‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির-333339 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


কালান্তরের কড়চা

‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর গড়ে উঠছে’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর গড়ে উঠছে’

কালের কণ্ঠে আমার আজকের লেখার হেডিং দেখে সুধী পাঠক যেন মনে না করেন, মন্তব্যটি আমার। এই মন্তব্য ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাত্কারে ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে এবং শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে।’ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটছে এবং বহির্বিশ্বে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ প্রশংসিত হচ্ছে।

দুটি মন্তব্যই বাংলাদেশ ও হাসিনা নেতৃত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক। এই মন্তব্যের সঙ্গে সবাই শতভাগ সহমত পোষণ করবেন, এমন কথা বলি না। কিন্তু এই মন্তব্য বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দৃঢ়মূল হতে সাহায্য করবে। হাসিনা নেতৃত্বেরও একটা বাস্তব মূল্যায়ন তাতে ঘটেছে। এ কথা সত্য, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দেশ ভারতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকায় সারা উপমহাদেশেই তা গণতন্ত্রের জন্য একটা ছাতার মতো কাজ করছে। এই ছাতা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকেও ছায়া প্রদান করেছে, তার মুক্তিসংগ্রামকে সহায়তা জুগিয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকে থাকার জন্যও গণতান্ত্রিক ভারতের মৈত্রী ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের রাষ্ট্রপতির মন্তব্য কিছুটা উচ্ছ্বাসপূর্ণ হলেও এই মন্তব্যে এই মৈত্রী ও সহযোগিতার কথাটিই উচ্চারিত হয়েছে। ধরে নেওয়া যাক, ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের দীর্ঘকালের বন্ধু। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামেও তাঁর ছিল শক্তিশালী সহায়কের ভূমিকা। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর পরিবার, বিশেষ করে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সেই পঁচাত্তর সালের ট্র্যাজেডির পর থেকেই। সুতরাং তাঁর মুখে হাসিনা নেতৃত্ব ও বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রশংসা অনেকে একটা প্রথাসিদ্ধ ব্যাপার মনে করতে পারেন। কিন্তু এই প্রশংসা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মুখেও এখন শোনা যাচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসেছিলেন বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তাঁর নেতৃত্বের এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিজেপি নেতার এই প্রশংসা থেকেও মনে হয়, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্ত এবং উন্নত। রাম মাধব স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার ফলে দেশটিতে উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।’

প্রণব বাবু ও রাম মাধব—ভারতের এই দুই শীর্ষ নেতার মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, উপমহাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দিল্লি এখন বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধি থেকে দুটি দেশ যদি গঙ্গার পানি, স্থলসীমান্ত সমস্যার মতো তিস্তাসহ অন্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানেও দ্রুত এগিয়ে যায়, তাহলে গোটা উপমহাদেশেই শান্তি ও সমৃদ্ধির এক নবযুগের সূচনা হবে।

এ সম্পর্কে ভারতের রাষ্ট্রপতি নিজেও বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ায় তিনি আনন্দিত। রাষ্ট্রপতির মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। তাই তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলে তিনি এই চুক্তি করতে পেরেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি এ প্রসঙ্গে তিস্তার পানি সমস্যার কথাটি তোলেননি। এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের একটা আশ্বাস তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেলে ভালো হতো। বিজেপি নেতা রাম মাধবও তাঁর ঢাকা সফরকালে এ সম্পর্কে কিছু বলেননি।

তবে সমস্যাটির কথা উঠেছে গত শনিবার (৫ মার্চ) ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সংলাপের একটি কর্ম অধিবেশনে। তাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী বলেছেন, ‘তিস্তা চুক্তিবিষয়ক বলটি এখন ভারতের কোর্টে। এই চুক্তি নিয়ে এরই মধ্যে একটা খসড়া তৈরি হয়েছে। তাই এটা নিয়ে নতুন করে কোনো আলোচনা হবে না। তবে চুক্তিটি শিগগির সই হওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’

২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি ঝুলে আছে। ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চুক্তিটি সই হওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধাদানের কারণে তা আর হয়নি। পরবর্তীকালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশ্বাস দিয়েছিলেন, দুই দেশের ভেতরের অন্য সমস্যাগুলোরও শিগগিরই সমাধান হবে। কিন্তু তা হয়নি। কোনো কোনো জটিল সমস্যা এখনো ঝুলে আছে।

সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এখন অনেক কমেছে কিন্তু বন্ধ হয়নি। এ কথা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শ্রিপ্রিয়া রঙ্গনাথনও স্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।’ বাংলাদেশের মতে, এই সমাধানের উদ্যোগ খুবই গতিহীন। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সংলাপের সেমিনারে আরো একটি সমস্যার কথা তুলেছেন এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ। তিনি বলেছেন, একসময় পাঁচ বছরের জন্য সার্ক ভিসা দেওয়া হতো। ভারত তা কমিয়ে এখন তিন মাস করেছে। এই তিন মাসের জন্য ভিসা নেওয়াটা পাসপোর্টের পাতা নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁর মতে, বিবিআইএন ভিসা চালু করা উচিত।

সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা থাকলে কোনো সমস্যাই জটিল হয়ে উঠতে পারে না। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বিজেপির সাধারণ সম্পাদকের সাম্প্রতিক মন্তব্যে উচ্ছ্বাস থাকলেও তাতে আন্তরিকতার ছাপটি সুস্পষ্ট। ঢাকা সেমিনারের ঢাকা ঘোষণায় দুই দেশের সম্পর্ক পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রগতিবিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রগতিবিরোধী শক্তি দুই দেশেই গণতন্ত্রেরও শত্রু। এই শত্রুকে মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের গণতান্ত্রিক ঐক্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে বাংলাদেশ ও ভারতের মৈত্রী ও সহযোগিতার প্রকৃত ভিত্তি হচ্ছে দুই দেশেই বিরাজমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন বিপদমুক্ত এবং সব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে—এমন কথা আমি বলব না। তবে শেখ হাসিনার শক্ত নেতৃত্বে এই গণতন্ত্র সব প্রতিকূলতার মধ্যেও একটা শক্ত ভিত্তি পেতে যাচ্ছে। এই শক্ত ভিত্তির স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা। ভারতে যদি গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং তার অর্ধশতকেরও বেশি সময়ের শক্ত ভিত্তির ওপর ক্রমাগত আঘাত হানতে দেওয়া হয়, তাহলে গোটা উপমহাদেশেই গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হবে।

বাংলাদেশে যেমন উগ্র মৌলবাদ ধর্মান্ধতার আবরণে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে, তেমনি ভারতেও অধুনা উগ্র হিন্দুত্ববাদ একটি সহিষ্ণু ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে আঘাত হানতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রনাথ মোদির কার্যকলাপ দেখে মনে হয়, তিনি সাবেক বিজেপি সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির মধ্যপন্থা অনুসরণ করে ভারতের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ট্র্যাডিশন রক্ষা করে চলতে চান। কিন্তু দল ও সরকারের ওপর আরএসএস, শিবসেনা ইত্যাদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী উপদলের উপদ্রব তিনি কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। তার প্রমাণ সম্প্রতি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুচ্ছ অজুহাতে ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তার, পুলিশের নিষ্ক্রিয় উপস্থিতিতে কোর্টের ভেতরে গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রনেতাদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলা; গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে এক মুসলমানকে হত্যা, ধর্মান্তরকরণের জন্য দলিত, মুসলমান ও খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুত্ববাদ ঢোকানো; মুসলমান রাজা-বাদশাহর নামাঙ্কিত শহর ও রাস্তার নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ ইত্যাদি অসংখ্য কর্মকাণ্ড।

প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং তাঁর সরকারের সামনে তাই বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। তিনি যে বিশাল ব্যক্তি-জনপ্রিয়তা নিয়ে নির্বাচনে জিতে দিল্লিতে ক্ষমতায় বসেছেন, সেই জনপ্রিয়তা ও ক্যারিশমার প্রভাব খাটিয়ে তিনি কি পারবেন ভারতে হিন্দুত্ববাদের বর্তমান জোয়ার ঠেকিয়ে ভারতের ঐতিহ্যবাহী গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষা করতে? যদি তিনি পারেন, তাহলে সারা উপমহাদেশেই তা গণতন্ত্রের জন্য নতুন যুগের সূচনা করবে। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও গণতন্ত্র স্থিতিশীলতা পাবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র যে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে যাচ্ছে তা স্থায়িত্ব পাবে। বাংলাদেশ ও ভারতের গণতান্ত্রিক মৈত্রী ও সহযোগিতার প্রভাব উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও গণতন্ত্রের ভিত পাকা করবে। ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি মজবুত মৈত্রীর সেতু গড়ে উঠুক, এটা এখন তাই দুই দেশের গণতন্ত্রপ্রিয়, শান্তিকামী সব মানুষের কাম্য।

লন্ডন, সোমবার, ৭ মার্চ ২০১৬

মন্তব্য