মনেশ্বরের মন ও ‘আলুথালু’ পার্টি-332606 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


মনেশ্বরের মন ও ‘আলুথালু’ পার্টি

মাকিদ হায়দার

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মনেশ্বরের মন ও ‘আলুথালু’ পার্টি

‘কত যে সহিব নিত্য’ পুরাতন ভৃত্য কবিতাটিতে নির্বোধ ভৃত্যের কিংবা বলা যেতে পারে প্রভুভক্তিতে অন্ধ বলেই প্রভুর জন্য বিদেশবিভুঁইয়ে গিয়ে জীবন বিসর্জন দিতে পুরনো ভৃত্য কেষ্টা দ্বিধাবোধ করেননি, কালব্যাধি বসন্ত একদিন তাঁকে নিয়ে পরপারে গেলেও যে প্রভুর দ্বারা কেষ্টা বসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই প্রভুর কেষ্টার জন্য দুঃখ ছাড়া আর কিছু করার ছিল না, প্রভু শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, সেটি যেমন তাঁর প্রিয় ভৃত্য জানতেন নাকি জানতেন না, সেটি কবিতা পাঠকদের জানার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন যেটুকু ছিল সেটুকু পাঠকরা জেনেছেন, প্রভুর-ভৃত্যের অন্ধবিশ্বাসের এক করুণ পরিণতি।

সম্প্রতি এক ‘আলুথালু’ পার্টির নেতা, যিনি রায়েরবাজার এলাকার অধিবাসী, তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পালিয়ে গিয়ে উঠেছিলেন কলকাতায় তাঁর আত্মীয়ের বাসায়, যুদ্ধের ৯ মাস কলকাতার ফুটপাতে অনেকেই তাঁকে দেখেছিলেন সাতপাঁচ বিক্রি করতে। সেই তিনি যুদ্ধের পর দেশে ফিরে বেশ কিছুদিন নৌকার মাঝিমাল্লা হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, দুর্ভাগ্যবশত নৌকায় উঠতে না পেরে কোনো রকমে সাঁতরে ডাঙায় উঠেছিলেন একটি ধানের ক্ষেতের ভেতরে। তখন পৌষ-মাঘ যাই হোক না কেন, পাকা ধানের শীষ দেখে খুব ভালো লাগায় তিনি মনে রেখেছিলেন ধানের শীষের রং পাকা সোনার মতো, সেই স্মৃতি তাঁকে প্রায়শই তাড়িয়ে ফিরত। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর একদিন মনের কোনায় রাজনীতি করার বাসনা উদয় হতেই তিনি যোগ দিলেন আলুথালু পার্টিতে।

মনেশ্বর বাবু সংখ্যালঘু হওয়ার সুবাদে পার্টিপ্রধান স্নেহ-মায়া-মমতায় তাঁকে প্রেমডোরে বাঁধলেন এবং একই সঙ্গে জানালেন, আমার আলুথালু পার্টিতে সব ধর্মের মানুষ নিয়েই হবে আমার গণতন্ত্র উদ্ধারের যাত্রা, সেই যাত্রার ব্যানার ধরবেন ডান দিকে আপনি ও বাম দিকে নিতাই ঘোষ, মাঝখানে আমি থাকব, আর আমার পিছে পিছে থাকবে কিছু লোক, যারা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে অনেক হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর, জমিজমাসহ মেয়েদের প্রতি কুদৃষ্টি দিয়েছিল এবং সেসব নিয়ে মাঝিমাল্লারা কুিসত কথাবার্তা রটিয়েছিল, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, সেটিই প্রমাণ করার জন্য আপনারা দুই সংখ্যালঘু ডানে-বামে থাকবেন, তাতে প্রমাণিত হবে, আমার পার্টির কেউ-ই সংখ্যালঘুবিদ্বেষী নন, পত্রপত্রিকায় ছবি ছাপা হলে আশপাশের দেশসহ পৃথিবীর সব জাতিই জানতে পারবে, আলুথালু পার্টি হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

মনেশ্বরের মনে কথাগুলো ধরেছিল। একটু পরেই শুনলেন, নিতাই ঘোষ আর পার্টির জন্য সময় দিতে পারবে না, সে নাকি বটতলার উকিল হওয়ার আশায় এক সিনিয়র উকিলের পা-চাটা কুকুর হয়েছে। কথাটি পার্টিপ্রধান না বললেও বলেছিল, জামালপুরের কুলকান্দি গ্রামের রাজাকার শিরোমণি আলামুদ্দি আকন্দ। আকন্দ তার দলবল নিয়ে ওই জামালপুর শহরের বুকলতলায় বানিয়েছিল শান্তি কমিটি এবং একই সঙ্গে হয়েছিল রাজাকারদের কমান্ডার। আজ সেই আকন্দ দুঃখ করেই জানাল মনেশ্বর বাবুকে, পার্টিপ্রধান কথা দিয়েছিলেন আমাদের দুই রাজাকারকে বড় বড় চেয়ার দেবেন—দিয়েছেন ঠিকই, তবে আমাকেও আশ্বাস দিয়েছিলেন, আমি সেই আশ্বাসকে বিশ্বাস করে এখনো আলুথালু দলে রয়ে গেছি। তবু মনেশ্বর বাবু আপনাকে একটা কথা বলে দিই, আপনার সঙ্গে বৃহত্তর রংপুরের, এই ধরুন লালমনিরহাট, নীলফামারী অথবা গাইবান্ধা অঞ্চলের একটি দ্বিপদের ষাঁড় রাখবেন এই কারণে যে আমাদের পার্টিপ্রধান যদি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে বলেন, দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, কোনো মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়নি—আর যদি সেই গণ্ডগোলের বছরে দু-চারজন মারা যায় কিংবা দুই-চার, ১০-২০ হাজার মারা যায়, সেসব মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রকাশের দাবি যদি কোনো দিন ওঠে—তাহলে আপনি কিন্তু গলা মেলাবেন পার্টিপ্রধানের সঙ্গে, তবে সঙ্গে রাখবেন বৃহত্তর রংপুরের সেই ষাঁড়টিকে, যে ষাঁড়টি কিছু দিন আগেও ছিল খোঁয়াড়ে।

