একাত্তরের অন্য স্মৃতি-331925 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


একাত্তরের অন্য স্মৃতি

বুলবুল মহলানবীশ

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একাত্তরের অন্য স্মৃতি

সত্য-ন্যায় ও সুন্দরের পক্ষে যেকোনো বৃহৎ আন্দোলনে সংস্কৃতিকর্মী বা শিল্পীদের একটা বিশাল ভূমিকা থাকে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ব বাংলার সব মুক্তিকামী বাঙালি অসহযোগ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি নির্দেশ মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। ২১ মার্চ আমরা কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার সদস্যরা এবং শাখামেলার সদস্যরা মিলে সুখেন্দু চক্রবর্তীর নেতৃত্বে বিকেলে শহীদ মিনারে গণসংগীত এবং দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করি। সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। নাট্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম ও গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২৫ মার্চ দুপুর পর্যন্ত ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ভিক্টোরিয়া পার্কসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে উদ্দীপনামূলক সংগীত পরিবেশন করেছে। আমার সৌভাগ্য যে আমিও তখন এর অংশীদার হতে পেরেছিলাম। প্রাণের টানে যোগ দিয়েছিলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে।

আমাদের প্রতিদিনের নিয়ম ছিল, সকাল ১০টায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রবেশ করা, গান, নাটক ইত্যাদির মহড়া, রেকর্ডিং সেরে রাত ১০/১১টায় নিজেদের বাড়ি বা গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাওয়া। সারা দিনে কখনো আধপেটা খেয়ে কখনো না খেয়ে, আবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে ভালো খেয়ে আমরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতাম। এখন এসব নিয়ে ভাবলেও তখন ভাবিনি, এসব কথা তখন মাথায়ও আসত না। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খুব কাছেই ছিল প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই সবার মুখে সুচিত্রা সেনের সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের কথা শুনে সুচিত্রা সেনকে স্বপ্নরাজ্যের মানুষ বলে মনে হতো। তাঁর আদি বাড়ি বাংলাদেশের পাবনায়। কিশোরী সুচিত্রা সেন দেশ বিভাগের পর চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। শিরিন বলে একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন আমাদের চেয়ে বয়সে একটু বড়। আমি শিরিন আপা ডাকতাম। শিরিন আপা আর আমি একদিন ঠিক করলাম, সুচিত্রা সেনের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে দেখে আসব। তখনো তিনি পুরোপুরি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাননি। ছোট একটু বাগান পেরিয়ে বাঁ হাতে সামনে বারান্দাওয়ালা একটি বাড়ি। ফটকে একজন দারোয়ান আছে। আমরা ভেতরে যেতে চাইলে দারোয়ান আমাদের দরজা খুলে দিল। কিন্তু বারান্দার লোহার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কলিং বেল বাজাতেই একজন বয়স্ক মানুষ এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাই।’ খুব রূঢ় বা কঠিনভাবে না বললেও তাঁর কণ্ঠে খুব একটা আন্তরিকতাও ছিল না। আমরা খুব অনুনয়ের সুরেই বললাম, ‘কাকা, আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, শরণার্থী। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ উনি বললেন, ‘সাহায্য দরকার?’ বুঝলাম, অনেকেই সাহায্যের জন্য আসে। আমি বললাম, ‘না, না, সাহায্য-টাহায্য না, আমরা ওঁকে একটু দেখতে এসেছি। উনি আমাদের খুব প্রিয় মানুষ তো, তাই।’ আমাদের চেহারা আর বলার ভঙ্গিতে বুড়ো মানুষটার হয়তো একটু দয়া হলো। বললেন, ‘মা তো খুব একটা বেশি কারো সঙ্গে দেখা করেন না, তবু আমি তোমাদের কথা ওঁকে জানাচ্ছি।’ বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বুড়ো মানুষটা এসে দরজাটা খুলে আমাদের ভেতরে বসতে বললেন। আমরা গিয়ে বসলাম। কিছু বেতের চেয়ার আর টেবিল ছিল সেখানে। একটু পরে ট্রেতে করে দুটি কাচের প্লেটে সন্দেশ আর টুকরো করে কাটা পেয়ারা নিয়ে এলেন তিনি। বললেন, ‘তোমরা খাও। মা আসছেন।’ আমাদের ভেতরে তোলপাড় শুরু হলো। শিরিন আপা আর আমি দুজনে দুজনের হাত চেপে ধরলাম খুশিতে। কিন্তু ৫ মিনিট, ৭ মিনিট, ১০ মিনিট, প্রায় ২০ মিনিট পার হয়ে গেল—সুচিত্রা সেনের দেখা নেই। মনে মনে রাগও হচ্ছিল আবার অবিশ্বাসও জন্মাচ্ছিল। ব্লাফ দিল না তো বুড়োটা! আমাদের সন্দেশ আর পেয়ারা খাওয়াও শেষ। এমন ভালো খাবার তো সচরাচর আমরা খেতে পাই না! প্রায় ২৫ মিনিট পর তিনি এলেন। কালো পেড়ে সাদা রঙের একটা তাঁতের শাড়ি, নিরাভরণ, শুধু হাতে একগাছি করে সরু চুড়ি পরা। কী ব্যক্তিত্বময়ী! আমরা তাঁকে প্রণাম করলাম। আমাদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। তারপর খুব উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা নিয়ে বললেন, ‘স্নান করছিলাম, তাই একটু দেরি হলো। তোমরা তো শুনলাম বাংলাদেশ থেকে এসেছ। কী হচ্ছে সেখানে?’ আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলাম। প্রচণ্ড কষ্টে মুখটা তাঁর কেমন হয়ে যাচ্ছিল। স্বগতোক্তির মতো বললেন, ‘উহ্, কী নৃশংস!’ এরপর একটু থেমে বললেন, ‘তোমাদের কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’ আমরা বললাম, ‘আমরা তো সাহায্য চাইতে আসিনি, আপনাকে দেখতে এসেছিলাম। পারলে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করবেন।’ উনি বললেন, ‘আমরা অভিনয়শিল্পীরা চেষ্টা করছি কিছুটা আর্থিক সাহায্য করতে; যদিও আমি মিটিং-মিছিলে বা অনুষ্ঠানে যাই না। কিন্তু সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এত বড় যুদ্ধে কতটুকুই বা করতে পারব! তোমাদের আশীর্বাদ করি, তোমরা যেন জয়যুক্ত হতে পারো।’ আমরা বললাম, ‘এবার আমরা আসি, আমাদের রেকর্ডিং আছে।’ উনি ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন। আমরা চলে এলাম সেখান থেকে।

