একজন যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ চেতনার-331512 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


সাদাকালো

একজন যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ চেতনার মানুষ

আহমদ রফিক

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একজন যুক্তিবাদী ও নিরপেক্ষ চেতনার মানুষ

চলে গেলেন প্রথিতযশা ব্যাংকার, কূটনীতিক, সর্বোপরি একজন মননশীল লেখক। তাঁর শেষোক্ত পরিচয় চাপা পড়ে থাকল বাস্তবের কর্মময় জীবনের আড়ালে। এই তো মাস কয়েক আগে তাঁর ঢাকায় আসা সবার সঙ্গে শেষ দেখা সেরে নিতে। ‘শেষ দেখা’ কথাটা তাঁরই। হয়তো ভেতর থেকে ঘণ্টাধ্বনি শুনছিলেন, তাই আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাতের তাড়না অনুভব।

বয়স যদিও ৯১, তবু হঠাৎ করে এই যাওয়া কিছুটা অভাবিতই। তাই আত্মীয় বা বন্ধু মহলে শোক গভীর মাত্রায়। যদিও ছাত্রজীবনে মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পরবর্তী জীবনে সে আদর্শকে যুক্তিতর্কের নমনীয়তায় ধারণ করেছেন তবু যৌবনে, কর্মজীবনে ‘ওয়াশিংটন ডিসি’ নিয়ে তাঁর এক ধরনের মুগ্ধতা ছিল। সে জন্যই কি শেষ জীবনে ওই ডিসিই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী আবাস? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব জানা নেই।

তবে একথা ঠিক যে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেও রাজনৈতিক বিষয়াদিতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার যৌক্তিক পথ থেকে সরে আসেননি। এদিক থেকে নোয়াম চমস্কিদের যুক্তিবাদী ভূমিকা তাঁর কাছে সঠিক বলে মনে হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ক্ষেত্রে অন্ধ সমর্থন সঠিক বা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। ‘ব্যর্থ ঈশ্বর’ বা ‘নগ্ন ঈশ্বর’বিষয়ক পশ্চিমা প্রচারণা অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর মতো তাঁকেও নাড়া দিয়েছিল। বিষয়টা ছিল বিশ্বজনীন ভূকম্পনের মতোই, বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মহলে। সে কম্পন রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভুবনে আন্দোলন তৈরি করলেও মতাদর্শিক বিশ্বাসের মূল শিকড় উত্পাটিত হয়নি বলেই আমার বিশ্বাস। অন্তত তাঁর সঙ্গে মাস কয়েক আগে সর্বশেষ কথাবার্তায়ও তেমনই মনে হয়েছে।

দুই.

এতক্ষণ যাঁর সম্পর্কে কিছু লেখা, তাঁর নাম নাজিরুদ্দিন আহমদ, সংক্ষেপে কর্মভুবনে এ কে এন আহমদ নামে পরিচিত। কর্মজীবনের বিশেষ পরিচিতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, কূটনীতিক হিসেবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। অবশ্য একসময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল শীর্ষক সংস্থায় উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেছেন। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী ঘরানার আদর্শে নাম লিখিয়ে গোত্রান্তরিত হননি। এখানেই তাঁর ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্য।

নাজিরুদ্দিন আহমদের বাবা রেজায়ে রব্বানী চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মজীবন অতিবাহিত করলেও তিনি ও এ পরিবার তাদের পৈতৃক বাসস্থান শাহবাজপুর গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না, এমনকি নাজিরুদ্দিন আহমদও গ্রাম-সম্পর্কহীন ছিলেন না, ওয়াশিংটন ডিসি তাঁর স্থায়ী আবাস হওয়ার পরও। অর্থাৎ এ যোগাযোগটা বরাবরই অক্ষুণ্ন ছিল। পড়াশোনা কলকাতায় স্কুলে ও প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে উজ্জ্বল একগুচ্ছ মেধাবী বন্ধুবলয়। নাজমুদ্দিন হাশেম, চঞ্চল সরকার, শহীদুল্লা কায়সার ছাড়াও পরবর্তী সময়ে বন্ধুগোষ্ঠীতে মুনীর চৌধুরী, এমনকি অসম বয়সী শওকত ওসমান বা অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্রের মতো অনেকে।

