kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এপার-ওপার

ছিটের ভোটার ১৬ হাজার

অমিত বসু

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল কোচবিহার। কোথাও এমনটা নয়।

আকাশে-বাতাসে পাখির গান, ফুলের উল্লাস। বন্দনা নতুন মানুষগুলোকে। যারা এখানকার কেউ ছিল না। প্রথম এসেছে আনকোরা নাগরিক হয়ে। থাকত ছিটমহলে। না ছিল কোনো পরিচয়, না পেয়েছিল অধিকার। মানুষ অবশ্যই, তবে পৃথিবীর কেউ নয়। গণ্ডিতে বন্দি। সীমা পেরোলেই শাস্তি। অভিশপ্ত জীবনের অবসানের পর তারা এবার কোচবিহারের বাসিন্দা। থাকে অস্থায়ী আবাসনে। তাতে কী, মাথার ওপর ছাদ তো আছে। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি অধিকার। ভারতের নাগরিক হিসেবে ভোটদানের অধিকার। তারা সংখ্যায় নেহাত কম নয়, ১৬ হাজার। যাদের কেউ চিনত না, তাদের চিনেছে নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শুরু ৪ এপ্রিল, তার আগেই যাতে তারা সচিত্র ভোটার পরিচয় পায়, লক্ষ রাখা হচ্ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নাসিম জায়দি দিল্লিতে ঘোষণা করেছেন, পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে। আমাদের সব থেকে বেশি নজর কোচবিহারে। যারা ছিটমহল থেকে এসে নতুন ভোটার হয়েছে তাদের দিকে। মর্যাদার সঙ্গে পূর্ণ অধিকার নিয়ে তারা যাতে ভোট দিতে পারে, কোনো অসুবিধায় না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা হচ্ছে। আর সব জায়গার ভোট যেমন হওয়ার তেমন হবে। কোচবিহারের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। নতুন ইতিহাসের মুখে পশ্চিমবঙ্গ। ছিটের বাসিন্দাদের নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার পর তার অনুশীলন যাতে যথার্থ হয়, প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুদিন আগেও যাদের খোঁজ নেয়নি কেউ, কী খাচ্ছে, কী পরছে, কিভাবে থাকছে খেয়াল রাখার প্রয়োজন হয়নি; এখন তাদের নিয়েই টানাটানি। দরদ উথলে উঠেছে। সব রাজনৈতিক দলই বলছে, আমরা তোমাদের জন্য যা করেছি, কেউ করেনি। তৃণমূল সভানেত্রী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোর গলায় বলছেন, ছিটমহল সমস্যা আমিই মিটিয়েছি। আমি না থাকলে আপনারা যেতেন কোথায়? সিপিএমের দাবি, তৃণমূলের জন্ম তো এই কয় বছর আগে, ১৯৯৮ সালে। তার বহু আগে থেকে আপনাদের জন্য আমরা লড়ছি। বিজেপি হাসতে হাসতে বলছে, ওদের কথা কানে তুলবেন না। ওরা যা বলছে সব মিথ্যা, বাজে। যা করেছে বিজেপিই করেছে। বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আপনাদের মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন।

নব্য নাগরিকরা হতভম্ব। এত গুরুত্ব তারা কোনো দিন পায়নি। হাওয়ায় তুলার মতো ভেসেছে। পলক তুলে কেউ তাকায়নি। এবার বুঝছে, ভোটার হলে কদর বাড়ে, আদরও চড়ে। তাদের মন পড়তে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলো। কোন দিকে ঝুঁকছে আঁচ করতে চাইছে। না, এখনো মন স্থির হয়নি। হাতে সময় আছে। সবদিক খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।

মোদি সম্পর্কে একটা দুর্বলতা অবশ্যই আছে। ভারতের অনেক প্রধানমন্ত্রীকে তারা দেখেছে। কই, কেউ তো কিছু করেননি। মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েই দরদি মন নিয়ে তাদের কথা ভেবেছেন। সব দলকে রাজি করিয়ে ছিটমহল চুক্তি রূপায়ণে উদ্যোগী হয়েছেন। তিস্তা চুক্তিও দ্রুত হবে বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথা দিয়েছেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি এত দিন ঝুলে ছিল। কার্যকর করা কঠিন হতো না, যদি প্রধানমন্ত্রীরা একটু সক্রিয় হতেন। তেমন আগ্রহ লক্ষ করা যায়নি। বরফ ভেঙেছেন মোদি। ঢাকায় ছুটে গিয়ে ছিটমহলের পালে হাওয়া লাগিয়েছেন। ছিটের লোকেরা জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশ-ভারতে। এখন আর কেউ বলবে না, তোমরা কোনো দেশের নাগরিক নও।

