kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

আয় ও সম্পদের প্রকট বৈষম্যে সামাজিক বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী হয় কি?

ড. সা’দত হুসাইন

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আয় ও সম্পদের প্রকট বৈষম্যে সামাজিক বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী হয় কি?

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের পর গণতন্ত্রের উপাদেয় আশ্বাসে দেশে নানা মতাদর্শের রং-বেরঙের মেলা বসে যায়। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এ মেলা বেশ সরগরম থাকে।

নীতি-আদর্শের পসরা সাজিয়ে নেতাকর্মীরা চিত্তাকর্ষক প্রকাশশৈলীতে তাঁদের পণ্যের প্রচার চালাতে থাকেন। বাম ঘরানার বন্ধুরা সমস্বরে বলতে থাকেন, ‘জনতা জেগে উঠেছে। আর কদিন পরেই গুলশান-বনানীর বড় বড় বাড়িগুলো তারা দখল করে নেবে। বাড়ির মালিক ধনিক গোষ্ঠী এসব বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে। দেশে মেহনতি জনতার রাজত্ব কায়েম হবে। ’ ডান ঘরানার বন্ধুরা একটু আস্তে কথা বলেন। তবে তাঁরাও আত্মপ্রত্যয়ী। দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘৩০ বছর ধরে এ রকম কথা শুনে আসছি। বাস্তবে এসব কিছুই হবে না। ধনিক শ্রেণিই পূর্ণ মালিকানা নিয়ে এসব বাড়ি ভোগদখল করবে। সঙ্গে তারা আরো কিছু নতুন বাড়ির মালিক হবে। জনতা জনতার জায়গায়ই থাকবে। তাদের নেতাদের আয়-উপার্জন বাড়বে, সম্পদ বাড়বে। তাদের মধ্যে কয়েকজন ধনিক শ্রেণিতে উঠে আসবে। ’ দুই পক্ষের বক্তব্যেই আমরা আনন্দ পেতাম। পরিবেশটা জমজমাট হয়ে উঠত।

তারপর দুই যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে। গুলশান-বনানীর বাড়ির মালিকানা সেই ধনিক শ্রেণি কিংবা তাদের ছেলেমেয়েদের কাছেই রয়েছে। ছোট বাড়িগুলো ভেঙে সে জায়গায় বিশাল ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। ফ্ল্যাট বা প্লট বিক্রি করে মালিকরা কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। এক কথায় তাদের সম্পদ ও আয় বহুগুণে বেড়েছে। জনতা তাদের জায়গায়ই রয়েছে। অনেকে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে। তাদের নেতারা নানা ফন্দি-ফিকির প্রয়োগ করে সচ্ছল হয়েছেন, ফ্ল্যাট কিনেছেন। ধনিক শ্রেণির সঙ্গে তাঁদের সুসম্পর্ক রয়েছে। ধনিক শ্রেণির তাঁবেদার হয়ে তাঁরা কাজ করছেন। গত দু-তিন যুগে গুলশান-বনানী কিংবা দেশের বড় শহরে শ্রেণিসংগ্রামের কোনো নমুনা দেখা যায়নি। এর মধ্যেই ধনীরা আরো ধনী হয়েছে। গরিবরা খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। তাদের একটা বড় অংশের অবস্থার কিঞ্চিৎ উন্নতি হয়েছে, ধনিক শ্রেণির তুলনায় যা একেবারেই নগণ্য।

