kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রচারেই প্রসার দল এখন ঠুঁটো জগন্নাথ

রবার্ট জে স্যামুয়েলসন

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রচারেই প্রসার দল এখন ঠুঁটো জগন্নাথ

ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার পথটি পাড়ি দিচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টিই ধরা পড়ে।

প্রেসিডেন্ট হতে চান (কিংবা সিনেটর, বা হাউস মেম্বার)? কোনো দলের অনুমতি লাগবে না। ঘোষণা দিয়ে নেমে পড়ুন প্রচারে, গণসংযোগে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, নথি বা কোথাও আইনের লঙ্ঘন যেন না ঘটে। আপনি একজন পলিটিক্যাল এন্টারপ্রেনার তথা রাজনৈতিক উদ্যোক্তা। আপনাকে সহায়তা দিতে গজিয়েছে প্রচার উপদেষ্টা, ডিজিটাল বিশেষজ্ঞ, পেটোয়া গণমাধ্যম, তহবিল সংগ্রাহক ও ভোটারদের ডাইরেক্ট মেইল প্রেরণকারীর মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিশাল এক বিকাশমান শিল্প। ২০১২ সালে এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান ছিল এক হাজার ৭৬৫। আর এ খাতে মোট ব্যয় হয় ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার। লিখেছেন জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞানী অ্যাডাম শেইনগেট তাঁর নতুন গ্রন্থ ‘বিল্ডিং এ বিজনেস অব পলিটিকসে’।

১৯৯১ সালেও রাজনৈতিক লেখক অ্যালান এহরেনহল্ট ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব অ্যামবিশন’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘আমাদের এই রাজনৈতিক নেতাদের আসলে কে পাঠিয়েছে? উত্তরটি সোজা। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের প্রেরক। ’ আসলে এই খেলাটি প্রায় সবাই খেলতে পারেন। এবারকার প্রচারণায় রিপাবলিকানদের রয়েছে অন্তত জনা ১৭ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী, ডেমোক্র্যাটরাও দৌড়ে পিছিয়ে নেই। বিষয়টি এমনই গা-সওয়া হয়ে গেছে, আমরা নিজেরাও খুব কমই এ নিয়ে প্রশ্ন করি। অথচ রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণের এই উত্থান, যেখানে আপনি জিতবেন কি হারবেন তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে আপনার ওপর, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ সময় ও ষাটের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত মার্কিন রাজনীতির পদবিধারীদের রাজনৈতিক দলের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। দলের নেতারা, অর্থাৎ তথাকথিত ‘বস’ ও তাঁদের রাজনৈতিক ‘মেশিনারিজ’ গোটা প্রক্রিয়াটি নিজেদের বশে রেখেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দল নেতাদের মধ্য থেকে পছন্দের মুখ বাছাই করে ভোটারদের বলে দিয়েছে, এই আপনার দলের প্রার্থী, ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন। আর প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বেলায় দলীয় সম্মেলনে বাছাইয়ের কাজ হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এখনকার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে পৃথকভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের পরীক্ষা দিতে হতো না। এর শুরু অরিগনে, ১৯১০ সালে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ডেভিড ক্যারল বলেন, এমনকি বিগত ষাটের দশকেও রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক নেতারা প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতেন। ক্যারল লেখেন, অনেক অঙ্গরাজ্যের দলীয় প্রতিনিধিরা তাঁদের দরকষাকষির ক্ষমতাটি জোরালো করার জন্য প্রিয় স্বজনদের পক্ষে অঙ্গীকার ব্যক্ত করতেন কিংবা বিশ্বাসঘাতী হতেন। একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া পর্যন্ত দলে বোঝাপড়া চলত। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন মনোনয়ন পান তৃতীয়বারের ব্যালটে। ১৯৩২ সালে ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট দলের টিকিট লাভ করেন চতুর্থ ব্যালটে। এই ব্যবস্থা আজও সচল থাকলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো ভূমিকা পালনেরই সুযোগ থাকত না। কারণ তিনি কোনো নির্বাচিত পদে নেই। তিনি কোনো ওয়ার হিরো তথা বীরযোদ্ধা নন (হোয়াইট হাউস অনেক সময় এই গুণটি দেখে)। রাজনৈতিক পাওয়ার ব্রোকারদের সঙ্গেও তার যোগসাজশ নেই। আর নতুন ব্যবস্থায় এসে দলের পাওয়ার ব্রোকারদের সেই ক্ষমতাও নেই।

