংবাদ।

এক ধরনের ছত্রাকের কারণে পাটের খুব ক্ষতি হয়। সেই ছত্রাকের জিনরহস্যও উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ছাড়া লবণাক্ত পানিতে কী করে পাট চাষ করা যায়, এ জন্য লবণাক্ততা সহনশীল পাটের জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন পাটের জাতের মধ্যে এমন  বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্ত করা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে যার চাহিদা রয়েছে। দেশের বস্ত্রশিল্পে কাপড় তৈরির উপযোগী সুতা বর্তমানে পাট থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন পাটের আঁশকে আরো শক্ত ও সূক্ষ্ম করতে। এটি করা গেলে বস্ত্রশিল্পের জন্য উন্নত মানের সুতা পাট থেকেই পাওয়া সম্ভব হবে।

পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে হলে বহুমুখী পরিকল্পনা নিতে হবে। বড় পাটকলের চেয়ে পাটজাত পণ্য তৈরি করতে পারে এমন ছোট ছোট শিল্পের সম্ভাবনা বেশি। কাজেই এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে।

জৈব প্রযুক্তি ও জিনোম গবেষণার মাধ্যমে উত্পাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার অনেক বড়। স্বত্ব বা পেটেন্ট প্রতিষ্ঠা করা গেলে ওই বাজারে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশের চেহারাই পাল্টে যাবে। কারণ জিনোম গবেষণার মাধ্যমে উত্পাদিত পণ্যের বাজারটি কমপক্ষে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের। জিনোম গবেষণার ফলাফলকে উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারলে সেটি আরো কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা যে এনজাইমটির জীবনপ্রক্রিয়া জানতে পেরেছে তা বিশ্বের এনজাইম বাজারের ২০ শতাংশ মেটায়। স্বত্ব পেলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ওই বাজারেও অংশ নিতে পারবে বাংলাদেশ। ছত্রাকের ওপর যে স্বত্ব দাবি করছে বাংলাদেশ, সেটি পেলে বিশ্বের যে যেখানে ওই বিষয় নিয়ে গবেষণা করবেন তাঁদের স্বত্ব বাবদ অর্থ দিতে হবে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির চেহারাই পাল্টে যাবে।

দেশের গবেষণা ক্ষেত্রটি এখনো অনেকটাই সীমিত। গবেষণা খাতে বরাদ্দও কম। এর পরও সীমিত সাধ্যের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা যে সাফল্য দেখাচ্ছেন সেটি অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে এ যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদেরও গবেষণা ক্ষেত্র আরো বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে পাট গবেষণায় বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে সেটিকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের অর্থের কমতি থাকতে পারে কিন্তু মেধাবী এবং দেশের জন্য কাজ করার মানুষের যে অভাব নেই সেটি তো প্রয়াত বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমরাই দেখিয়ে গেছেন।

লেখক : সাংবাদিক, উপস্থাপক

harun_press@yahoo.com

মন্তব্য