মেধাবী ছাত্র নাজিরুদ্দিন আহমদ তাঁর মেধাবী পাঠাভ্যাস জীবনভর অব্যাহত রেখেছিলেন, মৃত্যুর অব্যবহতি আগেও। ফলে রাজনীতি, দর্শন বা বিজ্ঞানবিষয়ক বহু তাত্ত্বিক প্রশ্নের বিচার-বিশ্লেষণ নিয়ে সর্বদা ভাবিত পরিণত বয়সে পৌঁছেও এ কে এন আহমদ। প্রচণ্ড মননধর্মী অনুসন্ধিৎসা নিয়ে শুধুই পড়া এবং কিছু লেখা এই ধারায় তাঁর শেষ জীবনটা কেটেছে। তাঁর আত্মজৈবনিক রচনা জধহফড়স ঃযড়ঁমযঃং (বিক্ষিপ্ত ভাবনা) ও অমধরহংঃ ঃযব পঁত্ত্বহঃ (স্রোতের বিপরীতে) ছোটখাটো বই হলেও তাতে রয়েছে বেশ কিছু মৌল প্রশ্ন ও চিন্তার উপাদান। লিখেছেন বেশ কিছু কবিতাও। তবে প্রবন্ধই সর্বাধিক। তাঁর বিষয় যেমন বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক বিশ্বের সম্ভাবনা, তেমনি জীবন-মৃত্যু নিয়ে কিছু বিষণ্ন ভাবনা। কিছু কিছু বিষয় নিয়ে শওকত ওসমান বা অশোক মিত্রের সঙ্গে দীর্ঘ পত্রালাপ অনুধাবনযোগ্য, বিশেষভাবে উপভোগ্য শওকত ভাইয়ের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর কথকতা। সমাজতন্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আদর্শিক তোলপাড়, সে সম্পর্কে এ কে এন আহমদের অবশেষ বিচার নেতিবাচক নয়।

তাঁর পূর্বোক্ত বইয়ের বিচার ভাষ্য থেকেই বলা যায় : সমাজতন্ত্র নামক মতাদর্শের ন্যায়নীতি ও সাম্য ভাবনা এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বাপ্নিক চিন্তায় ভুল নেই। যত সমস্যা পদ্ধতি-আদর্শের বাস্তবায়ন নিয়ে। অন্যদিকে লক্ষ্য অর্জনের পর ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি বড় হয়ে দাঁড়ায়, কখনো বা বড় হয়ে ওঠে স্বাজাত্যভিমান, তখন আদর্শ পিছু হটে। রুশ-চীন দ্বন্দ্ব নিয়ে এমন ধারণা কারো কারো, একেবারে ভিন্ন নয় এ কে এন আহমদেরও।

সংগ্রামের সময়ের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সময়ের প্রভেদ তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যেখানে সমালোচনার উপাদান তৈরি হতে পারে। খ্যাতনামা জার্মান নাট্যকার ব্রেখটের একটি ছোট্ট বক্তব্য তুলে ধরে এমন সংশয় প্রকাশ করেছেন এ কে এন আহমদ। বিশ্বে সমাজবাদী আদর্শের পতন সন্দেহ নেই তাঁকে বিব্রত ও ব্যথিত করেছে। তা সত্ত্বেও তারুণ্যের আদর্শবাদ হয়তো চেতনা থেকে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি, তাই দীর্ঘদিন ডিসিবাসী হয়েও অন্ধ মার্কিনি সমর্থক হয়ে উঠতে পারেননি যুক্তিবাদী এ কে এন আহমদ।

মতাদর্শিক চেতনার সংকট এখন যেকোনো সৎ, যুক্তিনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবীর জন্য এক অপ্রিয় সত্য। কারো কারো মতো চৈতন্যের এ সংকট এ কে এন আহমদের মধ্যেও ছিল। বাড়তি একটি বিষয় তাঁর মধ্যে জীবনসায়াহ্নে এসে বাসা বেঁধেছিল। রাজনৈতিক সমস্যা-সংকট ও জীবন-মৃত্যুর সত্য সম্পর্কে মূল কথা না জেনে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া বড় বেদনার। বলেছেন কথাটা নানা উপলক্ষে।

শিক্ষাগত দিক থেকে অর্থনীতিবিদ হয়েও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে অনেক অবসর হাতে নিয়ে বিচিত্র বিষয়ের পাঠ ও জটিল ভাবনায় সময় কাটিয়ে গেছেন এ কে এন আহমদ। জীবন ও মনন, বিজ্ঞান ও দর্শন, মৃত্যু ও পরলোকের অস্তিত্ব এ জাতীয় বহু বিষয়ে জিজ্ঞাসা ও উত্তর না পাওয়ার হতাশাই সেখানে প্রধান হয়ে উঠেছিল।

