শিশু নির্যাতনের ভিন্নরূপ-331923 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


শিশু নির্যাতনের ভিন্নরূপ

মোফাজ্জল করিম

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শিশু নির্যাতনের ভিন্নরূপ

সিলেট, খুলনা, বাহুবল ও আরও কয়েকটি স্থানে সাম্প্রতিককালে কতিপয় নরপিশাচের শিশু নির্যাতন ও শিশু হত্যার বর্বরোচিত ঘটনা, আমি নিশ্চিত, দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে। এই প্রজন্মের তরুণদের কথা বাদই দিলাম, আমরা যারা পলিতকেশ লোলিতচর্ম সিনিয়র সিটিজেন অন্তরে অহর্নিশ ভ্রমরগুঞ্জন শুনি ‘যো দিন যাওয়ি সো বাহুড়ি না আওয়ি’ (যে দিন চলে গেছে সে দিন আর ফিরে আসবে না : ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান), আর পারের কড়ি গুনি ‘নিরলে বসিয়া’, তারাও স্মরণ করতে পারি না এমন পৈশাচিক কাণ্ড কোনোকালে প্রত্যক্ষ করেছি কিনা। না ব্রিটিশ আমলে, না পাকিস্তান আমলে শিশুদের ওপর এমন নির্মম নির্যাতন ও হত্যার মিছিল মুহুর্মুহু ঘটে যেতে দেখেছে কেউ। এখন কায়মনোবাক্যে একটাই প্রার্থনা : বন্ধ হোক এই বর্বরতা, আর দশটা অপরাধের খলনায়কদের মত এই পিশাচগুলোও যেন পেশী ফুলিয়ে তুড়ি মেরে পার পেয়ে না যেতে পারে।

সত্যি, গত কিছুদিন যাবৎ সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অসহায় দু’টি শ্রেণীর ওপর অত্যাচারের মাত্রাটা যেন অকস্মাৎ বেড়ে গেছে। এই শ্রেণী দু’টি হচ্ছে শিশু ও নারী। এদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন সব যুগে সব কালেই হয়েছে, এটা নতুন কিছু নয়। বিধাতা শারীরিক শক্তিমত্তার দিক দিয়ে এদের কেন যে খাটো করে সৃষ্টি করেছেন তা তিনিই জানেন। হয়তো এদের প্রতি বীর্যবান পুরুষ জাতি কীরূপ আচরণ করে তাই দেখতে চান তিনি। পুরুষরা কি এই দুর্বল মানুষগুলোকে স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে, প্রেম-প্রীতি দিয়ে, শৌর্য দিয়ে, শক্তি দিয়ে রক্ষা করছে, পালন-পোষণ করছে, না আপন বলবীর্যের আসুরিক প্রয়োগ দ্বারা তাদের নির্যাতন করছে, হয়তো সেই এক্সপেরিমেন্টটাই সৃষ্টিকর্তা করে চলেছেন সৃষ্টির আদিকাল থেকে।

সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামিন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে প্রতিনিয়ত অবশ্যই নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করতেই পারেন। এটা তাঁর ‘প্রেরগেটিভ’ (‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে...’ : নজরুল)। বিশ্বাসী হিসেবে আমরা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করি, তিনি যাই করেন তা তাঁর সৃষ্টির মঙ্গলের জন্যই করে থাকেন। তা না হলে কবে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লয় হয়ে যেত। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কদিন পর পর আমাদের কর্তৃপক্ষ যেসব এক্সপেরিমেন্ট করেন তা করার প্রেরগেটিভ কে তাদের দিল জানতে পারি কি? কর্তৃপক্ষ কি নিজেদের এমন ‘অমনিপটেন্ট’ মনে করে যে তারা যখন যা খুশি করতে পারে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে? আজ এমসিকিউ পদ্ধতি, তো কাল সৃজনশীল, তো পরশু ডিজিটাল। আর এর প্রায় সব কিছুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণীগুলোতে।

