kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জঙ্গিবাদ ও আমার দেখা বাংলাদেশ

জোসেলিন গ্রান্ডিনেটি

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গিবাদ ও আমার দেখা বাংলাদেশ

নদীটির এ দিকটায় বাংলাদেশের গ্রামগুলো যেন মেঠোপথ, দারিদ্র্য আর মানুষ মিলিয়ে ছবির এক বিশাল ক্যানভাস। বাড়িগুলো মাটির তৈরি, ছাউনি টিনের।

লোকজনকে দেখছি, তারা খালি পায়ে পথ চলছে। চোখ-মুখ তাদের বিবর্ণ, ধুলাবালিমাখা। আমার চেয়েও কম বয়সী ছেলেরা বড়দের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে সিমেন্টে জলাধার গড়ছিল। দারিদ্র্যে-অপুষ্টিতে কম বয়সেই কাবু হয়ে পড়া বড়দের দেখাচ্ছিল যেন তারা সব দাদার বয়সী। তারা পানি ধারণের যে আধারটি গড়ছিল সেটি তাদের বিশুদ্ধ পানির শেষ ভরসা।

বড় সড়ক থেকে নামার পর থেকেই সুখের কোনো দৃশ্য যেন চোখে পড়ছিল না। তবু পথ চলছি। আমাদের অর্থে গঠিত তহবিলের পয়সায় জলাধার তৈরি হচ্ছে। এর অগ্রগতি দেখতে হবে। ধুলোময় চেহারা ঘুরিয়ে ওরাও দেখছিল আমাদের। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ভিন্ন রঙ্গ, ভিন্ন দেশ আর ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ। দোভাষীর সহায়তায় আমার বাবা কথা বলছিলেন তাদের সঙ্গে।

চারপাশে দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশা। আমি যখন এসব দেখছি বিনিময়ে তারা আমাদের গা ছুঁয়ে আশীর্বাদ দিল। হাসল। সমীহ ও শ্রদ্ধা মেশানো সে হাসি। আমেরিকায় আমাদের মাঝারি মানের জীবন। কিন্তু তাদের চোখে আমরা যেন রাজারাজড়া। তাদের গায়ের রং বড় হালকা, চুল অতিসাধারণ, চোখের ভাষাও বড় সরল। নিজেদের এত দুর্দশার মধ্যেও তারা হাসছিল, যেন আমাদের সহায়তা পেয়ে কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছিল। নিজেদের সব অসম্পূর্ণতার  মধ্যেও তাদের চোখ-মুখ ছিল হাস্যোজ্জ্বল। একজন নারী, তার গায়ের রং কালো, চেহারা জীর্ণ। আমাকে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ভালো করুন’ (মে আল্লাহ ব্লেস ইউ অল)। আমরা তাদের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে গেছি এবং আমি তাদের বলেছিও সে কথা। কৃতজ্ঞতা হিসেবে তারা প্রার্থনা করল আল্লাহর নামে। ইসলামে আল্লাহই হচ্ছেন মানুষের স্রষ্টা।

বাংলাদেশ প্রধানত একটি মুসলিম দেশ। এমন দেশে মুসলমানবেষ্টিত হয়ে পশ্চিমা হিসেবে আমরা কি নিরাপদ বোধ করতে পারি? ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর থেকেই তো আমাদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে মুসলমান মানেই বিপজ্জনক কিছু। কাছে গেছ তো সাবধান থেকো।

ইসলামী জঙ্গিবাদ ধারণা মাত্র নয়, এর অস্তিত্ব আছে, অস্বীকার করছি না। বরং ইসলামী জঙ্গিবাদ সমকালীন বিশ্বের জন্য বড় বিপদ হয়েই আছে। গত ১৩ নভেম্বর প্যারিস হামলায় ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্যারিসের সবচেয়ে সহিংস হামলার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সহিংসতার বিষয়টি প্রমাণ হয়েছে। প্যারিস হামলাকারীরাও তাদের স্রষ্টার নামে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে ধ্বনি দিয়েছে।

