kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চ্যালেঞ্জ ও স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ

ইকরামউজ্জমান

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চ্যালেঞ্জ ও স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ

টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেছে বাংলাদেশ দল। টিম বাংলাদেশ জাতির জন্য খেলেছে রোমাঞ্চকর, আশাজাগানিয়া ও গর্বের ক্রিকেট।

খেলোয়াড়রা মনের মধ্যে যে বিশ্বাস ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি পোষণ করেছেন, খেলার মাঠে তা প্রতিফলিত করাতেই সম্ভব হয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা করা। ক্রিকেট বিশ্ব জেনেছে, উপমহাদেশ থেকে বাংলাদেশও টি-টোয়েন্টি জগতে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। অচিরেই ভালো দল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ! ওয়ানডে ক্রিকেটের মতো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও বাংলাদেশকে সমীহ করতে হবে, সে দিন বেশি দূরে নয়। ছোট ক্রিকেটে বাংলাদেশ ছোট দল—এই ধারণা পাল্টাবে।

অভিজ্ঞ আর তরুণ ক্রিকেটারদের সংমিশ্রণে গঠিত দলের লক্ষ্য ছিল সবাই মিলে একটি দল হিসেবে, একটি ইউনিট হিসেবে সঠিক মানসিকতায় চাপকে সামলে নিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের সেরা খেলাটা খেলার চেষ্টা করবেন ‘গেম প্ল্যান’ অনুযায়ী। সেই খেলা বাস্তবে খেলে ক্রিকেটাররা হাতেনাতে ফল পেয়েছেন। ক্রিকেটারদের ইতিবাচক মানসিকতা ও দৃঢ় মনোবল তাঁদের অসাধ্য সাধনে অনুপ্রাণিত করেছে। জাতিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উপহার দিয়েছেন ক্রিকেটাররা টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপে। বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলবে—এ ধরনের প্রত্যাশা ক্রিকেট অনুরাগীরা করেননি। তাঁরা চেয়েছেন, টিম বাংলাদেশ ভালো ক্রিকেট উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবে দলগত নৈপুণ্যের মাধ্যমে। কারণটা হলো, টি-টোয়েন্টি ‘ফরম্যাটে’ তো বাংলাদেশ দল পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। এদিকে কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্ট ক্রিকেটারদের নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। যে কাজগুলো আগে কখনো করা হয়নি, সেগুলো করা হয়েছে বলেই বিশ্বাস করেছে, বাংলাদেশ দল এবার এমন কিছু করবে যা আগে করেনি। টিম ম্যানেজমেন্টের এই বিশ্বাসকে খেলোয়াড়রা শ্রদ্ধা করে অসাধারণ ক্রিকেট খেলেছেন। কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে এবং তাঁর ‘সাপোর্ট স্টাফরা’ ক্রিকেটারদের ভেতরের বারুদ জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। পাল্টে ফেলেছেন ক্রিকেটের প্রেক্ষাপট। দেশে ক্রিকেটের আবেদন আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।

গতবারের (২০১৪) টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা ও ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে পরপর দুটি খেলায় পরাজিত করে ফাইনালে বাংলাদেশ খেলেছে ভারতের বিপক্ষে। বীরের মতো লড়ে পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশ কিন্তু এখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এশিয়ায় দুই নম্বরে। এত বড় সাফল্যের স্বাদ তো আমাদের ক্রিকেট আগে কখনো পায়নি। অসাধারণ এই দলগত পারফরম্যান্স ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, যা কাজে লাগবে চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে। ‘হার্ড হিটার’ নেই তাতে কি, ‘স্কিল’ তো আছে।

আমরা অনুভব করছি ক্রিকেটে পরিবর্তনের হাওয়া। ওয়ানডে ক্রিকেটের পর এখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পালে বাতাস লেগেছে। এবার        টি-টোয়েন্টির ছোট্ট জাহাজটি বন্দরের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ উন্নতি করবে।