এখন আবার আয় ও সম্পদবৈষম্যের কথা জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। পণ্ডিতদের কেউ কেউ সম্পদবৈষম্যের বর্তমান অবস্থাকে মহাসমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশে বৈষম্যের তীব্রতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তার চেয়ে বড় কথা, বিশ্ব পরিধিতে এ সমস্যা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। অক্সফামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ বছর ৬২ জন শীর্ষ ধনীর মালিকানায় যে সম্পদ রয়েছে তা বিশ্বের সর্বনিম্ন ৫০ শতাংশ লোকের মালিকানাধীন সম্পদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। যে কয়জন লোকের সম্পদের পরিমাণ নিম্নতলের ৫০ শতাংশ লোকের মোট সম্পদের চেয়ে বেশি সে সংখ্যা পর্যায়ক্রমে কমে আসছে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮০, তার আগের বছর ২০১৪ সালে ছিল ৮৫, তার চার বছর আগে ২০১০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৮৮। আরো দেখা গেছে যে শীর্ষ ৮০ জন ধনীর সম্পদ মাত্র পাঁচ বছরে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে, অর্থাৎ শতভাগ বেড়েছে। অক্সফামের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ২০১৬ সালে পৃথিবীর ১ শতাংশ লোকের মালিকানায় চলে আসবে পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ সম্পদ। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ লোকের মালিকানায় থাকবে মাত্র ১ শতাংশ সম্পদ। আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য হলেও প্রকৃতপক্ষে তাই ঘটতে যাচ্ছে। জানা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ০.৫ শতাংশ লোক দেশের ৯০ শতাংশ সম্পদের মালিক। সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও কয়েকটি স্ক্যানডেনেভিয়ান দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশেও সম্পদ বিতরণে প্রকট বৈষম্য দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের সম্পদও সীমিতসংখ্যক ধনী ব্যক্তির মালিকানায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আনুমানিক ৬২ ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদের পরিমাণ নিম্নতলের ৫০ শতাংশ লোকের মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। সংখ্যাটি বিতর্কিত হতে পারে। তবে সম্পদ যে ধীরে ধীরে শীর্ষ ধনীদের কাছে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার কাছে দেশের শীর্ষ ধনীদের সম্পদের আনুমানিক পরিমাণসহ একটি তালিকা রয়েছে। তালিকাটি পূর্ণাঙ্গ নয় এবং আমার ধারণা, শীর্ষদের সম্পদের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। যে পরিমাণ সম্পদের উল্লেখ আছে তাতেই আমাদের মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা হয়। অনানুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতিভাত হয় যে সীমিতসংখ্যক পরিবার একসঙ্গে ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স, গণমাধ্যম, বৃহৎ শিল্প, সার্ভিস ইউনিট, বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়েল এস্টেট, হাসপাতালের মালিক হয়ে বসেছে। বৃহৎ সম্পদ নতুন সম্পদ টেনে আনে। এমন হয় যে বড় সম্পদশালী ইউনিটগুলো ছোট ব্যবসাকে খেয়ে ফেলে। সাম্প্রতিককালে দু-একটি শীর্ষ ধনী পরিবারকে ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বৃহৎ শিল্প ইউনিটের অনেক প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কিনে ফেলতে দেখা গেছে। মনে হচ্ছে, সম্পদের জোরে তারা দেশের পুরো অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করতে চাচ্ছে।

এ পরিস্থিতি ও তার সত্যিকার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে অনেকেই আগ্রহী। পণ্ডিতদের অনেকেই মনে করেন, সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার তীব্রতা পরিবেশ বিপর্যয়ের তীব্রতার মতোই ভয়ংকর। এ সমস্যা সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে। মানবাধিকারকে অবদমিত করে নাগরিকের বাঁচার পথ বন্ধ করে, তার আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে এবং তাত্ত্বিক বিবেচনায় তাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ফলে সমাজে স্বস্তি ও শান্তি বিঘ্নিত হয়। পণ্ডিতদের ধারণা, সামাজিক অস্থিরতার গণ্ডি পেরিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার রুদ্ররোষে একসময় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনও আক্রান্ত হয়। এক কথায় সাম্যের পক্ষে, সুসম বণ্টনের পক্ষে জনতার বিপ্লব সুনিশ্চিত হয়। কিউবার বিপ্লব ও ষাটের দশকে বেশ কিছু দেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সমাজতান্ত্রিক শক্তির অধিষ্ঠানকে তারা ধনিক শ্রেণির বিপক্ষে গণমানুষের সফল অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করে।