গরচা রোডে একটা দোতলা বাড়িতে থাকতেন কানন দেবী। তিনি ২৫ মার্চের পর তাঁর বাড়ির নিচতলায়, বাংলাদেশ থেকে আসা স্বামীহারা, নির্যাতিত নারী এবং অনাথ শিশুদের জন্য তৈরি করেছিলেন একটি অস্থায়ী ছোট্ট পুনর্বাসনকেন্দ্র। ১০-১২ জন নির্যাতিত কিংবা স্বামীহারা নারী এবং প্রায় ১৫টি অনাথ শিশু ছিল সেখানে। অভিনেত্রী সুমিতা দেবী আর মাধুরী চট্টোপাধ্যায় একদিন আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে সেখানে গেলেন। কানন দেবী বাড়ি ছিলেন না। দেখলাম, আশ্রিতা মহিলাদের কয়েকজন কাঁথা সেলাই করছেন, কেউ কেউ আবার বেতের ঝুড়ি বানাচ্ছেন, কেউ পা-মেশিনে সেলাই করছেন। শিশুদের সামনে নানা ধরনের খেলনা। কেউ কেউ কাঁদছে, কারো নাক দিয়ে কফ পড়ছে, কেউ কেউ আবার খেলনা দিয়ে খেলছে। তদারকির জন্য আছেন দু-তিনজন নারী সদস্য, যাঁরা সব কিছু দেখছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন সুমিতাদি আর মাধুরী মাসিমাকে দেখে বললেন, ‘বেশ কদিন পরে এলেন দিদিরা। আরো দু-একটি মেয়ে এসেছে। ওদের অবস্থা খুব খারাপ।’ বুঝলাম, ওঁরা এখানে মাঝেমধ্যেই আসেন।

