রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিকল্প-334215 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


সাদাকালো

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিকল্প ভাবনা

আহমদ রফিক

১০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিকল্প ভাবনা

যে ভূমিতে আমার আবাস সে স্থানটিকে পরিচ্ছন্ন, সুশ্রী রাখার দায়িত্ব আমার। আবাসিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পেছনে দৃষ্টিভঙ্গি যেমন নান্দনিক, তেমনি তা প্রয়োজনগত। প্রয়োজনটা বিশেষভাবে শরীর, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে এবং পারিবারিক পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে, দৈশিক পর্যায়ে। সুস্থ জীবনযাপনের পূর্বশর্ত জীবনবান্ধব পরিবেশ। বাসযোগ্য পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে কবির ভাষ্যও ভিন্ন নয় :

...‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে...বাসযোগ্য করে যাব আমি’ ইত্যাদি।

কবি হিসেবে, সমাজ সচেতন মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর কিছুসংখ্যক বন্ধুও ছিলেন অসাধারণ পরিবেশবান্ধব চেতনার। উদ্ভিদ ভুবন, ভূমি, জলস্রোত দূষণের বিরুদ্ধে ছিল তাঁদের সচেতনতা। সুশ্রী-স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষার দিকে ছিল তাঁদের সতর্ক দৃষ্টি। পরিবেশ বলতে তো মূলত প্রকৃতি। প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতিমূলক সহাবস্থানে বিশ্বাসী তাঁরা। প্রকৃতির ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার নয়, আঘাত নয়। কারণ বিজ্ঞানের তত্কালীন সীমাবদ্ধ ধারণা নিয়েও তাঁদের স্পষ্ট ধারণা ছিল প্রকৃতির প্রতিশোধ সম্পর্কে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃতির ওপর আঘাত পাল্টা-আঘাত হয়ে ফিরে আসে, অনেকটা স্বতঃসিদ্ধ প্রক্রিয়ায়। কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষভাবে। মহাসাগরীয় সুনামির পৌনঃপুনিকতার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে সাগরতলে আণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথাও অনেকে বিবেচনায় আনেন। সেটা অনেক আগের কথা।

একালের অত্যাধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তি যেমন আক্রমণাত্মক প্রবণতা তৈরি করেছে (যেমন আণবিক বোমাবর্ষণ) তেমনি এক শ্রেণির মানুষকে পরিবেশ সচেতনও করে তুলেছে। তাই বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব সংগঠন, চলছে কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ, ওজোন স্তরের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, চিন্তাভাবনা। সাম্রাজ্যবাদী ও স্বার্থবাদী পরিবেশদূষণ বন্ধ করতে ইচ্ছা-অনিচ্ছার টানাপড়েনের মধ্যেই চলছে বিশ্ব পরিসরে জলবায়ুবিষয়ক ও পরিবেশবিষয়ক মহাসম্মেলন। তাতে চলে তুমুল বিতর্ক স্বার্থবাদী, নিঃস্বার্থবাদীদের মধ্যে। গ্রহণ করা হয় বাধ্যতামূলক কিছু পরিবেশবান্ধব প্রস্তাব, তা বাস্তবায়ন হোক বা না হোক।

দুই.

পরিবেশদূষণ রোধে, সুস্থ পরিবেশ রক্ষার তাগিদে বাংলাদেশেও তত্পর পরিবেশবান্ধব সংগঠন। নদীদূষণ, বায়ুদূষণ, গাছপালা নিধনের মতো নানা প্রকৃতিবিরোধী, জনস্বাস্থ্যবিরোধী উপদ্রব ও উত্পাতের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। কখনো কখনো বিষয়-বিচারে তা জনস্বার্থের, দেশস্বার্থের আন্দোলনে পর্যবসিত। তেমনি একটি বিষয় সুন্দরবনের সান্নিধ্যে রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। এর মূল কথা যেমন জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা, তেমনি বাংলাদেশের উপকূলস্থ মহামূল্যবান প্রকৃতি সুন্দরবন রক্ষা। মুক্তপ্রাণ সুন্দরবনের স্বাস্থ্য হুমকির মুখে বলেই এ আন্দোলন।

রামপাল তাপ বিদ্যুেকন্দ্র প্রকল্প নিয়ে বছর কয় ধরে চলছে পরিবেশ সচেতন কিছুসংখ্যক মানুষের নানামাত্রিক প্রতিবাদ-সভা-সমাবেশ-মিছিল-লংমার্চ ও স্মারকলিপি প্রদানের মতো তত্পরতা। তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি থেকে শুরু করে একাধিক সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন জনস্বার্থ, জাতীয় স্বার্থবিরোধী প্রকল্প, বিশেষভাবে সুন্দরবন বিধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সোচ্চার। আবারও এদের ‘ঢাকা-সুন্দরবন লংমার্চ’ তথা দীর্ঘ প্রতিবাদী যাত্রার আয়োজন ১০ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ (২০১৬)।