বিষয়টির সামগ্রিক বিশ্লেষণ করা সমীচীন হবে। প্রথম ইস্যুটি হচ্ছে বর্তমানে দেশে দেশে যে সম্পদবৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষ বাস্তবিক পক্ষে বিক্ষুব্ধ কি না। সেভাবে উপলব্ধি করার প্রবণতা তাদের রয়েছে কি না। অক্সফাম কিংবা অন্যান্য সমীক্ষা পরিচালনকারী গবেষণা সংস্থা যে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে তা সমাজের শিক্ষিত গবেষক গোষ্ঠীর সাময়িক চিত্ত চাঞ্চল্যের উপকরণ হিসেবে কাজ করে, তাদের আলোচনা সেমিনারকে রসোত্তীর্ণ করে। এর বেশি আর কিছু হয় কি? জনতা জনতার জায়গায়ই থাকে, সেমিনার সেমিনারের জায়গায় রয়েছে, সম্পদ প্রবাহ একই ধারায় বয়ে চলেছে। দেশ-বিদেশের সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এর ফলে বড় রকমের কোনো ঝাঁকুনি লেগেছে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও কয়েকটি শহরে বাম ঘরানার সক্রিয় সদস্যরা (activists) বর্ণাঢ্য প্রতিবাদী আন্দোলন করেছিলেন। সে আন্দোলন ফলপ্রসূ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে গেছেন, ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়তো আরো ধনবান হয়েছেন। মাঝেমধ্যে গরিবদের জন্য তাঁরা হূদয়গ্রাহী বক্তব্য দিচ্ছেন। গরিবদের সমর্থনে দান-খয়রাত করছেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেশে-বিদেশে যারা নানা প্রক্রিয়ায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো জনদরদিকে আমি বিষোদ্গার করতে শুনিনি। নাম ধরে ঘৃণাসূচক বাক্য আওড়াতে দেখিনি। জনগণের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক আন্দোলন (Hate campaign) ছড়িয়ে দিতে দেখিনি। পক্ষান্তরে বুদ্ধিজীবীদের নাম ধরে তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখেছি। তাদের পুঁজিপতি (Capitalist) না বলে উদ্যোক্তা বলতে শুনেছি। বুদ্ধিজীবীরা তাদের লুটেরা না বলে জনহিতৈষী সম্বোধন করেন, মুনাফাখোর আখ্যায়িত না করে উত্পাদনশীল বিনিয়োগকারী রূপে আখ্যায়িত করেন। সবশেষে তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগতভাবে অথবা নিজস্ব প্রকল্পের জন্য উদার সাহায্য পেতে সচেষ্ট থাকেন। সে হিসেবে দেশের কিংবা বিদেশের ৬২ জন শীর্ষ ধনী আমাদের অবজ্ঞা কিংবা ঘৃণার পাত্র নন, তাঁরা আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র। আমরা বুক ফুলিয়ে তাঁদের কীর্তি-কাহিনী বর্ণনা করি।

আসলে মার্ক্সীয় বিশ্লেষণে যে সর্বহারা শোষিতের কথা বলা হয়েছিল আজকের জগতে ঠিক সে অবয়বের সর্বহারা আছে কি না তা গভীরভাবে বিচার্য বিষয়। অর্থনীতিতে যখন শূন্যাবর্ত (Zero sum) খেলা চলে তখন সর্বহারা শোষিতের দল সহজেই পরিদৃষ্ট হয়। যখন যোগাবর্ত (plus sum) খেলা চলে তখন সর্বহারা দলের সংখ্যা কমে আসে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ উত্পাদনের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে চলে, বাড়তি সম্পদের একাংশ, তা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, দরিদ্র-সর্বহারাদের ঘরে যায়। ধীরে ধীরে তাদের পরিবার থেকে চরম দারিদ্র্য হ্রাস পেতে থাকে। একসময় তাদের মৌল চাহিদা ((Basic needs) মিটে যায়। তখন তাদের সংক্ষোভ প্রত্যাশায় রূপান্তরিত হতে থাকে। স্যামুয়েলসন, ফ্রিডম্যান, সলো এ ধারণার প্রসার ঘটিয়েছেন। মুখে স্বীকার না করলেও বাস্তবে এ ধরনের ধারণাকে সিংহভাগ চিন্তাবিদ, রাষ্ট্রনায়ক ও সমাজ সংগঠকরা মেনে নিয়েছেন। মৌল চাহিদা মিটে যাওয়ার পর নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য আপেক্ষিক দারিদ্র্যে পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে ক্ষুধার্ত মানুষের ক্রোধ বা সংক্ষোভের তীব্রতা আর থাকে না। এ ধরনের লোককে বিপ্লবী সত্তায় পরিণত করা প্রায় অসম্ভব কাজ। সর্বহারা থেকে নিম্নবিত্ত হওয়ার পর আরাম-আয়েশের প্রতি তাদের যে আসক্তির সৃষ্টি হয়, তা থেকে তাদের দূরে সরানো যায় না। নিজের স্বার্থ ছাড়া তারা আর কিছু বোঝে না। ‘লুম্পেন’  নিম্নবিত্ত (Lumpen Lower class) অর্থনৈতিক উপায়ে রাতারাতি শ্রেণি উত্তরণ ঘটাতে ব্যস্ত থাকে। তাদের দেখাদেখি বিত্তহীনরাও সম্পদের খোঁজে মরিয়া হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রযুক্তির বদৌলতে যেভাবে উত্পাদন ও সম্পদ বেড়েছে এবং তার ফলে যে যোগাবর্ত অর্থনৈতিক পরিবেশ বিনির্মিত হয়েছে সে পরিবেশে ক্ষুধার্ত সর্বহারা খুঁজে বের করে তাদের বিপ্লবী ক্যাডার হিসেবে গড়ে তোলা মহাকঠিন কাজ হয়ে পড়েছে।