১০/১১ বছর বিরামহীন বিচ্ছেদহীনভাবে লেখাপড়া করতে করতে স্কুলজীবনকে খোদা হাফেয জানানোর আগ মুহূর্তে যেখানে তার বাবা-মা ম্যাট্রিক/এসএসসি—অর্থাৎ স্কুল ফাইন্যাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতেন, সেখানে স্কুলে গিয়ে ৫/৬ বছর পড়তে না পড়তেই একটি ১০/১১ বছরের শিশুকে প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট নামক একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ যেন সংসার কী বোঝার আগেই একটি মেয়েশিশুকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া। আর সেই যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতিতে শুধু যে ক্ষুদে সৈনিকটির জীবন তেজপাতা হয় তা না, তার মা-বাবা, ভাই-বোন, গৃহশিক্ষক-স্কুলশিক্ষক—সবার ‘খাইলে খিদে হয় না, ঘুমাইলে চক্ষে দেখি না’ দশা হয়।

বছর কয়েক আগে থেকে আবার পরীক্ষাপদ্ধতিতে আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। আমাদের পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসা সেই প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ এবং স্ট্যান্ড করা, লেটার মার্কস পাওয়া, স্টার পাওয়া—এগুলো এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। তার জায়গায় এসেছে জিপিএ-৫, এ প্লাস, এ, এ মাইনাস ইত্যাদি। কোন স্কুল ক’টা জিপিএ-৫ পেয়েছে, কারা একটাও পায়নি, কাদের ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই পেয়েছে জিপিএ-৫ এটাই আজকাল প্রধান আলোচ্য বিষয়। আর ফেল? ওটা এখন নেহায়েত আহাম্মক ছাড়া কেউ করে না। এই জিপিএ দৌড়ে এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ব্লাড প্রেশার দু’শ-র নিচে আর নামেই না!

আসুন এবার পঞ্চম শ্রেণীর প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট, সংক্ষেপে পিএসসি পরীক্ষার্থী একজন শিক্ষার্থীর জীবনযাপন প্রণালী কেমন দেখা যাক। শিক্ষার্থীটির বয়স বড়জোর ১০ কি ১১। এই বয়সে তার সবচেয়ে প্রিয় হওয়ার কথা তার বন্ধুবান্ধব, খেলাধুলা, কম্পিউটারে গেম খেলা, টিভিতে কার্টুন দেখা, গল্পের বই পড়া ইত্যাদি। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না, পঞ্চম শ্রেণী মানে হচ্ছে, তার জন্য এসবের অনেক কিছু নিষিদ্ধ। তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মা-বাবার ডাকাডাকি, টানাহেঁচড়ার ভেতর চোখে রাজ্যের ঘুম নিয়ে সেই সাতসকালে শয্যাত্যাগ করতে হবে, গাড়িতে বা রিকশায় বসে ‘আর খাব না’ বলতে বলতে মার হাতের রুটির টুকরো গিলতে হবে, খাদ্য গুদামের কুলিদের মত পিঠে বইয়ের বোঝা নিয়ে ভান করতে হবে ওটা কিছুই না, স্কুল ছুটির পর আরও অতিরিক্ত ঘণ্টা দু’য়েক স্কুলে থাকতে হবে স্কুল কোচিংয়ের জন্য, তারপর বেলা তিনটার দিকে বাসায় ফিরে নাকেমুখে চারটা গুঁজে সাড়ে তিনটায় ছুটতে ছুটতে গিয়ে ঢুকতে হবে বৃন্দ-পাঠাভ্যাসের কোচিং সেন্টারে। বাসায় এসে সন্ধ্যায় গৃহশিক্ষক, স্কুলের হোম-টাস্ক ইত্যাদির পর শরীরে তখন আর হাড়-মাংস যেন কিছু নেই, শুধু খালপাড়ের থিকথিকে কাদা। আর মাথার ভেতর? ওটা তো দেখা যায় না, গেলে পরে দেখা যেত, ওখানে শুধু প্রশমিত ক্রোধ, অতলান্ত অতৃপ্তি ও ঝরে পড়া সম্ভাবনার অজস্র কুঁড়ি। বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থায় এই দৃশ্য অবশ্য শহরের শিশুদের জীবনে ঘটতে দেখা যায়, অজপাড়াগাঁর ছেলেমেয়েরা এখনও পড়ে আছে এক শ বছর পেছনে। ফলে শহর ও গ্রামের স্কুলগুলোর মধ্যে কোনো তুলনাই হয় না, না লেখাপড়ায়, না ফলাফলের বেলায়, না জীবনযাত্রায়।

