উপমহাদেশে রাজনৈতিক অসহনশীলতা-334597 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


উপমহাদেশে রাজনৈতিক অসহনশীলতা

মো. মইনুল ইসলাম

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উপমহাদেশে রাজনৈতিক অসহনশীলতা

রাজনৈতিক সহনশীলতা গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভিন্নমত, ভিন্নপথ, প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচনা ও স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অপরিহার্য অংশ। এ স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে বা এর ওপর আঘাত এলে বুঝতে হবে গণতন্ত্র সে দেশে সংকটের মুখে। এ ধরনের কিছু সংকটের আলামতই দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। আমাদের বাংলাদেশও সে সংকট থেকে মুক্ত নয়। ভারত বৃহৎ দেশ এবং তার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও বেশ পুরনো, প্রায় ৬৮ বছরের। তার পরও সেখানে ব্যক্তি বা বিভিন্ন ধর্ম বা জাতি-গোষ্ঠীর স্বাধীনতা অবাধ বা মুক্ত নয়। সম্প্রতি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্র পরিষদ প্রয়াত আফজাল গুরুর ফাঁসিতে মৃত্যুর ব্যাপারে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ও তার ফলে সরকারের দমনমূলক কার্যকলাপ ভারত সরকারের গণতান্ত্রিক সহনশীলতাকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গেল ফেব্রুয়ারির ওই মানবাধিকার সেমিনারে আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ডের সমালোচনা করা হয়। ভারতীয় পার্লামেন্টে আক্রমণের অভিযোগে কাশ্মীরি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীর মৃত্যুদণ্ডই ছিলই সেমিনারের আলোচ্য মুখ্য বিষয়। সেখানে ভারতবিরোধী সমালোচনা ও ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানের অভিযোগে ছাত্র পরিষদ নেতা কানাইয়া কুমার ও তাঁর দুই সহযোগীকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে শুধু পুলিশ নয়, শাসক দল বিজেপি ও তাদের বশংবদ ছাত্রগোষ্ঠীও আইন-আদালতের আশ্রয় নেয়। আদালত প্রাঙ্গণে কানাইয়াকে বিজেপিপন্থী আইনজীবীরা মারধর করেন।

জেএনইউ ও কানাইয়ার ঘটনার কিছুদিন আগে ভারতের হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দলিত শিক্ষক ও গবেষক আত্মহত্যা করেন। দলিত বলে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। এ কারণে রোহিত ভাবমুলা নামের এই তরুণ পণ্ডিত আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও দলিতরা নানাভাবে রাষ্ট্র ও সমাজে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়। সেই নির্যাতনের হাত থেকে উদার ও বামপন্থী নাগরিকরাও রেহাই পায় না। বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অসহিষ্ণুতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। গরুর মাংসবিরোধিতা থেকে মুসলমান বিদ্বেষ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ‘ঘরওয়াপসি’ বা ঘরফেরত অভিযানে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তর করার চেষ্টা হয়েছে। এসবের ফলে অসহিষ্ণুতা ও অসহনশীলতার তীব্রতায় ভারতের শিক্ষিত, সচেতন ও উদার গণতন্ত্রমনা মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। তারই প্রকাশ ঘটে ভারতের সেরা জ্ঞানী, গুণী, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ফেরত প্রদানের মাধ্যমে। প্রতিবাদের এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে, যার প্রমাণ জেএনইউয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে দেশের ৩৭৮ জন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্যের কাছে শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় তাঁদের ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব ইদানীং দেখা যাচ্ছে। বহুল প্রচারিত দুটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে সরকারি মহলের অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে। একজন সুপরিচিত সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ১-১১ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে দেশব্যাপী মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু সমন জারি হয়েছে। সে সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সেনা গোয়েন্দাদের একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি অন্য অনেক পত্রিকার মতো অভিযুক্ত সম্পাদকও তাঁর পত্রিকায় ছেপেছিলেন। এক টক শোতে তিনি ব্যাপারটি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। এটাই তাঁর জন্য কাল হলো। তবে সচেতন নাগরিক সমাজের ধারণা, এটা স্বীকার করে উপরোক্ত সম্পাদক মহোদয় সৎসাহসের পরিচয় দিয়েছেন। আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষ চায় বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হোক। তাহলে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। কারণ গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ ও জনমতের প্রতিফলন, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

আসল ব্যাপার হলো, দরিদ্র দেশের গণতন্ত্রও দরিদ্র ও দুর্বল হয়। দেশে গণতন্ত্রের একটা খোলস বা পোশাকি রূপ বিরাজ করে বটে। গণতন্ত্রের কিছু আচার-অনুষ্ঠানও বহাল থাকে। তবে তার আসল চেতনা বা মর্মার্থটি বহুলাংশেই থাকে অনুপস্থিত। ক্ষমতাবলে বা ক্ষমতাসীন দলগুলো তাদের সুবিধামতো গণতন্ত্রের কথা বলে। অন্যদিকে আইন, শাসন ও নির্বাচন দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহারের অপচেষ্টায় থাকে ব্যস্ত। গণতান্ত্রিক বিধিবিধান, আচার-অনুষ্ঠান ও সর্বোপরি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রকৃত অর্থে চর্চা হয় না। তাই জনগণের সত্যিকার মতামত ও আশা-আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন হয় না। যতই বলা হোক না কেন প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক জনগণ, আসলে জনগণ হয়ে দাঁড়ায় প্রজা। তাদের কাজ হয় ভয়ে ও নীরবে ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলাদের দাসত্ব মেনে নেওয়া। প্রকৃত গণতন্ত্রের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সরকার জনগণকে ভয় করে এবং জনমতকে সম্মান করে। অন্যদিকে গণতন্ত্রহীন বা দুর্বল গণতন্ত্রের দেশে জনগণ সরকারের ভয়ে ভীত থাকে। এমন গণতন্ত্রে বিরুদ্ধ মত ও বিরূপ সমালোচনা খুব কমই সহ্য করা হয়।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য