যদি কোনো সংগঠন অতিকষ্টে কতিপয় বিপ্লবী কর্মী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়, সেই কর্মীদের দিয়ে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারকে পরিবর্তন তথা উত্খাত করা আজকের দিনে অসম্ভব ব্যাপার। ৪০-৫০ বছর আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্রায় সব দেশেই নিরাপত্তা বাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসংহত। সম্পদবৈষম্য দূরীকরণের স্লোগান দিয়ে কয়েক শ, বড়জোর কয়েক হাজার সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারসংবলিত সুসজ্জিত বাহিনীকে মোকাবিলার পরিকল্পনা প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতাবিবর্জিত অলীক স্বপ্ন মাত্র। পঞ্চাশের দশক থেকে এ অঞ্চলে যাঁরা বিপ্লবের ঘোষণা দিয়ে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি করেছেন তাঁরা হাড়ে হাড়ে এ বাস্তবতা বুঝতে পেরেছেন। যেসব দেশে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে(inner contradiction) সরকার ছিল বিভ্রান্ত, দ্বিধান্বিত, কোন্দল ও অপশাসনের কারণে জনবিচ্ছিন্ন, শক্তিহীন সেসব দেশে দেশি-বিদেশি ক্ষমতাধর শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তায় ক্যাডার সদস্যদের নিয়ে বৈষম্য নিরসনের স্লোগান দিয়ে কখনো বা সাম্যবাদী শক্তি ক্ষমতায় আরোহণ করেছে। বেশ কয়েক দশক আগে তেমনটি ঘটে থাকলেও নিকট-অতীতে একমাত্র নেপাল ছাড়া অন্য কোনো দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হয় না। অতএব জনতার রুদ্ররোষে সম্পদবৈষম্য দূরীভূত হবে—এমনটি আশা করা বাস্তবানুগ হবে না।

শ্রেণিসংগ্রামের চেয়ে সমশ্রেণিভুক্ত বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার যে দ্বন্দ্ব্ব চলে সেদিকে জনতার দৃষ্টি মূলত নিবদ্ধ। এখানে একনায়কতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে, গণতন্ত্রহীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বক্তব্য আসে, দুর্নীতি, অনিয়ম, সুশাসনের অভাব, অন্যায়-অবিচার ও অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে জনতাকে সোচ্চার হতে দেখা যায়। কিন্তু চিহ্নিত ধনীদের বিরুদ্ধে কোনো গোষ্ঠীকে জোরালো বক্তব্য রাখতে দেখা যায় না। বাংলাদেশে তো নয়ই। এ দেশে যে দুটি বড় দল রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক, সম্পদবৈষম্য দূর করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা তাদের রাজনীতির মূল উপজীব্য নয়। যারা সমাজতন্ত্রের কথা বলে তারা ব্যক্তি হিসেবে সম্মানিত, কিন্তু তাঁদের দলের জনসমর্থন নেই। এখন নাগরিকরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক। যে দল ক্ষমতায় আসতে পারবে তার প্রতি তারা আকৃষ্ট। প্রত্যন্ত গ্রামের সমর্থকও হিসাব করে তার দল ক্ষমতায় এলে তার বৈষয়িক তরক্কি কী হবে। কার নীতি ভালো, কে ভালো লোক এটি মূল বিবেচ্য নয়, কেন্দ্রে তার নেতা কত কোটি টাকা উপার্জন করল এটি জানতে সে আগ্রহী নয়, অত টাকা সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা নেই। সে এটুকু বোঝে, তার দল, তার নেতা সরকারে থাকলে গ্রামপর্যায়ে তার কয়েক হাজার টাকা আয়-উপার্জনের পথ সুগম হবে। অতএব দলের প্রতি তার আনুগত্য অবিচল থাকতে হবে। শহরে-বন্দরে, গ্রামগঞ্জে সাধারণ মানুষ, এমনকি মধ্যবিত্তরাও জানতে চায় না কোন ধনী পরিবারের কত হাজার কোটি টাকা আছে। এটি তাদের মাথায় ধরে না। তারা শুধু অবাক মুগ্ধতায় এসব শুনে যায়, এ নিয়ে রসাত্মক গল্প করে। একইভাবে বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট, কার্লোস স্লিম, আমানিকো ওরতেগা, প্রেমজি কিংবা আম্বানির বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের হিসাব আমাদের মাথায়ও তাত্ক্ষণিকভাবে ধরে বলে মনে হয় না। আমরা মুগ্ধ হই। আমাদের মধ্যে যারা বৈষয়িক ও চালাক, তারা এ সম্পদের ছিটেফোঁটা কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে পেতে পারে কি না সে সম্পর্কে চিন্তা-ধান্দা করতে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কারো কোনো ক্ষোভ নেই। নিজেদের আয়-উপার্জন ঠিক থাকলেই হলো। আয়-উপার্জন আরো বাড়ানোর জন্য তাদের একাংশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুস্তর মরুভূমি কিংবা উত্তাল সাগর পাড়ি দিতেও রাজি। নগণ্যসংখ্যক কয়েকজন ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা নানা ধরনের অনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে কুণ্ঠা বোধ করে না।   অর্থের লোভে সন্ত্রাসী দলেও তারা নাম লেখায়। তবু তারা জীবনপণ করে ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে রাজি নয়। যে কর্মসূচি থেকে নগদ কিছু পাওয়া যাবে না, সে কর্মসূচি সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।

