kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

এত নিষ্ঠুরতা কেন

ফারুক উদ্দিন আহমেদ

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এত নিষ্ঠুরতা কেন

আমাদের সমাজটা কি একটি হিংস্র বন্য সমাজে পরিণত হচ্ছে? তা না হলে এত খুনোখুনি কেন? কেন ছোট ছোট শিশুদের এত নিষ্ঠুরভাবে খুন করে মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে? কেটে কেটে এখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া হচ্ছে? দেশের প্রায় সর্বত্রই এসব ঘটনা ঘটছে। আগেও এসব ঘটনা অল্পবিস্তর ঘটত; কিন্তু এখন যেন সব কিছুই মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

হয়তো আগে এখনকার মতো সব খবর এত দ্রুত প্রকাশ পেত না। এখন পাচ্ছে, তাই আমরা জানতে পারছি। বাহুবলে (হবিগঞ্জে) চারটি শিশুকে মেরে জঙ্গলে পুঁতে ফেলা হয়েছে। এর আগে সিলেটে একটি ছেলেকে (রাজন) বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলে আসামি সৌদি আরব চলে গেল, তাও নাকি কোনো সংস্থার সদস্যকে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে। আসলে যে যেভাবে পারে কামানোর চেষ্টা করছে বলেই এসব হয়। নইলে ওই খুনিকে দেশেই ধরা যেত। সেখানেও অবশ্য বাংলাদেশের লোকেরাই তাকে ধরে পুলিশে দেয়। ফলে সরকারের পক্ষে ওকে দেশে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে। সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হচ্ছে যে ওই শয়তানরা তাদের দুষ্কর্মের ভিডিও করে তা ফেসবুকে দিয়েছে। দুষ্কৃতকারীদের কতটুকু আস্পর্ধা থাকলে তারা এসব জঘন্য দৃশ্যের ভিডিও করে ...। এর পরও ইদানীং অনেক জেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অপরাধীরা তাদের পৈশাচিক আনন্দের ভিডিও রেকর্ড করে। এর কারণ কি এই যে তারা আইন-আদালত, বিচার—এসবের ধার ধারে না, না তাদের মাথা খারাপ? এত ঠাণ্ডা মাথায় যারা এত নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড চালায়, তাদের মাথা খারাপ মনে করাও যুক্তিসংগত নয়। তবে কি আমাদের দেশের আইনি প্রক্রিয়া অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গিয়েছে? অতি সম্প্রতি (২৫-০২-১৬, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ) মাননীয় প্রধান বিচারপতির একটি উক্তি এ ব্যাপারে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। ’ এখন তো প্রত্যেক থানায় দুজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা (ইন্সপেক্টর সার্বিক ও তদন্ত) দেওয়া হয়েছে। তবুও কেন অপরাধী দ্রুত ধরা পড়ে না, কেন এমন বিচার হয় না যে অন্যরা এ ধরনের কাজ করতে সাহসই পাবে না। এমনিতে শিশুদের ওপর নির্যাতনে কিছু কিছু গৃহকর্ত্রীর মুখ্য ভূমিকা দেখা যেত; যেমন ছোট্ট কাজের ছেলে বা মেয়েকে ছেঁকা দেওয়া, চুল কেটে ফেলা, বাথরুমে আটকিয়ে নির্যাতন। এখন সেসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশু-কিশোরদের অপহরণ, পণ চাওয়া এবং টাকা পেয়েও মেরে ফেলা। আগে অন্তত পণ পেলে ছেড়ে দেওয়া হতো অপহূতদের। এখন প্রায়ই দেখা যায়, দুষ্কৃতকারীরা আর কাউকে রেহাই দিচ্ছে না। ভেবে দেখুন, ৮-১০ বা ১২ বছরের একটি শিশুকে কয়েকজনে মিলে প্রচণ্ড নির্যাতন করে—এমনকি মেরে ফেলে! দেশে আইনকানুন আছে, এসব করে রেহাই পাওয়া যাবে না—এমন ধারণা থাকলে কি এরা এসব করত? একটা শিশু মারের আঘাতে কত কষ্ট পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে এটা ভাবলেই যেকোনো বিবেকবান মানুষের অন্তর কেঁপে উঠতে বাধ্য। কিন্তু সমাজে এখন অনেক পাষণ্ডের উদ্ভব হয়েছে, যারা অন্যের—বিশেষত একটা শিশুর প্রতিও কোনো মায়ামমতার ধার ধারে না। এদের প্রতিহত করতে হবে। এ জন্য শুধু পুলিশের ওপর ভরসা করে থাকলে হবে না। সাধারণ মানুষকেও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। একটি শিশু অপহূত হলে বা কোনো বাড়িতে একটি শিশু নির্যাতিত হলে এলাকার অন্যদেরও সজাগ ও প্রতিবাদমুখর হতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশকে খবর দিতে হবে, বিশেষত এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে, যাতে পুলিশ অবহেলার সুযোগ না পায়। তাতেও কাজ না হলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে হবে, যারা সাধারণত অপেক্ষাকৃত বেশি দায়িত্বশীল ও সচেতন। আমরা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংবেদনশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রীতিনীতিকে কিছুতেই বিসর্জন দিতে পারি না। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষই মুসলমান আর সে কারণেই আমাদের কোরআনের শিক্ষা ‘হক্ব’ ও ‘সবরের’ (সুরা আল আসর) প্রতি আমাদের একনিষ্ঠতা বজায় রাখতে হবে। যারাই ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারবে না, তারাই ‘হক্বের’ বিরুদ্ধাচরণ করবে—যারাই ধৈর্য বা সবর অনুসরণ করবে না, তারাই হিংসা, ঘৃণা ও অধৈর্যের তথা কুফরির পথে পা বাড়াবে, যা ইসলাম ধর্মমতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম। ইসলামের নীতি-নির্দেশ না মেনেও আমরা নিজেদের কিভাবে মুসলমান বলে দাবি করতে পারি—এটা প্রত্যেকেরই ভেবে দেখা দরকার; বিশেষত যারা অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতার মোহে অন্যের ওপর আঘাত হানতে উদ্যত হয়। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মদিনা চার্টারের কথা মনে করাই যথেষ্ট। সেই চার্টার বা সনদ, যাতে রাসুল (সা.) নিজে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাতে সবার সমান অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল! রাসুল (সা.) কখনো কাউকে আঘাত করতে বলেননি, এমনকি নিজের উটকেও কখনো মারেননি। এসব মনে রাখলে কোনো মুসলমানের পক্ষে হিংস্র হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তা ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মেই শান্তি ও সম্প্রীতির কথা বারবার পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। তবুও কেন শিয়া মসজিদে বা হিন্দুদের মন্দিরে আক্রমণ—এটা ভেবে দেখা দরকার। আমাদের আলেম-ওলামাদেরও এসব ব্যাপারে বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। তাঁরা প্রতিদিন বিশেষ করে জুমাবারের খুতবায় ধৈর্য বা সবর, পরোপকার ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিশেষভাবে আলোচনা করতে পারেন—বিশেষত কোরআন-হাদিসের আলোকে। প্রায় সব মসজিদেই জুমার খুতবার শেষ অংশে ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার, ‘এহসান’ বা সদাচরণ অনুসরণ করতে এবং ‘ফাহশায়ি’ বা অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার কথা (পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ) বলা হয়।