বাংলাদেশের এই ছোট্ট গ্রামের যেসব মানুষ আমাদের আশীর্বাদ দিয়েছে তারাও মুসলমান। তাদেরও তো একই ধর্মে বিশ্বাস। তারাও আল্লাহু আকবর বলে। সাধারণ অর্থে, মোটা দাগে সব মুসলমানই এক। তবে একটু গভীরে ভাবলেই দেখা যাবে, মুসলমান মানেই এই নয় সবাই অভিন্ন। যেমন—যে নারীটি আমার জন্য প্রার্থনা করলেন তিনি এশীয়; বৈশিষ্ট্যে, আচরণে অনন্য। অন্যদের সঙ্গে তাঁর অনেক বৈশিষ্ট্যই মেলে না। তিনি স্বতন্ত্র গুণে উজ্জ্বল।

তাহলে কেন ‘মুসলমান’ বললেই আমাদের ভয়ে আঁতকে উঠতে হবে? এমন তো নয়, সব মুসলমানই আল্লাহর নামে আর সবাইকে ধরে হত্যা করতে চাইছে। তাদের কেউ কেউ তো এই আল্লাহরই নামে অন্যদের মঙ্গল কামনা করছে, যেমন বাংলাদেশে একজন অতিসাধারণ নারী আমাদের জন্য যে প্রার্থনা করলেন—এই আশীর্বাদ দিয়ে তিনি তো কোনো অপরাধ করেননি। ইসলাম ধর্মে নানা ধরনের, নানা মত ও ফেরকার মানুষ রয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু একটি গোষ্ঠী আতঙ্কের আবহ তৈরি করে নিজেদের ধর্মের, কখনো বা অন্য ধর্মের মানুষদের হত্যা করছে। এ জন্য সবাইকে অভিযুক্ত করা যায় না। সবাইকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।

সব রাষ্ট্রের মধ্যে আমেরিকার আজ এই ধারণাটি বোঝা উচিত যে তারা গড়ে উঠেছে নানা ধরনের ও অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী অনেক গোষ্ঠী নিয়ে। নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ তিল তিল করে যুক্তরাষ্ট্র নামের দেশটি গড়ে তুলেছে। এই আমেরিকা যদি নিজের এই বহুত্বের দৃশ্যে সন্তুষ্ট থাকতে পারে, তাদের উচিত হবে মুসলমানদের বিষয়েও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা। ইসলামে বিশ্বাসীদের সঙ্গেও তাদের পক্ষপাতহীন আচরণ করতে হবে। মুসলমানরা নানা ধরনের প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে আজ এ পর্যায়ে এসেছে। এর পরও একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে। তা হচ্ছে অভিন্ন স্রষ্টা তথা ‘আল্লাহ’তে বিশ্বাস।

‘মুসলমান’ যেন এমন কোনো শব্দবিশেষ না হয়, ভয় ধরানোর অস্ত্র হিসেবে যার ব্যবহার হবে। ইসলাম ধর্মে কোটি কোটি প্রাণের যে সমাহার ঘটেছে এবং তারা সবাই মিলে যে বিরাট এক সমাজ গড়ে তুলেছে এ বিষয়টি সবাইকে স্বীকার করে নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুসলমানরা অভিন্ন মানব জাতির অখণ্ড অংশ।

 

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের কালানি হাই স্কুলের শিক্ষার্থী। জোসেলিনের বয়স মাত্র ১৫। তবে অনেক ছোটবেলা থেকেই সে লেখালেখি করছে। লেখাটি প্রকাশ করেছে সিভিলবিট ডটকম। লেখাটি সিভিল বিট ওয়েবসাইটের ইমারজিং রাইটারস প্রতিযোগিতার জন্য জমা দেওয়া হয়েছে

ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস


মন্তব্য