এখন আফসোস হচ্ছে ভেবে, সেই ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পরাজিত করে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল। এরপর আর এই সাফল্য ও সম্ভাবনা নিয়ে ভাবা হয়নি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দেরিতে হলেও যে ধরনের কাজ করা উচিত ছিল, তা এবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে করা হয়েছে। এশিয়া কাপে তার ফল আমরা পেয়েছি। আশা করছি, ভারতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টিতেও পাব। ভারতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের পর যদি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে (চার বছর মেয়াদি) টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিয়েও কাজ করা হয়, তাহলে আমরা অবশ্যই স্বপ্নের বন্দরে পৌঁছতে পারব।

বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপ শুরুর আগেই বলেছেন, মানসিক দিক থেকে আমরা ইতিবাচক ও শক্তিশালী। প্রস্তুতি পর্বে আমরা যেভাবে কাজ করেছি, কাকে কিভাবে খেলতে হবে, দায়িত্ব পালন করতে হবে, মাঠের পরিস্থিতি কিভাবে সবাই মিলে সামাল দিতে হবে, লড়াইয়ের মাঠে যদি তার যথাযথ প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে দলের পক্ষে অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব। সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেকে মেলে ধরতে হবে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দারুণ একঝাঁক ‘পেসার’ এখন দলে আছেন। এঁরা ছন্দে আছেন, দলের জন্য কিছু করে দেখানোর সামর্থ্য এঁদের আছে। দলের বিজয়ে এঁরা অবদান রাখছেন। লম্বা সময় ধরে ‘স্পিন’-নির্ভর দল বাংলাদেশকে এখন পেসাররা ম্যাচ জেতাচ্ছেন একটির পর একটি। এটা বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে এবং পরে অনেক বড় আশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এককভাবে কারো ওপর নির্ভর করছে না। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বাসী। মাঠে দেখছি, শূন্যতাগুলো ঠিকই সবাই মিলে পূরণ করছেন। খেলোয়াড়রা বুঝতে পারছেন তাঁদের সামর্থ্য আর অবস্থান। এক বছরের বেশি সময় ধরে সাফল্যটা আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। বাড়িয়ে দিয়েছে সাহস। বদলে গেছে ‘মাইন্ড সেট’। আর এটাই কিন্তু মাঠের খেলায় পার্থক্য গড়ে দেয়।

আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে এখন সবচেয়ে ভালো সময় পার হচ্ছে। একটা নিটোল দল মাঠে লড়ছে, যেখানে লক্ষণীয় হচ্ছে অভিজ্ঞ আর তারুণ্যের চমত্কার সমন্বয়। দলটি যে অবস্থায় আছে, সেখানে খুব বেশি নাড়াচাড়া করার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে করা হবে। নতুন করে দল ‘পুনর্গঠনের’ কাজ করতে হবে আরো পাঁচ-ছয় বছর পর। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট আরো অনেক এগিয়ে যাবে। ক্রিকেট বিশ্ব দেখবে বাংলাদেশের নজরকাড়া সাফল্য।

দুই.

‘আমাদের পক্ষে পারা খুবই সম্ভব’—এই আত্মবিশ্বাস, চ্যালেঞ্জ আর স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ ভারতে অনুষ্ঠেয় ষষ্ঠ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে গেছে। ‘চ্যালেঞ্জ’-এর জন্যই বলছি, বাংলাদেশকে তো প্রাথমিক পর্বে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সুপার টেন। অর্থাৎ মূল পর্বে খেলতে হবে। বাছাই পর্বে ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গে আছে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড এবং ওমান। বাংলাদেশের প্রথম খেলা ৯ মার্চ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ধর্মশালায় (হিমাচল প্রদেশ)। এর পরের দুটি ম্যাচ যথাক্রমে ১১ ও ১৩ মার্চ আয়ারল্যান্ড ও ওমানের বিপক্ষে। আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ দল এখন পুরোপুরি খেলার ছন্দে আছে। এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে ভালো খেলা তাদের বিশ্বাস আরো মজবুত করেছে। এ অবস্থায় আইসিসি সহযোগী দেশগুলোকে পরাজিত করে (ধর্মশালার কন্ডিশন পুরোপুরি ভিন্ন) গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূল পর্বে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে মাথায় রাখতে হচ্ছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের চরম অনিশ্চয়তা। অঘটন, চমক, অবিশ্বাস্য ফলাফল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আকর্ষণ আর সৌন্দর্য। তাই আগাম কিছু বলা যাবে না, আশা করা যাবে না। মাঠের খেলায় কোন দল কিভাবে খেলে, সম্মিলিতভাবে ঝলসে ওঠে প্রতিটি বিভাগে—এটাই গুরুত্বপূর্ণ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এত গতিশীল যে অল্প সময়ে স্বাধীনভাবে নিজেকে মেলে ধরতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই ক্রিকেটে দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। সেটির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়। যারা এসব ভালো করতে পারে তারাই সফল হয়। বাংলাদেশ দল তখনই ভালো করবে যখন সবাই মিলে ভালো করবে।