ডান ঘরানার বন্ধুরা এখন অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। সময় বিশেষে তাঁরা সরবে বক্তব্য রাখছেন। বক্তব্যে তাঁরা সুসম বণ্টনের মূল দর্শনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তাঁরা মনে করেন যে সম্পদের অসম বণ্টন থাকলেও তা সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নাগরিকের কল্যাণের পরিপন্থী নয়। বিভিন্ন সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য সম্পর্কেও তাঁদের আপত্তি রয়েছে। মাত্র কয়েকজন ব্যক্তির কাছে বিশ্বের সিংহভাগ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়াকে তাঁরা সরল বিশ্বাসে মেনে নিতে চান না। এ ধরনের তথ্যকে তারা publicity hype বা অতিশয়োক্তি মনে করে। দেশ-বিদেশের শীর্ষ ধনীদের অনেকের নাম আমাদের জানা। মেহনতি শ্রমিক বা বঞ্চিত মানুষের রক্ত চুষে তাঁরা ধনাঢ্য হয়েছেন এ কথা তো বেশি লোক বলছে না। আমরা উল্টো ধারণা পাচ্ছি যে মেধা, শ্রম, উদ্যোগ, প্রযুক্তির সার্থক ব্যবহার ও উন্নতমানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁরা সম্পদশালী হয়েছেন। সে সম্পদ তাঁরা জনকল্যাণে ব্যয় করেছেন। যদি তাই সত্যি হয়, তবে তাঁদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হলে রাষ্ট্র, সমাজ বা নাগরিকের অসুবিধা কোথায়? সবাই তো খেয়ে-পরে ভালো আছে। কেউ তো নাম ধরে বা গোষ্ঠী তুলে বিপুল সম্পদের মালিকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে না। ডানের বন্ধুদের ধারণা, তাদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত না হলে সে সম্পদ সরকারি কোষাগারে চলে যেত। সরকার সে সম্পদ যে আরো ফলপ্রসূভাবে জনকল্যাণে ব্যয় করত তার নিশ্চয়তা কে দেবে। ৬২ জনের হাতে রাষ্ট্র বা বিশ্বের অধিকাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার পরও সুদীর্ঘ সময়ে যখন দেশে দেশে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটেনি, তখন ৬২ জনের স্থলে ৩২ জনের হাতে সমপরিমাণ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হলেও যে সামাজিক বিস্ফোরণ অত্যাসন্ন হবে—এমনটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এ অনিশ্চয়তা তাদের আরো মুখর করে তুলেছে।

বাম ঘরানার বন্ধুরা এখন চুপ থাকছেন। উত্তর দেওয়ার জন্য তাঁরা শব্দ খুঁজছেন, বাক্য খুঁজছেন। সময়-সুযোগ এলে হয়তো তাঁরা যথার্থ উত্তর নিয়ে হাজির হবেন।

 

 লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য