সরকার বনাম প্রতিবাদীদের এ দ্বন্দ্ব নিঃসন্দেহে একটি জাতীয় সমস্যা। এর সমাধান জাতীয় পর্যায়ে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে হতে পারে। কিন্তু সরকার পক্ষ এ ব্যাপারে আগ্রহী বলে মনে হয় না। তারা তাদের সিদ্ধান্তে অনড়—এমনটাই দৃশ্যমান। এ পর্যন্ত রামপাল-সুন্দরবন সমস্যা নিয়ে দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়ায় যা উঠে এসেছে, তাতে বিষয়টি নিয়ে তথ্য ও যুক্তিতর্কের বৈঠকে আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। সে ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই আবেগহীন ও যুক্তি তথ্যনির্ভর হতে হবে।

রামপাল প্রকল্পের প্রতিবাদী পক্ষের প্রধান যুক্তি কয়লাভিত্তিক এ প্রকল্পের বর্জ্য প্রতিক্রিয়ায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাচীর হিসেবে স্বীকৃত সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতিতে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকিতে পড়বে। অন্যদিকে পর্যটকদের পক্ষে আকর্ষণীয় সুন্দরী বৃক্ষের সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও হুমকি ও সম্ভাব্য ধ্বংসের সম্মুখীন হবে।

এরই মধ্যে মানুষের অত্যাচারে সুন্দরবনের বিশ্বখ্যাত ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। সুন্দরবনের বাঘ জরিপে তেমন আশঙ্কা প্রতিফলিত হয়েছে। তাই স্লোগান উঠেছে—‘বাঘ বাঁচাও’। এ বিষয় নিয়ে লেখালেখিও যথেষ্ট মাত্রার। পালিত হয়েছে ‘বাঘ দিবস’। আসলে শুধু বাঘ নয়, বাস্তবে ‘হরিণ দিবস’ও পালিত হওয়া উচিত নিষ্ঠুর মানুষের লোভ-লালসা থেকে নিরীহ, অসহায় প্রাণিকুলকে বাঁচাতে।

এককথায় অনাচারের হাত থেকে সুন্দরবনকে, তার জীববৈচিত্র্যকে বাঁচাতে আরো আগেই আন্দোলন শুরু হওয়া উচিত ছিল। তবু ভালো যে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের বৈনাশিক চরিত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উপলক্ষে ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ স্লোগান উঠেছে। সুন্দরবন বিনাশে আরেক অর্থনৈতিক ক্ষতি সুন্দরবন থেকে মধু আহরণকারীদের। পর্যটনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা এর আগেই উল্লিখিত হয়েছে।

প্রতিবাদীদের বড় আপত্তি প্রথমত প্রকল্পের কয়লাভিত্তিক চরিত্রের কারণে। এর বিপুল কালো ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণ সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রকট বায়ুদূষণ ঘটাবে, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে সুন্দরবনের প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর। এর দূর প্রতিক্রিয়াও কম গুরুত্বহীন নয়। তা ছাড়া প্রকল্পের প্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের উদ্ভিদ রাজ্যের জীবন শুকিয়ে যেতে থাকবে, হুমকির সম্মুখীন হবে এদের অস্তিত্ব।

অন্যদিকে দূষিত হবে সুন্দরবন এলাকার নদীনালা ও খালের পানি, যা আবার বিরূপ প্রভাব ফেলবে সুন্দরবনের প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের ওপর। পরোক্ষ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে এ এলাকায় ভূমির উর্বরতা হ্রাসে এবং কৃষির উত্পাদন ক্ষেত্রে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে জলাভূমিই নয়, জলস্রোতই নয়, মত্স্যকুলই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বৃহত্তর সুন্দরবন এলাকার মানুষ অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এলাকার কৃষিজীবী, মত্স্যজীবী, বনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। আর এই প্রকল্পের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে একসময় বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত সুন্দরবনের একাংশ হারাবে বাংলাদেশ, দূর ভবিষ্যতে গোটা সুন্দরবন। বিশ্ব উদ্ভিদ ভুবনের অনন্য সৌন্দর্যস্থান সুন্দরবন হারিয়ে যাবে ভূ-ইতিহাসের পাতা থেকে।

তিন.

একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ কি চাইবে এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে? বিশেষ করে যখন বিদ্যুৎ উত্পাদনের আরো বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম পর্বে দুই ইউনিটে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ও পরবর্তী প্রকল্পে অনুরূপ মাত্রার বিদ্যুৎ উত্পাদন যুক্ত হবে। তাতে প্রকল্পে ফসলি জমির ব্যবহার যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে কয়লার ব্যবহার এবং তার বৈনাশিক প্রতিক্রিয়া। গোটা অঞ্চলটির হবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, বিরানভূমি যদি নাও হয়।