আমি যখন একটি কচি শিশুকে একগাদা বই পিঠে ন্যুব্জদেহে হেঁটে যেতে দেখি, তখন আমার আরেকটি শিশুর কথা মনে পড়ে যায়। সে হচ্ছে, রাজমিস্ত্রীদের জোগালি হিসেবে নিয়োজিত শিশুশ্রমিক, যার মাথার ওপর বইয়ের গাদা নয়, দশটি দশ ইঞ্চি থান ইটের স্তূপ। সেই শ্রমিক শিশুটির কষ্ট কিছুটা হলেও যাতে অনুভব করতে পারে সে জন্যই বোধ হয় আমাদের শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের পিঠে এ রকম বিশাল বপু স্কুলব্যাগ চাপিয়ে দেন। অথবা এও হতে পারে, রূপক অর্থে সংসারের বোঝা টানার অভ্যাসটা শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে ওই বয়সেই যাতে গড়ে ওঠে সে চেষ্টাই করছে কর্তৃপক্ষ। আর প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বইয়ের বোঝা চাপানোর প্রবণতাটা শহরের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতেই বেশি। ওই সব স্কুলের কর্তৃপক্ষ জানে, তাদের শিক্ষার্থীরা স্কুলের চৌকাঠ পার হয়ে এক হাইজাম্প দিয়ে চলে যাবে ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় ও-লেভেল এ-লেভেলের লেবেল কপালে লাগিয়ে। অতএব ক্লাস সেভেনেই তাদের পড়তে দাও জর্জ অরওয়েলের এনিম্যাল ফার্ম! তা না হলে বিদেশে গিয়ে তো সে একটা আনস্মার্ট গেঁয়ো ভূত হিসেবে ধরা খাবে। সাধু। তবে আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করব, লেখাপড়ার এহেন ওভারডোজ সম্বন্ধে চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা কী বলেন জেনে নিতে। পরম পরিতাপের বিষয় এসব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অনেকগুলোতেই বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি ব্যাপারে দেখানো হয় চরম ঔদাসীন্য, কখনও কখনও অবহেলা, অবজ্ঞা।

আর জিপিএ-৫ নামক ‘বেহেশতি মেওয়াটি’র প্রতি শিশুমনে যে দুর্নিবার আকর্ষণ সৃষ্টি করা হচ্ছে আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, এটা কি অনন্ত স্বর্গবাস, না স্বর্গ হতে বিদায়ের ঘণ্টা বাজাচ্ছে তাও একটু ভেবে দেখা দরকার। যে শিশুটি জিপিএ-৫ পাচ্ছে, সে খুশিতে হাওয়ায় উড়ছে মানলাম; কিন্তু যে পাচ্ছে না সে স্কুলে, বাড়িতে, পাড়ায়, মহল্লায় মুখ দেখাবে কী করে? ওই বয়সে যে ব্যর্থতার গ্লানি ও হীনম্মন্যতা তার মনে ছায়াপাত করবে, তার প্রভাব কি সুদূরপ্রসারী হবে না? আমি বলি কি, ওই বয়সে ওই সব জিপিএ-৫ এবং প্লাস-মাইনাস-টাইনাস পুরোপুরি তুলে দিয়ে সারা বছর শিক্ষার্থীটি মনোযোগসহকারে লেখাপড়া করছে কিনা সেটা দেখুন। তারপর ডিসেম্বর মাসের শেষভাগে রেজাল্ট ঘোষণা করে দিন : ‘তোমরা সবাই পাস করেছ। পহেলা জানুয়ারি তোমরা নতুন বই নিয়ে নতুন ক্লাসে বসবে।’ তারা কোন বিষয়ে কত পেয়েছে পরীক্ষায়, কে ফার্স্ট হয়েছে, কে সেকেন্ড হয়েছে এসব কিছু বলার দরকার নেই। অভিভাবককে রিপোর্ট কার্ডের মারফত শুধু জানানো যেতে পারে, আপনার পড়ুয়াটি অমুক বিষয়ে অনগ্রসর, অমুক বিষয়ে সে অনাগ্রহী ইত্যাদি। এতে আর কোনো হতাশা, হীনম্মন্যতা, কোনো অন্তর্জ্বালা, অসূয়া-বিদ্বেষ থাকবে না কারো মনে। ছেলেমেয়েরা আনন্দে হৈহৈ করে নতুন ক্লাসে যাবে, নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নতুন নতুন বিষয় শিখবে।