বাংলাদেশ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে মূল পর্বে ‘বি’ গ্রুপে খেলবে ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। গ্রুপটি শক্তিশালী। বাংলাদেশের লক্ষ্য ও স্বপ্ন পরিষ্কার—সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘ম্যাচ টু ম্যাচ’ ভালো খেলা। বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ী হওয়ার জন্য ‘গেম প্ল্যান’ অনুযায়ী সম্মিলিতভাবে লড়াই করা। প্রথম ছয় ওভার এবং শেষের দিকে ১৩ থেকে ১৬ ওভার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টি-টোয়েন্টিতে বলে বলে, ওভারে ওভারে খেলার রং পাল্টায়। ক্রিকেটে সবচেয়ে কঠিন ‘ফরম্যাট’ হলো টি-টোয়েন্টি। কখনো হিসাবের বাইরে যাওয়া যাবে না। মাঠে কোনো বিভাগে স্থিতিশীলতার সুযোগ নেই। একবার ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়লে আবার ফেরা কঠিন। আমরা মনে করি, চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘অর্জন’ বৃদ্ধির একটি সুযোগ। বাংলাদেশ দলের টিম ‘কম্বিনেশন’ চমত্কার। ক্রিকেট সম্পদের সর্বোচ্চ যথাযথ ব্যবহার। বোলিং ও ফিল্ডিং শক্তিশালী। মুস্তাফিজ সম্ভবত মূল পর্বে খেলতে পারবেন। ব্যাটিং নিয়ে চিন্তা আছে। এখনো ছন্দে ফিরতে পারেননি মুশফিক ও সাকিব। আশা করা যাচ্ছে, তাঁরা চলতি টুর্নামেন্টে ‘ছন্দ’ ফিরে পাবেন। শুধু টপ অর্ডার নয়, মিডল ও লোয়ার অর্ডারকে অবদান রাখতে হবে। ব্যাটিংয়ে ‘ফিনিশারের’ একটা বড় দায়িত্ব আছে।  

প্রায় মাসব্যাপী প্রতিযোগিতা। ৩৫টি ম্যাচ। খেলা হবে সাতটি ভেন্যুতে। দীর্ঘ সময়ের এই প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লম্বা সময় ধরে শতভাগ ‘ফিটনেসের’ সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা।

গত পাঁচবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে উপমহাদেশের দলগুলোর জয়জয়কার। ট্রফি জিতেছে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। এর বাইরে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড কখনো ট্রফি জেতেনি। অস্ট্রেলিয়া ২০১০ সালে ফাইনাল খেলেছে। তবে সাউথ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড এ পর্যন্ত ফাইনালে উঠতে পারেনি। খেলা হবে ভারতের মাটিতে। টি-টোয়েন্টি ‘র্যাংকিংয়ে’ ভারত এক নম্বর। দুর্দান্ত ফর্মে আছে। নিজস্ব ‘কন্ডিশনে’ খেলবে। উপমহাদেশে কি আবার শেষ পর্যন্ত ট্রফি থেকে যাচ্ছে, না নতুন কোনো দেশের অধিনায়কের হাতে দেখা যাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ট্রফি? এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


মন্তব্য