এই প্রকল্প নিয়ে সুন্দরবনভিত্তিক আপত্তির বড় কারণ কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিধান লঙ্ঘন করে সুন্দরবনের সন্নিকটে রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন। প্রতিবেশী শিল্পোন্নত ভারতের অরণ্যনীতিতে বিধান রয়েছে বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এ-জাতীয় ক্ষতিকর শিল্প স্থাপন না করার। যে তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবাদীদের আপত্তি সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি কয়লাভিত্তিক উন্মুক্ত প্রকৃতির বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে, যা মারাত্মক পরিবেশদূষণ ঘটাবে। এ ক্ষেত্রেও উদাহরণ ভারত ও চীন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা হয়েছে, এতদসংক্রান্ত প্যারিস সম্মেলনের সংশ্লিষ্ট আলোচনা ও তর্কবিতর্ক এবং অবশেষ সিদ্ধান্ত যে বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখার দায়ে কয়লাভিত্তিক শিল্প প্রকল্প ক্রমান্বয়ে হ্রাস ও বন্ধ করা অপরিহার্য। সম্ভবত এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই ভারত ও চীন ক্রমান্বয়ে কয়লাভিত্তিক শিল্প-কারখানা হ্রাস ও বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে রামপাল প্রকল্পের প্রধান কারিগর এনটিপিসি-কে ভারতে অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিজ দেশের স্বার্থ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভারত বরাবরই যথেষ্ট সচেতন।

অথচ সেই কম্পানিই বাংলাদেশের পিডিবি নামের বিদ্যুৎ সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎ উত্পাদনের বৈশ্বিক নিয়মনীতি ও পদ্ধতি লঙ্ঘন করে প্রকল্প তৈরি করেছে। এনটিপিসি বিদেশি কম্পানি, তাদের বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার কোনো দায় নেই। সে দায় রয়েছে বাংলাদেশি সংস্থার এবং বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকদের। দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে তারা উদাসীন। দেশপ্রেম, স্বদেশ স্বার্থ তাদের চেতনায় দাগ কাটে না।

চার.

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে প্রতিবাদ যে ভিত্তিহীন নয় তার অন্তত কিছু প্রমাণ আন্তর্জাতিক মহলের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। কিছুদিন আগে প্রকাশিত সংবাদপত্রের খবর যে নরওয়ে এ প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ পার্শ্বপরিবর্তনের প্রধান কারণ সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা। অন্য সূত্রে জানা গেছে যে দক্ষিণ এশীয় মানবাধিকার সংস্থা এ বৈনাশিক প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউনেসকোর মতো জাতিসংঘসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্ন তুলে তাদের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কথা বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারি নীতি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের পিপি বা এর অর্থনৈতিক বিচার-ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না, যেহেতু আমি অর্থনীতিবিদ নই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও মানবিক ভালো-মন্দ ও স্বার্থবিষয়ক প্রকাশিত তথ্যাদি থেকে নিশ্চিত যে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনা নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তা সরকারপক্ষে অত্যাবশ্যক। কারণ সরকারি প্রকল্পের পেছন পেছন যেখানে অনুরূপ প্রকল্প নিয়ে অনেক স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটবে। যেমন এসেছে ওরিয়ন। অথচ ষাটের দশকে ওরিয়নের প্রতিষ্ঠা ছিল স্বাদেশিকতার টানে, একচেটিয়া অবাঙালি শিল্প স্বার্থের বিপরীতে। বর্তমান ওরিয়ন মনে হয় তার প্রতিষ্ঠালগ্নের স্বাদেশিকতার আদর্শ ধুয়ে-মুছে ফেলেছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি জাতীয় বুর্জোয়ার ভাবাদর্শ নিয়েও মাথা ঘামায় না, সমাজবাদী মতাদর্শ দূরে থাক।

আমরা জানি, সরকারের প্রধান দাবি জনগণকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্যই রামপাল প্রকল্প যাতে প্রতি ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা চলে, ঠাণ্ডা যন্ত্র চলে। এ দাবির গুরুত্ব যথোচিত। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অবিকল্প সম্পদ সুন্দরবন নষ্ট করে বিদ্যুৎ উত্পাদনের পেছনে যুক্তি থাকতে পারে না। বিশেষ করে, যখন পরিবেশ দূষিত না করে বিকল্প বিদ্যুৎ উত্পাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন—বায়ুচালিত বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ, জলস্রোত থেকে উদ্ভূত বিদ্যুৎ এমনকি বর্জ্য পদার্থ থেকে বিদ্যুৎ উত্পাদন। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের গবেষকরা এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট আগ্রহী, যা বিবেচনার দাবি রাখে।

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের নেতিবাচক দিকটাই প্রধান গুরুত্ব নিয়ে উঠে এসেছে। তাই স্বদেশি স্বার্থের বিবেচনায় সরকারের রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তা যুক্তিসম্মত বলে আমাদের মনে হয়। অর্থাৎ বিকল্প পদ্ধতির বিদ্যুৎ উত্পাদন নিয়ে ভাবনা দরকার, যাতে অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের সুযোগও রয়েছে। সুন্দরবনবিনাশী রামপাল প্রকল্পে তাই ইতিটানা উচিত।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য