kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কেমন হবে ট্রাম্পের আমেরিকা?

স্কট কনরয়

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কেমন হবে ট্রাম্পের আমেরিকা?

শুক্রবার টেক্সাসের এক নির্বাচনী শোভযাত্রায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বক্তৃতা দিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অবাস্তব অভিযোগ, চাপাবাজি সবই যখন সমানে চলছিল, জনতার কাতার থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক নারী।

তাঁর হয়তো মনে হয়েছিল, অনেক হয়েছে। আর না। চিৎকার করে বললেন, ‘এ-জাতীয় ননসেন্স কথা বলা থামান ডোনাল্ড। বরং আমাদের জানান আপনি কী করতে যাচ্ছেন?’ চারপাশে মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু হয়েছে। ওই নারী সবাইকে বললেন, তিনি ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ নন, সমর্থক। ট্রাম্প রিপাবলিকান দল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে চাইছেন। তাই তাঁর মুখ থেকে নির্জলা, নির্মেদ কিছু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শুনতে চান। ওদিকে তখনো ট্রাম্প রাজা-উজির মেরেই যাচ্ছেন। ওই নারী হতাশ হয়ে পড়েন। এমন হতাশ আরো অনেকেই টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত সেই সভা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই নারীও তাঁদের সঙ্গে সভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।

ট্রাম্পকে নিয়ে এমন ক্ষোভ, হতাশা ওই নারীর একার নয়। গত জুনে মনোনয়ন জেতার ম্যারাথনে নামার পর থেকেই ট্রাম্প কখনো ফাঁপা বুলি, কখনো বা বেফাঁস কথা বলে মার্কিনিদের ভ্রু কুঁচকে দিচ্ছেন। ট্রাম্প অঙ্গীকারের খই ফোটাচ্ছেন; কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন কিভাবে করবেন কিছু বলছেন না। ট্রাম্প বলছেন, তিনি ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) হারাবেন। কিভাবে? তিনি ‘বোমা মেরে তাদের বর্জ্যও পেট থেকে বের করে ফেলবেন’। ট্রাম্প জোর গলায় বলছেন, ওবামা কেয়ার বাতিল করা হবে। কিন্তু এর বদলে তিনি কী দেবেন? এমন কিছু যা ‘আরো ভালো’। ট্রাম্প গলা ফুলিয়ে বলছেন, মেক্সিকো সীমান্তে দীর্ঘ, সু্ন্দর এক সীমান্ত দেয়াল গড়া হবে। কিন্তু মেক্সিকো সরকারকে কিভাবে তিনি খরচ নির্বাহে বাধ্য করবেন? তিনি তাদের বলবেন—পয়সা দাও। এই হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের কাটো ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট জন স্যাম্পলস বলছিলেন, ‘ট্রাম্পকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, তাঁর সব কথাই ভাসাভাসা। কোনো গভীরতা নেই। দায়িত্ব না নিয়ে একেকবার একেক কথা বলে যাচ্ছেন। তাই তাঁর পরিকল্পনা শেষমেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, আপনি জানতেই পারছেন না। ’ ট্রাম্পের দেওয়া আশ্বাসগুলো কতখানি বাস্তবসম্মত বা বাস্তবায়নযোগ্য তা অনুমান করা কঠিন হতেই পারে। তবে এই অনুমান করা সহজ যে যেই মুহূর্তে তিনি বাইবেলের ওপর হাত রাখবেন, এই বিশ্বটি হয়ে উঠবে এক কঠিন জায়গা। একের পর এক তিনি এমন কথা বলছেন যে শুনে মানুষ আহত হচ্ছে। যেমন মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না—বলে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েই ক্ষোভ উসকে দিয়েছেন।

ট্রাম্প আচরণে এও বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠবেন, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে দ্বিধা করবেন না, কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করার নতুন কিছু কৌশল তিনি উদ্ভাবন করবেন এবং সর্বোপরি আদালতের ভূমিকার প্রতিও তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবেন।

ফোর্ট ওয়ার্থে নির্বাচনী সভায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ট্রাম্প কী বলেছেন শুধু সেটুকুই শুনুন!