তবু শেষ বিচারে রাবীন্দ্রিক পঙিক্তর এমন বিশ্বাস মনে সান্ত্বনা জোগায় : ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন’ যে কথা তাঁর নিকটজন শওকত ওসমানের জন্যও ছিল সত্য। তা না হলে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। আত্মানুসন্ধান ও সব দার্শনিক প্রশ্নের যুক্তিনিষ্ঠ বিচার এ দুজনেরই ছিল প্রিয় বিষয়। তাঁদের পত্রালাপেও তা কিছুটা বোঝা যায়। বাকিটা বোঝা যায় এ কে এন আহমদের মূল বই দুটির পাঠে। তাঁর ভাষায় ‘জধহফড়স ঞযড়ঁমযঃং’ তাঁর জীবনভাষ্যের রূপরেখার দলিল।

এ বইটি তাঁর বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। এতে রয়েছে তাঁর জীবনভাবনার ও কর্মজীবনের নানা সমস্যা-সংকটের ভাষ্য, সার্বিক রাজনীতির সর্বশেষ প্রেক্ষাপটের বিচার-বিশ্লেষণ, তেমনি আত্ম-অনুসন্ধানের পাশাপাশি একান্ত বন্ধুজন সম্পর্কে দু-চার কথা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সাংবাদিক এস এম আলী, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, রাজনীতিবিদ শহীদুল্লা কায়সার, সাংবাদিক-কূটনীতিক নাজমুদ্দীন হাশেম, অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্রের মতো জনাকয় মানুষ।

তবে ডায়েরিসম এ বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমার বিবেচনায় ১৯৭২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সংঘটিত বিচিত্র সব ঘটনা, মতাদর্শ ও ব্যক্তিকে নিয়ে প্রকাশিত মতামত, যা রাজনৈতিক বিচারেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কিছুটা হলেও তাঁর ভাবনার যথার্থ ছায়াপাত ঘটেছে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও বাস্তব সত্য নিয়ে তাঁর প্রকৃত মতামত। তা ছাড়া একাত্তরের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ের স্বদেশ সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত ভাবনা। সেই সঙ্গে রয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধের দুই নায়ক সম্পর্কে কিছু মন্তব্য।

বর্তমানকালের বুদ্ধিবৃত্তিক বিচারে সচেতন ও যুক্তিবাদী মানুষ যে আদর্শিক বিচারে সংকট তাড়িত—এ সত্যটাও উঠে এসেছে বইটিতে। সে ক্ষেত্রে জীবন বিশ্লেষণের পাশাপাশি মৃত্যুকে নিয়েও রয়েছে বিচার। কবি জন প্যানথারের উদ্ধৃতি টেনে এ কে এন আহমদের মন্তব্য : ‘মৃত্যু মহিমান্বিত হোক/আমাদের মৃত্যু বেঁচে থাকার জন্য।’ শেষ জীবনে মৃত্যুচিন্তা কি তাঁর মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছিল স্বনামখ্যাত কোনো কোনো ব্যক্তির মতো? হয়তো বা।

তারুণ্যে-যৌবনে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণেই বোধ হয় জীবনভর তাঁর ভাবনায় বা লেখায় রাজনীতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ বিচার প্রাধান্য পেয়েছে। এবং তা স্বদেশ-বিদেশ নিয়ে। আর অর্থনীতিবিদ হওয়ার কারণে কমপ্রেডর পুঁজিবাদী ও সুবিধাভোগীদের পাশাপাশি সামরিক-বেসামরিক রাজনীতিকদের সম্পর্কে রয়েছে তাঁর যুক্তিবাদী মতামত। সেখানে রয়েছে সিপাহি অভ্যুত্থান, কর্নেল আবু তাহের, এ বাংলায় ভারতবিদ্বেষ, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক ইত্যাদি বহু বিষয় নিয়ে তাত্পর্যপূর্ণ মন্তব্য। বাদ যায়নি গর্বাচেভ প্রসঙ্গ, রুশনীতির ভুলত্রুটি, ভোগবাদী মার্কিন সমাজ প্রসঙ্গ। সংক্ষিপ্ত কথায় সব বিষয় তুলে আনা অসম্ভব। তবে শেষ কথায় বলতে হয়, শেষ বিচারে সমাজতন্ত্রকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি। আর মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে তাঁর সমালোচনা ছিল সুস্পষ্ট। আইএমএফের উপদেষ্টা হয়েও বিশ্বব্যাংক ও ম্যাকনামারার সমালোচনায় দ্বিধা ছিল না এ কে এন আহমদের। তাঁর বই দুটি বিশেষভাবে পাঠযোগ্য মনে করি।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য