আসলে লেখাপড়ার উদ্দেশ্য কী? ভাল রেজাল্ট করা? নাকি জ্ঞান অর্জন করা? জিপিএ-৫ না পেলে, ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড না হলে কি জ্ঞানী হওয়া যায় না? তাহলে আইনস্টাইন, শেকসপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল—এঁদের তো নামই শোনা যেত না। আর যে বিদ্যা শিক্ষায় আনন্দ নেই সেটাতে শিশুরা মনোনিবেশ করবে কেন? একটি শিশু হয়তো ক্লাসের পাঠ্যবই পড়তে চায় না, কারণ ওটাতে সে আনন্দ পায় না। অথচ তার মনের মত গল্পের বই পেলে নাওয়া-খাওয়া ভুলে ওটা সে গোগ্রাসে গিলতে থাকে। আর পরীক্ষা নামক বিভীষিকার চিন্তায় তো তার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়। তার অভিভাবকদেরও হয় একই দশা। ‘রহমান সাহেবের ছেলে তিনটা প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ে, দুইটা কোচিং-এ যায়। আর তোমার ছেলেকে তুমি একটা মাস্টারও দিতে পারলে না। তুমি কী?’ গৃহিণীর মুখ ঝামটা হজম করে বেচারা স্বামী নামক আসামী ঘুস-ঘাস যা পান তাই খেয়ে মাস্টার জোগাড় করেন, কোচিং-এ পাঠান ছেলেকে। আর এভাবে দেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করে কোচিং-বৃক্ষ নামক বিষবৃক্ষের চাষ।

আমাদের আবার নতুন নতুন আইডিয়ার অভাব নেই। সম্প্রতি স্কুল-পড়ুয়াদের জন্য ‘সৃজনশীল’ নামক একটি অভিনব পাঠদান-পরীক্ষাদান পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর ভাল-মন্দ সম্বন্ধে আমি বিশেষজ্ঞ, অর্থাৎ বিশেষভাবে অজ্ঞ, তাই কিছু বলার হক নেই আমার। তবে পত্র-পত্রিকায় দেখলাম এবং ওয়াকিবহাল মহলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বুঝলাম, আমাদের স্কুলগুলোতে এই পদ্ধতিতে পাঠদানের ও প্রশ্নপত্র তৈরী করার যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের বড়ই আকাল। কর্তৃপক্ষ এই সমস্যার মোকাবিলা করতে নাকি একেকটি স্কুলে একজন বা দু’জন সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে বলেছে, যাঁরা অন্য সহকর্মীদের শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবেন। শুনে আমার মনে হয়েছে, কর্তৃপক্ষের এই ব্যবস্থাপত্র বাস্তবতাবিবর্জিত। যে শিক্ষক নিজে হয়তো সামান্য কিছু জ্ঞানলাভ করেছেন একটি নতুন পদ্ধতি সম্বন্ধে, তিনি আবার ‘ট্রেনার’ হয়ে যাবেন রাতারাতি অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য, এটা ভাবাটা বোধ হয় একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। তার চেয়ে কি আগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘সৃজনশীল’ নামক গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিটি চালু করা উচিত ছিল না? এত দিন যখন ছেলেমেয়েরা ‘অসৃজনশীল’ হয়ে লেখাপড়া করতে পেরেছে, তখন না হয় ‘আর ক’টা দিন সবুর কর, রসুন বুনেছি’ বলে চালিয়ে যেতেন। এখন তো ব্যাপারটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার মত হয়ে গেছে মনে হয়।

২.

