আওয়ামী লীগের কাউন্সিল এবং তৃণমূলের-333793 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


আওয়ামী লীগের কাউন্সিল এবং তৃণমূলের প্রত্যাশা

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আওয়ামী লীগের কাউন্সিল এবং তৃণমূলের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বৃহত্তম অর্থনীতির ধারক হতে চলেছে। মানব উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ সমমানের অনেক দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার প্রত্যয় রয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘রূপকল্প-২০২১’ এখন হাতছানি দিচ্ছে। পদ্মা সেতুর মতো স্বপ্ন এখন বাস্তব। আন্তর্জাতিক জরিপে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার পরিমাপ অনেক বেড়েছে। এসব অর্জনের বেশির ভাগই এসেছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে।

সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি দল তথা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও বেড়েই চলেছে। দলের কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। সংগত কারণেই আওয়ামী লীগের এবারের আসন্ন কাউন্সিলটির প্রতি তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশাও একটু আলাদা। আগামী ২৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যেই জাতীয় সম্মেলনের পূর্ণ প্রস্তুতির কর্মকাণ্ডে কিছুটা বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় কাউন্সিল দু-তিন সপ্তাহ পিছিয়ে যেতে পারে (দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এরই মধ্যে কাউন্সিলকে ঘিরে শুরু হয়েছে অনেক জল্পনা-কল্পনা। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, এবার কে হচ্ছেন দলের সাধারণ সম্পাদক। কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সামনে রেখে এরই মধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়া জেলা কমিটির কাউন্সিল শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সময়োপযোগী কর্মসূচি প্রণয়ন করলে রাজনৈতিক দলে গতিশীলতা আসে। সেই সূত্র ধরে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তোড়জোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। সংগত কারণেই সরকারি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দলীয় কর্মকাণ্ডেও গতিশীলতা আনতে এই কাউন্সিলটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে। দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বেশির ভাগেরই মন্ত্রিসভায় জায়গা হওয়ায় দলের সাংগঠনিক দিকটিতে কিছুটা স্থবিরতা আসে। তবে বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভা ও দলীয় কার্যক্রম কিছুটা আলাদা রেখে আওয়ামী লীগ সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এতে সাংগঠনিক দিক খেয়াল রাখার জন্য আলাদা টিম কাজ করছে। ফলে সাংগঠনিক দিকটাও যথেষ্ট মজবুত রয়েছে।

দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ একটি করে এবং এই পদ দুটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না পাওয়ায় এ বিষয়ে পদ নির্বাচনে চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। তবে সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা ও চিন্তার সুযোগ রয়েছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য নানাবিধ নির্দেশক বিশেষ করে রাজনৈতিক যোগ্যতা, দক্ষতা, অবদান, ব্যক্তিগত ইমেজ, কাজকর্মে স্বচ্ছতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের সমন্বয়। এগুলোর কোনোটি না থাকলে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়া কঠিন হয়। তবে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের আশীর্বাদপুষ্ট হতে পারলে উল্লিখিত নির্দেশকের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া যায়। আশা করছি এবারের কাউন্সিলে তেমনটি হবে না। উল্লিখিত নির্দেশনার বাইরে থাকলে নতুন পদ পাওয়া তো দূরের কথা, যাঁরা পদে আছেন তাঁদেরও ছিটকে যাওয়ার বিষয়টিই প্রাধান্য পাওয়া উচিত।

টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের যেসব নেতা সংগঠন ও কর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন অথবা এখনো আছেন, তাঁদের প্রেসিডিয়াম ও সম্পাদকমণ্ডলী থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।  কাজেই পুরনোরা কৃতকর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ছিটকে যাবেন আর নতুনরাও তাঁদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন—এমনটিই সবার প্রত্যাশা।

এবারের কাউন্সিলে নতুন কোনো চমক থাকবে কি না সে বিষয়ে সবারই বিশেষ ভাবনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসুক এটাও সচেতন সমাজের প্রত্যাশা। জাতীয় চার নেতার অন্যতম তাজউদ্দীনের পুত্র সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসুক এমনটিও তৃণমূলের রাজনীতিসচেতন আওয়ামী লীগকর্মীদের প্রত্যাশা। এ ছাড়া কিছু দিন থেকে রাজশাহী মহানগরের পার্টি অফিসে একটি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে রাজশাহী থেকে কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসার সম্ভাবনা রয়েছে জাতীয় চার নেতার অন্যতম এ এইচ এম কামরুজ্জামানের পুত্র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ না করলেই নয় যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দীর্ঘদিন রাজশাহীবাসীর কোনো প্রিয় নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে পারেননি। উত্তরবঙ্গের প্রাণপ্রিয় নেতা নওগাঁর আব্দুল জলিলের পর এ পর্যন্ত এ অঞ্চলের কোনো নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যায়নি। হয়তো বা দলের হাইকমান্ড উপরোক্ত কোনো নির্দেশকের আওতায় কাউকে না পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে আওয়ামীবিরোধী একটি প্রতিকূল অবস্থা বিদ্যমান ছিল। ওইসব প্রতিকূল অবস্থাকে মোকাবিলা করে আওয়মী লীগ এখন অনেকটা এগিয়ে। বিশেষ করে জাতীয় চার নেতার অন্যতম এক নেতার বাড়ি রাজশাহী হওয়ায় এই জেলার দিকে সবারই আলাদা দৃষ্টি রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এ এইচ এম কামরুজ্জমানের সন্তান ও নেতৃত্বের গুণ বিবেচনায় জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি রয়েছে যথেষ্ট। এক যুগ ধরে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে প্রথমবারের মতো দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর অনুষ্ঠিত সব কাউন্সিলে তাঁর এই পদটি অপরিবর্তিত রয়েছে। খায়রুজ্জামান যতটা না উত্তরাধিকার সূত্রে, তার চেয়েও বেশি নিজের দক্ষতা, চেষ্টা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে এ পর্যায়ে এসেছেন বলে নেতাকর্মীরা মনে করেন। এ কারণে রাজশাহীবাসী মনে করে, নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সংস্পর্শের প্রয়োজন রয়েছে।

আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ দল হিসেবে আরো অনেক বেশি সংবেদনশীল, দায়িত্ববান ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। দলের ভেতর থেকেই পরিবর্তন আসা জরুরি। বর্তমান সরকারের বাকি অবশিষ্ট প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংগঠনকে সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে আওয়ামী লীগের আসন্ন কাউন্সিলে নেতৃত্ব নির্বাচনে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। এতে দলের জন্য নিবেদিত, ত্যাগী ও দুর্নীতিমুক্ত এমন নেতাদের নতুন কমিটিতে স্থান দিলে দল অধিক শক্তিশালী হবে।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com

মন্তব্য