মায়ের ঋণ কি শোধ দেওয়া যায়?-334219 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


মায়ের ঋণ কি শোধ দেওয়া যায়?

ওয়াহিদ নবি

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মায়ের ঋণ কি শোধ দেওয়া যায়?

আমার জন্মের পর যে ভীষণ কষ্টের সঙ্গে মা আমাকে মানুষ করেছিলেন সে কষ্ট দেখার শক্তি আমার হয়নি। তাই সে কষ্ট যে কত কষ্ট তা আমি বুঝিনি। নিজের সন্তানদের যখন মানুষ করেছিলাম তখন ওদের মানুষ করা নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। আমার স্ত্রী যে সীমাহীন কষ্টের সঙ্গে ওদের মানুষ করেছিল, সেটা ভালো করে দেখিনি। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কষ্টটাও ভালো করে বুঝিনি। তারপর যখন নিজের মেয়েদের দেখলাম তাদের সন্তানদের মানুষ করতে, তখন আমি ‘অবজারভার’, মাঝে মাঝে একটু-আধটু সাহায্য করা। সেটা কিছু না। দেখলাম কি কষ্ট তারা করছে নিজের সন্তানদের মানুষ করতে। এই ভয়ানক কষ্ট তারা করছে হাসিমুখে, একটু বিরক্ত না হয়ে, অনেকটা গর্বের সঙ্গে। মায়ের হাতে মানুষ হয়ে, অনেকেই বড় হয়েছেন কিন্তু মায়ের ঋণ কেউ শোধ দিতে পারবেন না। বাবা অনেক কষ্ট করেন কিন্তু আমার এক বন্ধু ঠিক বলেছিল, ‘মায়ের তুলনায় বাবাও অত বড় নন’—অন্য কেউ তো কিছুই না।

সন্তানের জন্মের পর মনে হয় সে শুধু ঘুমায়। তাকে খাওয়াতে হয়। পরিষ্কার রাখতে হয়। আরামে রাখতে হয়। নিরাপদে রাখতে হয়। তার সব প্রয়োজনের দিকে নজর রাখতে হয়। অথচ সন্তান কিছু বলতে পারে না। তার একমাত্র ভাষা কাঁদা। অথচ মা তার সব প্রয়োজন বুঝছেন এবং সব প্রয়োজন মেটাচ্ছেন সময়মতো। অপূর্ব। তুলনাহীন। সব কিছু হয়ে যাচ্ছে, তাই আমরা বুঝি না যে যা হয়ে যাচ্ছে তা হওয়ানোর জন্য মা কত কষ্ট করেন। কত ত্যাগ স্বীকার করেন। নানা কারণে সন্তান রাতে জেগে ওঠে। কাঁদে। তার কান্না থামায় মা। কেন সন্তান কাঁদছে তার কারণ বের করেন মা। কারণ দূর করেন মা। কান্না থামিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে সন্তান। মাকে প্রায় নিদ্রাহীন রাত যাপন করতে হয়। অন্যরা হয়তো কিছু সাহায্য করে কিন্তু মা সব কিছুর দায়িত্ব বহন করেন। নিদ্রাহীন রাত যাপনের পর দিনেও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। সংসারের সব কাজের দায়িত্ব মায়ের হাতে। আর তা ছাড়া সন্তানের অনেক রকমের প্রয়োজন তো রয়েছেই। মা ছাড়া সেসব প্রয়োজনের দিকে কে দেখবে?

এরপর সন্তান যখন বড় হতে থাকে তখন নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিতে থাকে। মা সেগুলো সমস্যা বলে মনে করেন না। হাসিমুখে সমস্যার সমাধান করেন। মনে করা যাক বাচ্চাকে পরিষ্কার রাখার ব্যাপারটা। একটু বড় হলে বাচ্চা এক মুহূর্ত স্থির থাকে না। এক জায়গায় এক মুহূর্তের জন্যও থাকে না। সে তো বোঝে না সহযোগিতা না করলে তাকে পরিষ্কার করা কষ্টকর। সে তো বোঝে না সে সহযোগিতা না করলে মা যা করতে চান, তা করতে মায়ের অনেক সময় লাগে। অনেক বাচ্চা আবার কান্নাকাটি করে। এমনিভাবে মা বাচ্চাকে পরিষ্কার করেন। তাকে পরিষ্কার রাখেন। এমনও হয় যে অনেক কষ্ট করে মা যখন শিশুকে পরিষ্কার করার কাজটি শেষ করেন সে মুহূর্তে সে নিজেকে অপরিষ্কার করে ফেলে। একটু বিরক্ত না হয়ে মা আবার নতুন করে কাজটি শুরু করেন। দেখে মনে হয় যেন মজার ঘটনা কিছু একটা ঘটেছে।