আমরা প্রায়ই সেখানে যেতাম। বাচ্চাদের খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো এবং ওদের কবিতা আর গান শুনিয়ে একটু আনন্দ দান করাই ছিল আমাদের কাজ। পাকিস্তান সরকার, তার সেনাবাহিনী, রাজাকার, আলবদররা কী ভয়ংকর, কী বীভৎস অত্যাচার করেছে বাঙালির ওপর তা ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে ‘পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য’ অনুষ্ঠানে প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে আগত শিল্পীদের অডিশন আহ্বান করা হয়েছে সংবাদপত্রের মাধ্যমে। খবরটা দেখে ইডেন গার্ডেনের আকাশবাণী ভবনে গেলাম। অডিশন দিলাম। প্রযোজক ছিলেন অরুণ দত্ত আর নজরুলের স্নেহধন্য প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বিমলভূষণ। আমি নজরুলেরই গান গাইলাম। বিমলভূষণ খুব প্রশংসা করলেন গান শুনে। ওঁরা জানালেন, ছয়টা নজরুলগীতি স্টুডিও রেকর্ডে ধারণ করা হবে। আমার মনে হলো, আমি যেন আকাশে উড়ছি। বাংলা গানের শিল্পীদের জন্য আকাশবাণী কলকাতা স্বপ্নের জায়গা। হেমন্ত, মান্না দে, সন্ধ্যা, প্রতিমা, সতীনাথ, আলপনা, আরতি, নির্মলা মিশ্র, রবিশংকর, আলী আকবর, নিখিল ব্যানার্জি, পান্নালাল ঘোষ, শরণ রানী, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, মহালয়া, পঙ্কজ মল্লিক, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, দেবদুলাল, সংবাদ বিচিত্রা, সংবাদ পরিক্রমা, অনুরোধের আসর—অসংখ্য শব্দ, অসংখ্য নাম, অসংখ্য কণ্ঠ আমার কানে-মাথায় যুদ্ধ শুরু করে দিল। এঁদের সঙ্গে আমার নামটাও বিন্দুর মতো কিংবা অণু-পরমাণুর মতো হলেও যুক্ত হবে! আমি ব্যাপারটা ভাবতেই পারছি না। নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে খবরটা জানাতেই সবাই প্রচণ্ড খুশি, প্রচণ্ড উত্তেজিত।

রেকর্ডিংয়ের দুই দিন আগে থেকে সর্দি-জ্বরে গলা একদম বসে গেল। কোনো ওষুধ, গলা গার্গল, লবঙ্গ, তেজপাতা কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। গলা দিয়ে খনখন আওয়াজ বেরোচ্ছে। দুঃখে-কষ্টে মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এত বড় একটা সুযোগ নষ্ট হয়ে যাবে! যা-ই হোক, নির্দিষ্ট দিনে চলে গেলাম আকাশবাণীর স্টুডিওতে। বিমলদাকে অনুরোধ করলাম কয়েক দিন পর সর্দি-কাশি সেরে গেলে রেকর্ড করতে। উনি বললেন, ‘ঠিক আছে, একটা গান করে দেখি, যদি ভালো না হয়, তবে পরেই রেকর্ড করব।’ বলে পকেটের ভেতর থেকে একটা কৌটা বের করে গুঁড়ো মসলার মতো কী দিলেন আর বললেন, ‘এটা চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নে।’ তারপর শিকড়ের মতো কী একটা দিলেন, বললেন, ‘এটা মুখে রাখ।’ তারপর ফ্লাস্ক থেকে আদা দেওয়া লাল চা খেতে দিলেন। কী আশ্চর্য! যেন জাদু! পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই গলাটা খুলে গেল। কাশিও ঘন ঘন হচ্ছে না!

যন্ত্রীরা সবাই বসলেন, রিহার্সাল করলেন। এবার রেকর্ডিংয়ের পালা। অরুণদা আগে থেকেই রেকর্ডিং প্যানেলে বসে ছিলেন। বিমলদা এবারে চলে গেলেন সেখানে। এতক্ষণ পাশের স্টুডিও থেকে গান ভেসে আসছিল; ‘ঝিঙেফুল লিলেক জাতি কুল গো...’ কণ্ঠটা চেনা। ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে...’ গানটি গেয়ে সমগ্র বিশ্বের বাঙালির কাছে এটি একটি সুপরিচিত কণ্ঠস্বর। অংশুমান রায়। কখনো দেখিনি তাঁকে।

ভারতের কত বড় বড় মানুষের সান্নিধ্য লাভ করেছি, কাছ থেকে দেখেছি, তাঁদের কথা শুনেছি। কয়েকজনের নাম জানা থাকলেও তখন বুঝতাম না কত বড়মাপের মানুষ তাঁরা! জ্যোতি বসু, অন্নদাশংকর রায়, সত্যজিৎ রায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ড. ত্রিগুণা সেন, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র সিংহ, রমেন মিত্র, ইলা মিত্র, উত্তম কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কানন দেবী, গৌরী আইউব, দেবব্রত বিশ্বাস, গোপাল হালদার, ভূপেন হাজারিকা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র, রুমা গুহঠাকুরতা, মৈত্রেয়ী দেবী, কাজী সব্যসাচী, ড. রমা চৌধুরী, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র—আরো কত মানুষ! তাঁরা বাংলাদেশের বিপন্ন মানুষের পাশে এসে বন্ধুর মতো, আত্মীয়ের মতো দাঁড়িয়েছেন; আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন। মানবতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন তাঁরা সে সময়। আমরা কি তাঁদের সেই উদারতার কথা, মহত্ত্বের কথা, ত্যাগের কথা ভুলতে বসেছি!

লেখক : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী

মন্তব্য