নানা চাপেই প্রার্থী মনোনয়নে দলীয় আধিপত্য মুখথুবড়ে পড়ছে। রেডিও ও টেলিভিশন প্রার্থীদের ভোটারদের কাছে পৌঁছার নতুন নতুন পথ করে দিয়েছে। বেশি মাত্রায় শহুরে হয়ে পড়ায় অনেক অঞ্চলে নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয়ের প্রভাব কমে গেছে। ক্যাম্পেইন পোলিংব্যবস্থা রাজনৈতিক তথ্য যেমন হাতের নাগালে নিয়ে গেছে, বেড়েছে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বসদের প্রতি শত্রুতা। ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় আঘাতটি হানে ১৯৬৮ সালের নির্বাচনের পর। তারা বিধি তৈরি করে অঙ্গরাজ্যগুলোতে দলকে অবশ্যই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য প্রাইমারি অথবা উন্মুক্ত ককাসের আয়োজন করতে হবে, যাতে দলের নেতারা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দিয়ে মনোনয়ন করতে পারেন। অনুরূপ ‘সংস্কার’ করে রিপাবলিকানরাও। নতুন ব্যবস্থাটি পুরনোটির তুলনায় যদিও বেশি গণতান্ত্রিক, সেই তুলনায় ভালো ফল এ থেকে আসেনি। দলের নেতাদের প্রভাব খাটো করে প্রচারের দক্ষতাকেই বড় করে দেখা হলো। নেতৃত্ব বা শাসন করার যোগ্যতাটি হয়ে পড়ে গৌণ। কার্টার ও ওবামার মতো নেতারা যে প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছেন তা এমন ব্যবস্থার কল্যাণেই। ফলে পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউসে তাঁদের মতো প্রেসিডেন্টকে হিমশিম খেতে দেখা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজা-উজির মারার নির্বাচনী প্রচার এ ব্যবস্থার এক চরম উদাহরণ। আসলে উদ্যোক্তাসুলভ (এন্টারপ্রিনেরিয়াল) রাজনীতি বিতর্কের মান যেমন বাড়ায়নি, প্রার্থীদের উত্কর্ষ বৃদ্ধিতেও কোনো ভূমিকা রাখেনি। আমেরিকায় আমরা দলনির্ভর রাজনীতি ছেড়ে ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছি। ভাবমূর্তি ও আদর্শকে এখন আগের চেয়ে বড় করে দেখা হয়। কারণ প্রার্থীরা প্রশাসনের সব স্তরে তাঁদের প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজেদের আলাদা করে দেখানোর চেষ্টা করেন। আর এই প্রতিপক্ষ অন্য দলে তো বটেই, নিজেদের দলেও থাকেন। আমাদের রাজনীতিবিদরা ক্রমেই ফ্রিল্যান্সার হয়ে উঠছেন। ব্যক্তিগত কঠোর পরিশ্রম, রাজনৈতিক ধূর্ততা, তহবিল গঠনের সক্ষমতা ও গণসংযোগের দক্ষতার ওপরই তাঁদের বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। যেহেতু প্রার্থী নিজেই নিজের জয় বা পরাজয় নির্ধারণ করছেন, তাই নির্বাচনী প্রচারণা হয়ে উঠেছে খণ্ডকালীন নয়, এক পূর্ণ সময়ের কাজ। প্রচারণার স্বার্থে অবাস্তব, ভিত্তিহীন অঙ্গীকারও তাদের করতে হচ্ছে। এর ফলে দলীয় শৃঙ্খলা যেমন ভেঙে পড়ছে, ভোটারদেরও আশাবাদী করে সে আশা হত্যা করা হচ্ছে। এখন মনোনয়ন প্রক্রিয়াটিকে আগের মতো আরো রুদ্ধদ্বার করা ও ক্ষমতা হারানো দলীয় এলিটদের বড় ভূমিকা দেওয়াটিও সহজ নয়। কারণ এর পক্ষে জনমত আছে খুব কমই। জনমতই শুধু নয়, প্রযুক্তির ব্যবহারও বদলে গেছে অনেক। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা নিয়ে আপনার এই যে দ্বিধা ও হতাশা, তার মধ্য থেকে আপনি ভাবতেই পারেন, ‘আমাদের পুরনো দিনের বসরা আসলেই কি অত খারাপ ছিল?’

লেখক : ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট। প্রবীণ এই সাংবাদিক ১৯৮৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নিউজউইকে কলাম লিখেছেন।

ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস


মন্তব্য