আমাদের দেশে এখন যেসব সাইবার অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা ও হিংসা-ঘৃণা চলছে (যার ফলে এত অপরাধপ্রবণতায় পেয়ে বসেছে। ), তার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা একান্ত প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, কোনো ধর্মই অধৈর্য, উগ্রতা ও হিংস্রতা সমর্থন করে না। ইসলামও এসব ঘৃণা করে ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার পরও ছোট্ট ছোট্ট শিশু ও নারীর প্রতি হিংস্র আচরণের কারণ কী হতে পারে, তা ভেবে দেখা দরকার। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কিছু সদস্যের অন্যায় আচরণ, সমাজপতিদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অর্থের লোভেই সম্ভবত এসব হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের অসদাচরণের জন্য তাদের সমগ্র বাহিনীকে দায়ী করা যাবে না বলে পুলিশপ্রধান সম্প্রতি জানিয়েছেন এবং এটাও জানিয়েছেন, যারাই অন্যায় করবে তাদেরও অন্যদের মতোই বিচার হবে। আমরা বাস্তবে এটাই দেখতে চাই। আইনের প্রয়োগ শুধু নয়, প্রয়োগ হয়েছে বলে জনসমক্ষে প্রতীয়মান হতে হবে। কিছু লোকের অপরাধপ্রবণতার জন্য সমগ্র সমাজ জিম্মি হতে পারে না। তাই এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের, বিশেষত বিচার বিভাগের দায়িত্ব অনেক বেশি। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে জঘন্য অপরাধীরা যাতে ছাড়া না পায়, এটা আমাদের সম্মানিত বিচারকদের নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, রাজনীতি, সমাজনীতি—সব কিছুই ব্যর্থ হতে বাধ্য! আমরা দেখেছি, কিভাবে দুজন বিচারককে পর্যন্ত বৃহত্তর বরিশালে দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালিয়ে মেরে ফেলল। দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকলে এসব কখনো সম্ভব হতো না। তাই শিশু ও নারী নির্যাতন থেকে আরম্ভ করে সমস্ত অপরাধপ্রবণতার মূলে আঘাত হানতে হবে—সমাজে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

 

লেখক : সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক


মন্তব্য