ভোটে আগ্রহ কোথায়-331516 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০১৬। ১৬ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৮ জিলহজ ১৪৩৭

এপার-ওপার

ভোটে আগ্রহ কোথায়

অমিত বসু

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নিজেকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন জওহরলাল নেহরু। প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় ১৯৩৭ সালের নভেম্বরে। লেখায় দিল্লি লড়েছিল। চানক্য নামে লিখেছিলেন বলে তাঁকে চেনা যায়নি। লেখককে নেহরুর চরম এক শত্রু মনে করে খুঁজে বের করার চেষ্টা হয়েছিল। কারণ লেখায় নেহরু-বিরোধিতা ছিল তীব্র। বলা হয়েছিল, নেহরুর কোনোভাবেই বারবার তিনবার রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত নয়। তাতে দেশের শুধু নয়, তাঁর নিজেরও ক্ষতি। তখন কংগ্রেস সভাপতিকে রাষ্ট্রপতি বলা হতো। নেহরুকে তৃতীয়বার রাষ্ট্রপতি করতে কংগ্রেসে কোথাও আপত্তি ছিল না। বেঁকে বসেছিলেন নেহরু নিজেই। তাঁর যুক্তি ছিল কেউ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ক্ষয় শুরু হয়। তাঁকে নিয়ে যে ক্ষমতায়ন হয় সেটা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা মানুষের পক্ষে কল্যাণকর নয়। নেতা নিজেকে অপরিহার্য মনে করলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী।

নেহরু আমৃত্যু ক্ষমতায় ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রের ওপরে উঠে স্বৈরতন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করেননি। রাজনীতির ভুল শোধরানোর চেষ্টা করেছেন বুদ্ধিমত্তায়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যের। সহকর্মীদের সঙ্গে মনোমালিন্য দূর করেছেন সহিষ্ণুতায়। মাতব্বরি করে চারপাশের লোককে উড়িয়ে দিতে চাননি। কখনোই বোঝাতে চাননি, তিনি ছাড়া দেশ বা দল অচল।

নেহরু তনয়া ইন্দিরা গান্ধী সেটা পারেননি। তাঁর কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রকাশ পেয়েছে স্বৈরতন্ত্র। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করে প্রকাশ করতে চেয়েছেন ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া’।

ইন্দিরা ডানা বিস্তার করেছিলেন বিরোধীদের দুর্বলতায়। তাদের অন্তঃকলহ ইন্দিরাকে সাহসী করেছিল। ইন্দিরা বুদ্ধির চেয়ে অ্যাকশনে জোর দিয়েছিলেন। তাঁর ছায়ায় ঢাকা পড়েছিল গণতন্ত্র। ইন্দিরার পর আর কেউই তেমনটা করতে পারেননি। অন্য কোথাও প্রধানমন্ত্রীর সে জোরও ছিল না। কংগ্রেসের একাধিপত্য আর থাকেনি। ১৯৮০ সালে বিজেপির জন্মের পর জাতীয় দলের সংখ্যা হয় দুই।

বিজেপি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অটল বিহারি বাজপেয়ি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। গণতন্ত্র রক্ষায় ছিলেন অক্লান্ত। তাঁর ক্ষমতা ছিল সীমাবদ্ধ। তাঁকে জোট সরকার চালাতে হয়েছে। শরিক দলের স্বার্থ অস্বীকার করতে পারেননি। নরেন্দ্র মোদির বেলায় ব্যতিক্রম। তিনি এলডিএর প্রধানমন্ত্রী হলেও তাঁর দল বিজেপি একাই এক শ। এর আগে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। মোদি রাষ্ট্রের ওপর উঠতে চাননি। জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে সবাইকে নিয়ে চলতে চাইছেন। বিরোধীদেরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর দলে বিভাজন আছে। মোদি লাইনে সবার সম্মতি নেই।

মাত্র দেড় বছরের রাজত্বে মোদির সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। একটা টার্ম কাটালে বোঝা যাবে তিনি কোন পথের পথিক। আপাতত বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি প্রভাব বাড়াতে ব্যস্ত। বিহারের পর বাংলাকে ধরেছেন। প্রচারে কী বলবেন তিনি। বিজেপি ভালো আর সবাই খারাপ। বললেও, এমন একটা সরল ভাবনা লোকে কি মানবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, সিপিএমের মতোই তিনি বিজেপিকে রুখবেন।

