শিশুহত্যা বন্ধ হোক-332235 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭

শিশুহত্যা বন্ধ হোক

ইসহাক খান

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শিশুহত্যা বন্ধ হোক

শিশুদের আমরা ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করি। গ্রন্থ সাক্ষ্য দেয়—ফেরেশতারা নিষ্পাপ, তেমনি আমরাও বলি শিশুরাও ফেরেশতাদের মতো নিষ্পাপ। কখনো আমরা শিশুদের ফুলের সঙ্গে তুলনা করি। আবার কখনো সুন্দরের সঙ্গে তুলনা করি। বলি, শিশুরা ফুলের মতো সুন্দর, ফুলের মতো পবিত্র।

অথচ আমরা সেই নিষ্পাপ ফুলের মতো পবিত্র শিশুদের হত্যার উৎসবে মেতে উঠেছি। আমরা এতটাই পৈশাচিক হয়ে উঠেছি যে শিশুদের খুনে আমাদের হাত রঞ্জিত করছি। এমন নৈতিক স্খলনে আমরা বিপন্ন বোধ করছি। অস্তিত্বের মর্মমূলে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—আমরা কি মানুষ? নাকি পশু প্রজাতির তুল্য?

কিছুদিন আগে এ ধরনের পৈশাচিকতা প্রকট আকার ধারণ করেছিল। চোর সন্দেহে শিশুদের পিটিয়ে হত্যা করা হতো। তেমনি একটি হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হলে সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। সরকারও জনমতের চাপে কঠোর হতে বাধ্য হয়। অপরাধীদের ধরে তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। হত্যাকারীদের কারো কারো ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন নিম্ন আদালত। আমরা আশা করেছিলাম, এই শাস্তির কথা মাথায় রেখে এ-জাতীয় জঘন্য কাজে কেউ উৎসাহিত হবে না। কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে পশুরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শুধু মাথাচাড়া দিয়েই ওঠেনি—তারা শিশুহত্যা উৎসবে পরিণত করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে শিশুহত্যায় ক্ষোভ ও ধিক্কার জানিয়ে বলেছেন, দেশে শিশুহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, মানুষের মধ্যে এত জিঘাংসা কেন? যারা শিশুহত্যা করে তারা সমাজের ঘৃণ্য জীব। এর চেয়ে জঘন্য, নোংরামি কাজ আর কী হতে পারে? তিনি হত্যাকারীদের ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

শুধু আহ্বানে কাজ হবে বলে মনে হয় না। মানুষ নামের এই জানোয়ারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এবং তা দ্রুততম সময়ে। প্রয়োজনে শিশুহত্যাকারীদের বিচারের জন্য আলাদা একটি বিচারিক আদালত গঠন করা যেতে পারে। হত্যাকারীরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পরই রায় এবং রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। দুষ্টের দমনের জন্য রাষ্ট্রকে কখনো কখনো কঠোর হতে হয়। আমাদের রাষ্ট্র না কঠোর, না মানবিক। আমরা এই দুয়ের মধ্যে আটকে আছি। আমাদের প্রশাসন জনবান্ধব নয়। আমাদের হতাশা সেই কারণে দ্বিগুণ। এখানে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন হয় না। কখনো কখনো উল্টোটি হয়। দুষ্টের পালন শিষ্টের দমন হয়। তাতে হত্যাকারীদের আস্ফাালন বেড়ে যায়। নানা ধরনের কূটকৌশলে তারা শিশুদের ভুলিয়েভালিয়ে নির্বিঘ্নে পৈশাচিক খুনে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। কাউকে চকোলেটের লোভ দেখিয়ে ডেকে নেয়, কাউকে আইসক্রিম দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ডেকে নেয়। তারপর তারা জল্লাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এ প্রসঙ্গে আমার নিজের জীবনের একটি গল্প বলতে চাই। গ্রামে একটি পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলেছে। ওই পরিবারে আমার একজন বন্ধু ছিল। আমাদের বাবাদের মামলা-মোকদ্দমা আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো দেয়াল সৃষ্টি করতে পারেনি। আমিও বন্ধুর সঙ্গে খেলতে ওদের বাড়িতে যেতাম। বন্ধুও আমাদের বাড়িতে আসত। কই, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমার বাবা কিংবা বন্ধুর বাবা আমাদের মতো শিশুদের হত্যা করে প্রতিশোধ নেননি। তাহলে এখন এমন হচ্ছে কেন? কেন আমরা এতটা নিচে নেমে যাচ্ছি? কেন আমরা শিশুহত্যা করে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছি?

এর মধ্যে একটি হত্যা ঘটনা ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায়। একই সঙ্গে দুই ভাইবোনকে হত্যা করা হয়েছে। শিশু দুটি মারা যাওয়ার পর তাদের স্বজনরা বললেন, ‘রেস্তোরাঁ’র খাবার খেয়ে শিশু দুটির মৃত্যু হয়েছে। স্বজনদের এমন দাবির পর ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। ময়নাতদন্ত করে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তাঁরা মনে করছেন, শিশু দুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। র‌্যাবের দাবি মা-ই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ধরণী দ্বিধা হও। মুখে আর কোনো বাক্য জোটে না।

আমাদের বিশ্বাস হয় না এই জঘন্য ঘটনা মা-বাবা ঘটিয়েছেন। যা হোক, সে প্রশ্নের জবাব পরবর্তী ঘটনাক্রমে আমরা জানতে পারব।

দুই দিন আগে কুমিল্লায় সত্ভাই খুন করেছে ছোট দুই ভাইকে। আদালতে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর আগে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবলে একসঙ্গে চার শিশুকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ খুনের ব্যাপারেও খুনিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে এক শিশুর বস্তাবন্দি লাশ পাওয়া গেছে। উপজেলার মনোহরগঞ্জ বাজারে একটি স্টিলের আসবাব তৈরির কারখানার পেছন থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকালে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত শনিবার কুমিল্লা শহরের দক্ষিণ রসুলপুর এলাকায় দুই সহোদর মেহেদী হাসান জয় ও মেজবাউল হক মণিকে হত্যা করা হয়। বলতে গেলে এ তালিকা আরো দীর্ঘ হবে। আর তাতে আমাদের হাহাকার আরো বাড়বে। এ আমরা কোথায় বাস করছি? এমন নরাধমদের মুক্তিযুদ্ধে অর্জন করা দেশে জায়গা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, এই অমানুষদের নিয়েই চলছে আমাদের এই সব দিনরাত্রি। কিন্তু এভাবে আর চলতে পারে না। এই হত্যা বন্ধ করতে হবে। প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। বিচারকদেরও পরিস্থিতি অনুধাবনপূর্বক রায় দিতে হবে। আমরা চাই দেশটা শিশুবান্ধব হোক। শিশুস্বর্গ হোক আমাদের এই মাতৃভূমি। রাষ্ট্র শক্ত হাতে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করুক—এই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

 

লেখক : গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

মন্তব্য