পত্রিকায় দেখলাম, সরকার শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি প্রদান বন্ধ করার লক্ষ্যে কড়া নির্দেশ জারি করছে সব স্কুলে স্কুলে। শিক্ষার্থীদের মারধর করা যাবে না মর্মে নোটিশ লিখে প্রত্যেক স্কুলে টাঙ্গিয়ে দেয়া হবে, যাতে করে মারকুটে শিক্ষক-শিক্ষিকারা সতর্ক থাকেন। অভিভাবকরাও আশ্বস্ত থাকেন, তাঁদের বাচ্চাটা অক্ষত দেহে ফিরে আসবে স্কুল থেকে। এ ধরনের পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এর আগে হাইকোর্টের রায়েও এ মর্মে নির্দেশনা ছিল, যা অনেক স্কুলেই প্রতিপালিত হয়নি। এবারও এমনটি যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ রেখে নিয়মিত পরিদর্শন-পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। আর শিশুর ওপর এই দৈহিক নির্যাতন রোধের পাশাপাশি তার মনোজগতে যাতে ভয়ভীতি, হতাশা, পলায়নপরতা স্থায়ীভাবে বাসা না বাঁধে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। সে জন্য শুধু পাঠদান পদ্ধতিই নয়, পাঠ্যক্রম (সিলেবাস) ও মেধা যাচাই পদ্ধতি—অর্থাৎ পরীক্ষা গ্রহণের বর্তমান সিস্টেমও আগাগোড়া পর্যালোচনা করা দরকার। শিশুটি যা শিখবে তা কতটুকু জীবননিষ্ঠ, সে কি বিষয়টি শিখতে আনন্দলাভ করছে, নাকি তার কাছে নিমপাতার মতো তেতো লাগছে বিষয়টি, সে কি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত, অবসন্ন বোধ করছে, না উৎসাহের সঙ্গে আগ্রহভরে গ্রহণ করছে শিক্ষা কার্যক্রম—এসব কিছু খতিয়ে দেখা দরকার। বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে অবশ্যই শিশুটিকে অনেক কিছু জানতে হবে, যা তার পিতা-পিতামহরা কল্পনাই করতে পারতেন না। এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি সে যেন অতিমাত্রায় যন্ত্রনির্ভর না হয়ে পড়ে, সেটাও লক্ষ রাখতে হবে। মোট কথা, যুগোপযোগী শিক্ষাদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষার পরিবেশ ইত্যাদি সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক শিক্ষাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর এখনই সময় বলে আমরা মনে করি।

এই নিবন্ধের এক জায়গায় প্রসঙ্গক্রমে প্রশ্নপত্রে এমসিকিউ পদ্ধতি ব্যবহারের উল্লেখ করেছি। এই বৈচিত্র্যময়, আধুনিক পদ্ধতি প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। গল্পটি বেশ পুরনো এবং অনেকেরই জানা। নীরস বিষয়ের ওপর আজকের এই আলোচনা সেই গল্পটি দিয়ে শেষ করা যাক।

নাতি ভারতবর্ষের ইতিহাস পরীক্ষায় কত পেয়েছে জানতে চাইলেন নানা। নাতি বলল, ৯৫। নানা বললেন, ১০০-তে ৯৫, সে তো অনেক নম্বর রে। তা বল তো, সম্রাট আকবরের বাবার নাম কী? নাতি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, এভাবে প্রশ্ন করলে তো হবে না, নানা। তোমাকে কয়েকটা নাম বলে জানতে চাইতে হবে আকবরের বাবার নাম কী। শুনে নানার তো আক্কেল গুড়ুম। ইতিহাসে ১০০-তে প্রায় ১০০ পাওয়া তাঁর নাতি কিনা জানে না আকবর বাদশাহর বাবার নাম কী। তিনি একটু চটিত হয়ে আরেকটা প্রশ্ন করলেন নাতিকে একটু খোঁচা দিয়ে : ঠিক আছে, মানলাম তোর কথা। তা তোর নিজের বাবার নাম, দাদার নাম কী বল তো। ‘বললাম তো, এভাবে প্রশ্ন করলে হবে না, নানা। তুমি কয়েকটা নাম বলে আমাকে ‘চয়েস’ দিতে হবে। এটাই আজকালকার এমসিকিউ বা মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন পদ্ধতি। বুঝলে নানাভাই ?’

 লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com

মন্তব্য