বিধানসভা নির্বাচনের বাকি এখনো দুই মাস। তার আগেই লড়াই শুরু হয়ে গেছে। রাজ্যে সবচেয়ে জোরদার সংগঠন এখন তৃণমূলেরই। শাসক দল হিসেবে বাড়তি সুযোগ তারা পাচ্ছে। দ্বিতীয় স্থানে সিপিএম। বিজেপি তৃতীয়। শুরুতে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির লড়াই বেশ জমেছিল। বিজেপির পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছিল। জনপ্রিয়তার গ্যাস বেলুনটা হঠাৎই চুপসেছে। রাজ্যে বিজেপির সংগঠন বাড়েনি। উল্টো মোদির জনপ্রিয়তা কমায় বিজেপি দুর্বল। বিজেপিকে দমাতে মমতার বেগ পাওয়ার কথা নয়।

নুয়ে পড়া সিপিএম মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। নবান্ন অভিযান থেকে শুরু করে মিছিল-মিটিংয়ের বিভিন্ন ধারার আন্দোলনের তেজ কিছুটা বেড়েছে। শিলিগুড়ি দখল করার পর আশার আলো দেখেছে। সেটা এমন কিছু নয়। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে তারা অনেক দূরে দাঁড়িয়ে। সব থেকে জবুথবু হয়ে আছে কংগ্রেস। অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে দলটা বেতাল। মমতার মতো অ্যাকশনের রাজনীতি করতে চেয়েও পারছেন না। কংগ্রেসের নবান্ন অভিযান ছিল হাস্যকর। দলের রাজ্য সভাপতি হয়েও অধীর অন্য নেতাদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে পারেননি। অনেক নেতাই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে গেছেন। অধীর ক্রমেই একা। দলের অন্য নেতারা বিরূপ।

মুকুল রায় এখনো তৃণমূলের সংসদ সদস্য। তবু তিনি দলে থেকেও নেই। সাধারণ সম্পাদকের পদটা যাওয়ার পর অসহায়। হাতে চাবুক আছে, ঘোড়া নেই। কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী তাঁকে কংগ্রেসে চাইছেন। বিজেপি তাঁকে গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। মুকুল নতুন দল গড়লেও অন্য বড় দলের সাহায্য তাঁকে নিতে হবেই।

সব দলই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করেছে। সবাই চাইছে প্রভাব বাড়াতে। মানুষকে কাছে টানতে। মানুষের কিন্তু আগ্রহ নেই। বরং কিছুটা সদ্ভাব আছে। নির্বাচন মানেই সংঘাত। মারামারি, কাটাকাটি, খুন, জখম। এমনটা অন্য কোনো রাজ্যে হয় না। অধিকাংশ রাজ্যে পাঁচ বছর অন্তর পালাবদল হয়। যেখানে জাতীয় দল ক্ষমতায় সেখানে তো এটা নিশ্চিত। কোনো দল কখনোই একনাগাড়ে মানুষের প্রতি সুবিচার করতে পারে না। ক্ষমতা তাদের ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। ক্ষমতায় থাকার লোভে মানুষের দায় অস্বীকার করে। অবিচার অস্বস্তির কারণ হয়।

ভোটের জটিলতা মানুষের অসহ্য। ইউরোপের মতো লিবারেল ডেমোক্রেসি তাদের পছন্দ। হেডিং, পোস্টার, কাটআউট নয়। উগ্র প্রচারের দরকার নেই। সংগঠনের অসভ্যতা থেকে রেহাই। পরিচ্ছন্ন নির্বাচনে ভোট, ভোট নিয়ে কোনো অভিযোগ নয়। এক শ ভাগ নির্বাচনী স্বচ্ছতা। এটা এখানে নেই বলেই ভোটের আগ্রহ কমছে।

লেখক : কলকাতার সাংবাদিক

মন্তব্য