kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

আলোকের এই ঝরনাধারায়

বড় বেদনার মতো

আলী যাকের

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বড় বেদনার মতো

আজ এই বসন্তের সকালে আমার পড়ার ঘরের টেবিলে বসেছিলাম। বাইরের আকাশের দিকে দৃষ্টি ছিল নিবদ্ধ।

দেখছিলাম এই বৃষ্টিহীন বাংলার বসন্ত তার উদারতা নিয়ে ঠিকই তার নিজস্ব কাজ করে যাচ্ছে। আমের বোল দুলছে সামনের আমগাছগুলোতে, অশ্বত্থ মেলেছে নতুন পাতা। এমনকি আমার জানালার ওপাশে রাখা পাতাবাহারেও যেন অনেক বেশি বর্ণময় হয়ে উঠেছে বসন্তের আগমনে। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছিল। খুবই উপযুক্ত সময় ছিল এই সকালে নানাবিধ সৃজনশীল লেখালেখি করার। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কয়েকটি চরণ ঘুরে ঘুরে আসছিল আমার মনে। উত্ত্যক্ত করছিল আমাকে।

‘বড় বেদনার মতো বেজেছো তুমি হে আমার প্রাণে,

মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জানে’

রাস্তায় যানবাহনের আধিক্য, ডিজেলপোড়া ধোঁয়া, জনারণ্যে মানুষের উদ্ভ্রান্ত পদচারণ, বিশৃঙ্খলায় ভরে গিয়েছে পেয়ালা, তবুও বসন্ত আসে আমাদের এই ধরায়। নিসর্গ রাঙিয়ে দিয়ে যায় আমাদের মন। আমরা গেয়ে উঠি ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও গো এবার যাবার আগে’। তবুও এই বসন্তের প্রত্যুষে বড় বেদনার মতো হূদয়কে উদ্বেলিত করে বিভিন্ন ঘটনা, অঘটন ও দুর্ঘটনা। আমরা তাই রবীন্দ্রনাথের কাছেই ফিরে ফিরে যাই একটু শান্তির খোঁজে। পথের দিশা কোথায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে, আমরা সবাই জানি যে কতগুলো আদর্শ এবং মূল্যবোধ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল নিরন্তর। আমরা জীবনপণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম ওই যুদ্ধে। বিজয় অর্জন করেছিলাম ও বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। আমি এর আগে অজস্রবার এই কথাটি উল্লেখ করেছি যে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় থেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আমাদের সেই মূল্যবোধ ও আদর্শকে নস্যাৎ করার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী কাজ করে গেছে। যার ফলে আমাদের স্বাধীনতার পর এই ৪৪ বছর পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি নানা চক্রান্তের মাধ্যমে ওই সব বাংলাদেশবিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতায় এসেছে। এবং তারা যখন ক্ষমতায় আসীন থেকেছে তখন বাংলাদেশ নামের দেশটিকে আমরা প্রায় চিনতেই পারিনি। কোথায় গেছে আমাদের লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত স্লোগান, আমাদের সঞ্জীবনী কবিতা ও গানগুলো। ধূলিসাৎ হয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠাতার ভাবমূর্তি। নিষ্প্রভ করা হয়েছে তাঁর উজ্জ্বলতা। বাংলার জনগণ যখনই তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তারা ওই বিজাতীয় শক্তিদের পরাজিত করে মুক্তির পক্ষের শক্তিদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। তবে এই সুযোগ যে খুব সহজেই এসেছে তা নয়। কেননা ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের অর্থবলে, বন্দুকের নলের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে। ১৯৭৫ সালের পরে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ একটি সরকার ক্ষমতারোহণ করেছে। এবং আমরা বুঝতে পারছি, মুক্তির পথ, গণতন্ত্রের পথ, অসাম্প্রদায়িকতার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। আমরা এও বুঝতে পারছি যে পাকিস্তানি মানসিকতাসম্পন্ন অমানুষগুলো আবারও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। না জানি এবার সত্যিই বাংলাদেশ তার আদর্শের পথে পথযাত্রা শুরু করে। এই আতঙ্ক আরো ঘনীভূত হয়েছে এই কারণে যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে এবং সরকার সব দিক গুছিয়ে নিয়ে এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর শাস্তি প্রদান শুরু হয়ে গেছে। এ ছাড়া আমাদের নানাবিধ সমস্যার সমাধানকল্পে একের পর এক উন্নয়নের কাজে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়ে গেছে। এই পদক্ষেপগুলো শুরু হওয়ার কথা ছিল বহু আগেই। কিন্তু মানুষের কল্যাণ এবং জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের পথ থেকে ভিন্ন দিকে আমাদের কর্মকাণ্ডকে অতীতে পরিচালিত করা হয়েছিল, যেন বাংলাদেশ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থাকে। আমরা এর নিদর্শন পাই বাংলাদেশের প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত নৃশংস আক্রমণের মাধ্যমে। ১৯৯৬-২০০১ সালে যখন আজকের ক্ষমতাসীন দল দেশ শাসন করছিল তখন বিভিন্নভাবে ওই দলকে বিপর্যস্ত করার সুপরিকল্পিত চক্রান্ত করা হয়েছিল। ওই সময়ে পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জনসভায় বোমা বিস্ফোরণ করে মানুষ হত্যা করা হয়। যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ করে সাংস্কৃতিককর্মী নিধন করা হয়। পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমায় নিহত হয় যুবক-যুবতী। পরে এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পাকিস্তানপন্থী ও তাদের দোসরদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। এরপর আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারকে নিমর্মভাবে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে তাঁর নিজস্ব এলাকায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রপতির স্ত্রী আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের আরো অনেক নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর সঙ্গেও ওই চক্রান্তকারী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার আলামত পাওয়া যাচ্ছে এখন। লক্ষ করা সম্ভব হবে যে এসব হত্যাকাণ্ড শক্তিশালী আর্জেস গ্রেনেডের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, যার বেশির ভাগ ছিল বিদেশ থেকে আমদানীকৃত। এসব ঘটনাই ঘটেছে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করার জন্য। এই হামলাগুলো ঘটেছে যেসব মারণাস্ত্র দিয়ে, তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে অতি সূক্ষ্মভাবে সমস্ত বিষয় ভেবেচিন্তে এসব ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।