বাচ্চার নিরাপত্তা বিধান। মনে হতেই নিজের অজান্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় ‘বাপ রে বাপ’। সমস্যাটা শুরু হয় বাচ্চা হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করলে। আর শেষ কবে কেউ জানে না। সমস্যা নানাভাবে আসতে পারে। বাচ্চা এমন জিনিস ধরতে পারে, যা তার ক্ষতি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, গরম জিনিসে হাত দেওয়া। বাচ্চা বিভিন্ন জিনিসে উঠতে শিখে। যেমন আসবাবপত্রে। উঠলে তো ক্ষতি নেই। কিন্তু পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা যে। বাচ্চাদের আর একটি প্রিয় শখ হচ্ছে জিনিসপত্র ঠেলে নিয়ে বেড়ানো। সমস্যা হচ্ছে যে জিনিসগুলো উল্টে পড়ে যায় মাঝে মাঝে আর সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গিয়ে আহত হয় বাচ্চাগুলো। এমনি কত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে নানা জানা-অজানা কারণে। এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করার উপায় নেই। কিন্তু মায়ের তো অন্য কাজ রয়েছে।

বাচ্চার জন্য দেখেশুনে সুন্দর সুন্দর কাপড় কেনেন মায়েরা। অন্যরাও উপহার দেয় অনেক। সুন্দর সুন্দর কাপড় পরিয়ে বাচ্চাকে সুন্দর করে সাজাবে—সব মা তা-ই চান। কিন্তু বাচ্চাকে কাপড় পরানো সহজ কাজ নয়। কাপড় পরানোর সময় ছুটে পালানোর চেষ্টা তার খুব প্রিয়। কোনো কোনো বাচ্চা আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেয় কাপড় পরানোর সময়। নানাভাবে বাচ্চারা আবার কাপড়চোপড় নোংরা করে ফেলে।

প্রবাদ বাক্যের মতো সবাই বলে ‘না কাঁদলে এমনকি মাও খেতে দেন না’। বাচ্চা কাঁদল আর মা খেতে দিলেন। এমনটা হলে জীবনটা বেশ সহজ হতো। কোনো কোনো বাচ্চা খেতেই চায় না। কত কায়দা-কানুন করে মা তাদের খাওয়ান। খেতে বসালে অন্য সব কাজ করতে চায় বাচ্চারা। ছুটে পালাতে চায়। একটুও বিরক্ত না হয়ে মা তাদের খাওয়ান। কত যে ধৈর্য দরকার এ জন্য। এই ধৈর্য বোধ হয় মা ছাড়া আর কারো নেই।

আমাদের মায়েদের সময় মহিলারা লেখাপড়া করতেন অনেকটা শখ করে। পরিবারে শিক্ষা প্রচলিত আছে সেটা দেখানোর জন্য। চাকরি করতে যেতেন সামান্যসংখ্যক। আমাদের সময় মেয়েদের চাকরিতে যাওয়া শুরু হয়েছে। এখন মেয়েরা চাকরিতে যাচ্ছে। চাকরি করতে করতে মাতৃত্ব। কাজটা সহজ নয়।

আমাদের সময়ের শ্রদ্ধেয় গায়ক সুধীরলাল চক্রবর্তী। ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানটি গেয়েছিলেন তিনি। হূদয়গ্রাহী সেই গান। গানটি গেয়ে নিজের জন্য একটু সমস্যার সৃষ্টি করেছিলেন। অনেকে তাঁর এই গানটিই শুধু শুনতেন। গানটির একটি পঙিক্ত, ‘সে যে আমার মা, বিশ্ব ভুবন মাঝে তাহার নাইকো তুলনা। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মায়ের তুলনা কেউ নেই।

লেখক : বিলেতের রয়াল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টের একজন ফেলো

মন্তব্য