ভারতে থাকতে হলে শুধু দিল্লির কথা ভাবলে চলবে না। কলকাতার কথাও মাথায় রাখতে হয়। কোচবিহারের আইনশৃঙ্খলা থেকে উন্নয়ন—সবটা দেখার কথা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। সেই রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এখন পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের ফল ঘোষিত হবে ১৯ মে। তখন জানা যাবে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী থাকছেন, না নতুন কেউ আসছেন! নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তনের প্রকৃতি জানা কঠিন। মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে সিপিএম-কংগ্রেস একসঙ্গে। তারা জোট বেঁধে তৃণমূলকে হারাতে চাইছে। দুটি দলের ভোট এক হলে মমতা অবশ্যই বিপদে পড়বেন। সেটা জেনেই মমতা এই জোটকে কটাক্ষ করেছেন। বলেছেন, নীতিহীন জোট। অস্তিত্ব রক্ষায় ওরা ঘোঁট পাকাচ্ছে। কেরালায় সিপিএম-কংগ্রেস মুখোমুখি লড়ছে। আবার তারাই পশ্চিমবঙ্গে হাতে হাত ধরে তৃণমূল সরকারকে উপড়ে ফেলতে চাইছে।

২০১১ সালে বিষয়টা ছিল একবারে উল্টো। সিপিএমের ৩৪ বছরের শাসন নস্যাৎ করতে তৃণমূল আর কংগ্রেস জোট বেঁধেছিল। সফলও হয়েছিল। সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকারের যবনিকা পতন ঘটেছিল। সেই কংগ্রেস আজ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে মমতাকে ছেড়ে সিপিএমের সঙ্গে। মমতার পতন ঘটাতে মরিয়া।

কংগ্রেসের মন পরিবর্তনের কারণ অবশ্যই আছে। ভোটে জেতার পর কংগ্রেসকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করেন মমতা। কংগ্রেস দলটাকেই গিলে ফেলার ষড়যন্ত্র চালান। কংগ্রেস বাঁচতেই মমতার হাত ধরেছিল। ফল হলো উল্টো। মমতার সঙ্গী হয়ে মৃত্যু ডেকে আনল। সরকারে যোগ দিয়েও তড়িঘড়ি মমতার সঙ্গ ত্যাগ করে দলটাকে বাঁচাল। মমতার আচরণের বিরুদ্ধে এবার প্রতিশোধ নিতে চায় কংগ্রেস। সিপিএমের হাত ধরে মমতাকে ছুড়ে ফেলার লড়াই।

এটা ঠিক ২০১১ সালে কংগ্রেস পাশে না থাকলে মমতা জিততে পারতেন না। তৃণমূল বামফ্রন্টের চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছিল। তাদের ঝুলিতে ছিল মাত্র ৩৮.৯৩ শতাংশ। সেখানে বামেরা পেয়েছিল ৪০.৭৭ শতাংশ। কংগ্রেসের ৯.০৯ শতাংশ ভোট তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তারা বামেদের ছাপিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারত যদি কংগ্রেস এবারও তৃণমূলের সঙ্গে থাকত। কংগ্রেস বিরুদ্ধশিবিরে চলে যাওয়ায় মমতা উদ্বিগ্ন। তিনি মুখে বলছেন, আমাদের উন্নয়নের হাওয়ায় অন্য সব দল উড়ে যাবে। মনে মনে জানেন, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। তাঁর বেশি ভাবনা তৃণমূল দলটাকে নিয়েই। সেটা আর আগের মতো নেই। পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতা ভোগ করে পচনের শিকার। রাজ্যজুড়ে দলের মধ্যে গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব। যেখানে নতুন প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, সেখানে বেশি গোলমাল। পুরনো প্রার্থী ঝামেলা পাকাচ্ছেন। তারা জানে, তৃণমূলের মতো দক্ষিণপন্থী দলে ক্ষমতা না থাকলে ক্যারিয়ার জিরো। যেভাবে হোক ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতেই হবে। সেটা নরম রাস্তায় হয় না। প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাহুবলে কাত করা দরকার। তা না হলে নির্দল প্রার্থী হয়ে তৃণমূলের স্বীকৃত প্রার্থীকে হারানোও যেতে পারে। তৃণমূলই যদি তৃণমূলকে হারাতে চায় রুখবে কে! মমতার সব থেকে বড় শঙ্কা নিজের দলকে নিয়েই।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক


মন্তব্য