ঠিক একইভাবে আবার যখন আওয়ামী লীগ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলো, তখন আবার শুরু হয়ে গেল ষড়যন্ত্রের খেলা। বিডিআর বিদ্রোহ ওই ষড়যন্ত্রের প্রথম নিদর্শন। ওই বিদ্রোহের মাধ্যমে আমরা একাধিক উচ্চপদস্থ, যোগ্য সেনাবাহিনীর অফিসারদের হারিয়েছি। ঘটনার আকস্মিকতা ও ভয়াবহতা আমাদের বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। বিডিআর আমাদের সীমান্তে সদা জাগ্রত প্রহরী। এই বাহিনীর স্থিতি যদি বিনষ্ট করে ফেলা হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তার মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। এখন আমরা সবাই জানি যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অতি বিচক্ষণতার সঙ্গে ওই সংকট থেকে দেশকে বের করে নিয়ে আসেন। তাঁর সিদ্ধান্তে সামান্য বিচ্যুতি হলেও তাতে করে দেশে একটি গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারত। তিনি অস্ত্রের ভাষা পরিহার করে শান্তিপূর্ণভাবে এই সমস্যার সমাধান করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত সামরিক বাহিনীর অনেকে সেই মুহূর্তে মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পরম ঝুঁকি নিয়ে সেনাছাউনিতে গিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর সদস্যদের অভিযোগ ও দুঃখের কথা শুনেছিলেন। তাদের নিজের যুক্তির কথা বলেছিলেন এবং এভাবেই, যা হতে পারত প্রায় আত্মহননের সমতুল্য, সেই বিপদ থেকে জাতি অব্যাহতি পেয়েছিল। সারা বিশ্ব আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ধৈর্য ও বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয়েছিল এবং প্রশংসায় হয়েছিল পঞ্চমুখ। তার পরও আমাদের সরকার ওই দুর্ঘটনার কোনো সামরিক সমাধানে না গিয়ে গোয়েন্দা বিভাগ কর্তৃক আইনানুগ অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার কারণ নিরূপণে সচেষ্ট হয়েছিল। এই যে অনুসন্ধান, এর ফলাফল কোনো মন্ত্রী অথবা সামরিক কর্মকর্তার মাধ্যমে নয়, এই প্রথমবারের মতো গোয়েন্দা বিভাগের একজন পদস্থ কর্মচারী, যিনি প্রধান অনুসন্ধানকারী ছিলেন, তিনিই ঘোষণা করেন। সব কিছুই একটি সুসভ্য সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী সম্পাদন করা হয়।

আমরা জানি যে আজকের সরকারি দল এর আগে যখন ক্ষমতায় ছিল তখন দীর্ঘদিন ধরে জিইয়ে রাখা পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার একটি সমাধানের ব্যাপারে সচেষ্ট হয়। এরই ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। ফলে যেখানে পূর্ববর্তী সরকারগুলো নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল তা বন্ধ হয়ে যায়। এই শান্তিও বাংলাদেশবিরোধী চক্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল। শান্তিচুক্তি প্রবর্তনের পর আবারও চেষ্টা নেওয়া হয় যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শান্তিবিরোধী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় তাদেরই কিছু মানুষ আবারও আদিবাসীদের সঙ্গে অভিবাসী বাঙালির সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করে। তাই আমরা দেখতে পাই যে সম্প্রতি আবার আগুন জ্বলে ওঠে আমাদের পাহাড়ে। মানুষ নিহত হয়। এমনকি আইন প্রয়োগকারীরাও মাঝেমধ্যে এই সংঘাতে ইন্ধন জোগানোর চেষ্টা করে। আমরা এখনো জানি না এরা কারা। যখন পাহাড়ি ও বাঙালিরা একে অন্যের সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল হয়ে জাতি, ধর্ম-নির্বিশেষে বাংলাদেশবাসী হিসেবে হাতে হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিল তখনই আবার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটল। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় যে যারা এ ধরনের বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে তাদের মাথা থেকে বোধ হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভূত এখনো বিতাড়িত হয়নি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনো সাম্প্রদায়িক ছিল না। এ জন্যই অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিল ধর্মোন্মাদ দেশ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। বাংলাদেশবাসীর হূদয়ে বিধৃত এই উদারতাকে বিনষ্ট করার শক্তি অথবা ক্ষমতা আমরা প্রতিহত করবই। তবুও হূদয় ভারাক্রান্ত হয়ে আসে। এই সংঘাত, এই হত্যা বড় ব্যথিত করে আমাদের। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের হূদয় মথিত করে বেরিয়ে আসে,

‘বড়ো আশা, বড়ো তৃষা, বড়ো আকিঞ্চন তোমারি লাগি

বড়ো সুখে, বড়ো দুখে, বড়ো অনুরাগে রয়েছি জাগি। ’

 লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য