মনেশ্বর বাবু একতরফাভাবে আলিমুদ্দি আকন্দের কথাগুলো শুনে গেলেন, না শুনে উপায় ছিল না। কেননা ওই ১৯৭১ সালে এই আকন্দরাই হিন্দু পেলে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট করতে দ্বিধা করেনি, এমনকি আমারই এক পিসেমশাই, সাভারের গোপাল বর্মণকে ধরে, মেরে না ফেলে, মুসলমান বানিয়ে নাম দিয়েছিল মীর জাফর আলী খান। পিসে নাকি জানতে চেয়েছিলেন, কেন ওই নাম দিচ্ছেন, ওই নাম তো নিমকহারাম, বিশ্বাসঘাতকের নাম। তখন নাকি আকন্দের এক লোক বলেছিল, তোরাও তো নিমকহারাম। বিশ্বাসঘাতক। তোদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই তো আজ সোনার পাকিস্তানের এই অবস্থা। পিসে কোনো প্রতিবাদ করেননি, সেই পিসেমশাই মারা গেছেন বছর পঁচিশেক আগে। তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই আমাকে আলুথালু পার্টিতে যোগ দিতে দিতেন কি না সন্দেহ আছে। মনেশ্বর শুধু শুনেই গেলেন, কিছু বলতেও পারলেন না; এমনকি ঘাড় ফিরিয়ে দেখতেও পেলেন না, আলুথালু পার্টির অতীত, যে অতীত বিভীষিকাময়, যে অতীতের প্রতিচ্ছবি, নিজ সহায়সম্পদ ফেলে রাতের আঁধারে পাড়ি দিচ্ছে সংখ্যালঘুর দল। পার্শ্ববর্তী দেশে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের পুরো সময়টাতেই। মনেশ্বর বাবু সব কিছু জেনেও হতাশ হননি। কেননা রায়েরবাজারে বাড়িটি ফেলে রেখে পালিয়ে যাননি বিদেশ-বিভুঁইয়ে। বিশাল সহায়সম্পদ, বাড়ি, সোনা-গহনা মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকা। উপরন্তু শরিকানার বাড়িটি একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না জেনেই মনেশ্বর বাবু একদিন মনস্থির করলেন, আলুথালু পার্টির প্রধান যদি বলেন, আজ পশ্চিম দিগন্তে সূর্য উঠেছে, হিমালয় পাহাড় পাবনায়, কিংবা তাজমহল নেপালে, আমাকে তা-ই বলতে হবে। কেননা পার্টি ভবিষ্যতে সরকারে গেলে আমি নিশ্চিতভাবেই জানি আমাকে ‘গলাবাজি’ মন্ত্রিত্ব দেওয়া হবে। অতএব পার্টিপ্রধান যদি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে ৩০ লাখ লোক নিহত হননি, কিংবা বলেন, জনৈক মেজরের বেতার ভাষণে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে রক্তপাতহীন অবস্থায়, আমাকে অবশ্যই সেটি বিশ্বাস করতে হবে; বিভিন্ন ফোরামে, সভা-সমিতিতে আমার নেতার অসত্য ভাষণটাকেই জনগণের সামনে বলতে হবে—এক বেতার ভাষণেই দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে পাকিস্তানিদের কবল থেকে। আর যদি আমার শরীর অথবা শীতে গলা বসে যায়, তাহলে আমাদের আলুথালু পার্টির শক্তিশালী দ্বিপদ ষাঁড়কে দিয়ে বলাতে হবে, পার্টিপ্রধানের অমৃত বাণী।

দিনকয়েক যেতে না যেতেই আলুথালু পার্টির সেই মহান নেতা এক সভামঞ্চে বলে দিলেন, দেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ লাখ লোক নিহত হননি। এর দিনকয়েক পরে মনেশ্বর বাবু আরো তিন হাত এগিয়ে বললেন, যদি ৩০ লাখ লোক মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়েই থাকে, তাহলে পত্রপত্রিকায় সেই নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম প্রকাশ করা হোক। সেই কথা শোনার পরে দ্বিপদী ষাঁড় ছয় হাত এগিয়ে বললেন, আজকে যাঁকে জাতির পিতা বলা হচ্ছে, সেই তিনি তো ৯ মাস পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কারাগারে ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, তাহলে কী করে সেই লোকটিকে আমি জাতির পিতা বলি? ষাঁড়ের কথা শুনে শ্রোতাদের অনেকেই বললেন, দীর্ঘদিন খোঁয়াড়ে থাকায়, মাথার ভেতরে ‘কিরিপোকা’ জন্মেছে। তাড়াতাড়ি মানসিক ডাক্তারের কাছে না নিয়ে গেলে, শেষঅব্দি হেমায়েতপুরে পাঠাতে হবে। পাবনা শহরের পশ্চিম দিকে পদ্মা নদীর পাড়েই সুন্দর মানসিক হাসপাতালে।

আলুথালু পার্টির মনেশ্বর, নিতাই কিংবা দ্বিপদ ষাঁড়ের কথা শুনলেই মনে হয়, তাঁরা ও তাঁদের দলের নেতা, হয়তো এখনো

অপেক্ষায় আছেন, কবে শুনবেন সেই প্রিয় গান, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ!’

 

লেখক : কবি

মন্তব্য