‘আমি আমাদের মানহানিসংক্রান্ত আইনগুলোকে সক্রিয় করব। যখনই সাংবাদিকরা ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচক, ভয়ংকর ও মিথ্যা সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে তখন আমরা তাদের নামে মামলা ঠুকে দিতে পারব। এভাবে আমরা প্রচুর অর্থও আয় করতে পারব। যেমন ধরুন, নিউ ইয়র্ক টাইমস একটা প্রতিবেদন ছেপে সাড়া ফেলে দিল। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অন্যের সম্মানহানিও তো তারা করছে। অথবা ওয়াশিংটন পোস্ট যে প্রতিবেদন ছাপছে, তার পেছনে অন্য উদ্দেশ্যও তো থাকে। এখন তো সাংবাদিকদের নামে মামলা করে জেতা যাবে না। কারণ তারা আইনিবলে পুরো সুরক্ষিত। আমরা এই প্রতিরক্ষার জায়গাটিতে আঘাত হানতে চাই। ’

এই মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে চাইলে ট্রাম্পকে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে হবে। এই সর্বোচ্চ আদালতই ১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস বনাম সুলিভান মামলায় এই সুরক্ষা দেয় যে সাংবাদিকরা প্রয়োজনে জননেতার বিরুদ্ধেও লিখতে পারবেন, পাল্টা আইনি ব্যবস্থার দানব তাঁদের তাড়া করবে না।

আর ট্রাম্প যদি তাঁর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকারের লোকজনকে রাজি করাতে ব্যর্থ হন? এ হবে সেই সময় যখন সত্যিকারের জাতীয় সমস্যা শুরু হবে।

এরই মধ্যে অস্থিরতার আলামত ধরা পড়ছে। সাবেক এনএসএ ও সিআইএর প্রধান মাইকেল হেইডেন গত শুক্রবার বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি তাঁর ইচ্ছামতো সন্ত্রাসীদের পরিবারের সদস্যদেরও হত্যা করার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে উদ্যত হন, মার্কিন সেনাবাহিনী তা ‘মানতে অস্বীকৃতি জানাবে’। হেইডেন ‘রিয়েল টাইম উইথ বিল মাহের’ অনুষ্ঠানে আলোচনা করতে গিয়ে আরো বলেন, ‘বেআইনি কোনো আদেশ আপনি মানবেন না, এটাই নিয়ম। সন্ত্রাসীদের স্বজনদের হত্যা করা মানে সব আন্তর্জাতিক আইনকানুনের প্রতিও বুড়ো আঙুল দেখানো। ’

হোয়াইট হাউস ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সাংবিধানিক বিরোধের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ধরে নিচ্ছি ট্রাম্প তা এড়াতে সক্ষম হবেন। কিন্তু তিনি কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের প্রতি নিজের দুর্বলতার বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে যথেষ্ট চেষ্টা করেননি। ট্রাম্প এমন এক ব্যক্তি তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। বলেছেন, পুতিনের দৃঢ়, স্বাধীনচেতা নেতৃত্বের কোনো জুড়ি হয় না। কোনো বিষয়ে কংগ্রেস বেঁকে বসলে ট্রাম্প হাল ছাড়বেন না—এ বিষয়ও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। নর্থ আফ্রিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট প্রসঙ্গটি এখানে টানা যায়। ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে নাফটার বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে হয় সমঝোতা করব, নয় গুঁড়িয়ে দেব। ’ সমস্যা হচ্ছে, ট্রাম্পের এসব উদ্ভট ভাবনার সমর্থকেরও অভাব নেই। তাঁদের বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ট্রাম্প নেতৃত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিকই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।

 

লেখক : সিনিয়র পলিটিক্যাল রিপোর্টার,

হাফিংটন পোস্ট, লিখেছেন নিজ কাগজে

ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস


মন্তব্য