‘উই ক্যান নট লেট ইট গো আনচ্যালেঞ্জড’-330644 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


‘উই ক্যান নট লেট ইট গো আনচ্যালেঞ্জড’

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘উই ক্যান নট লেট ইট গো আনচ্যালেঞ্জড’

হোটেল পূর্বাণী। ১৯৭১ সাল।

নবনির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সদস্য হিসেবে আমাদের জানানো হয়েছিল সকাল ১০টায় পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক হবে। নবীন এমএনএ হিসেবে সেদিন গভীর আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু একটু দেরিতে এলেন। গম্ভীর। বিক্ষুব্ধ। সভার কাজ শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু বললেন, সামরিক জান্তা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করছে। আমাদের তা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বললেন, শাসনতন্ত্র রচনার কাজে আমরা হাত দিয়েছি। ছয় দফা এখন আমার বা আপনাদের সম্পত্তি নয়। এটা জনগণের। আমরা তা কোনোক্রমেই বদলাতে পারি না।

২.

২২ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান তাঁর বেসামরিক উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দিলেন। তিনি জেনারেলদের নিয়ে ওয়ার কাউন্সিল গঠন করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস জি এম পীরজাদা পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আহসানকে টেলিফোনে বললেন, ৩ মার্চের আহৃত পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। পীরজাদার ইচ্ছানুসারে সন্ধ্যা ৭টায় গভর্নর হাউসে ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে প্রেসিডেন্টের ইচ্ছার কথা অবহিত করলেন। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, “আশ্চর্যের বিষয় শেখ মুজিব কোনো উদ্বেগই প্রকাশ করলেন না বরং যুক্তি সহকারে বললেন, মার্চে অধিবেশন পুনঃ আহ্বান করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এপ্রিল হলে বড্ড অসুবিধা হবে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিষদ স্থগিত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ওই দিন সন্ধ্যায় শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়া রাওয়ালপিন্ডিকে জানানো হয় এবং বলা হয়, এই ঘোষণায় যেন পার্লামেন্ট বসানোর নতুন তারিখ থাকে। এর জবাবে রাওয়ালপিন্ডি ঠাণ্ডাভাবে শুধু বলে পাঠায়, ‘ইওর মেসেজ ফুললি আন্ডারস্টুড।’”

৩.

এক গভীর ষড়যন্ত্রের আবর্তে সেদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবর্তিত হয়েছিল তারই প্রমাণ প্রেসিডেন্টের ১ মার্চের ভাষণ। এই ভাষণের পর বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আপনারা সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নামে প্রচারিত বিবৃতি শুনেছেন। সাধারণত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষণ তাঁর কণ্ঠেই শোনার কথা। অথচ এ ক্ষেত্রে বিবৃতিটি অন্য কারো কণ্ঠে প্রচারিত হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সব এমএনএ এখন ঢাকায়। এই মুহূর্তে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আমি আগে থেকেই বলেছি, ষড়যন্ত্র চলছে। এই ঘোষণা এক সুদীর্ঘ ষড়যন্ত্রেরই ফল এবং আমরা এর কঠোর নিন্দা ও প্রতিবাদ না করে পারি না। একটি সংখ্যালঘু দলের একগুঁয়েমি দাবির ফলে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি ঘোষিত হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে, তাই আমরা একে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দিতে পারি না। এর প্রতিবাদে কাল মঙ্গলবার ঢাকায় ও পরশু সারা দেশে সাধারণ হরতাল পালিত হবে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমি শিগগিরই মওলানা ভাসানী, জনাব নূরুল আমিন, প্রফেসর মুজাফফর আহমদ ও জনাব আতাউর রহমান খানের সঙ্গে আলোচনা করব। আগামী ৭ মার্চ রেসকোর্সে এক গণসমাবেশে বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে শাসনতন্ত্র রচনা করার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের। সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ভুট্টোর দল ব্যতীত প্রায় সব দলের এমএনএরা ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু জনাব ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য পরিষদ সদস্যকে হুমকি দিয়েছেন। তিনি আইন নিজ হাতে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে তো আইন প্রয়োগ হচ্ছে না? তবে কি আইন সব দরিদ্র বাঙালিদের জন্য?’

তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘বাঙালিদের আর কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা ন্যায় ও সত্যের জন্য সংগ্রাম করছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। জনগণ ছয় দফার পক্ষে রায় দিয়েছে। দাবি আদায়ের জন্য এগিয়ে গেলে যদি কেউ আমাদের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে তার পরিণতির জন্য তারাই দায়ী থাকবে।’

৪.

সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার সম্পর্কে শেখ মুজিব পূর্বেই অবগত ছিলেন বলে তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া প্রকাশের জন্য বেশ সময় পেয়েছিলেন। ঘোষণার আধা ঘণ্টার মধ্যে ক্রুদ্ধ জনতা বাঁশের লাঠি, লোহার রড ও আপত্তিকর স্লোগানে রাস্তায় নেমে আসে। স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলার প্যান্ডেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। হাজার ছাত্র-জনতা পূর্বাণীর দিকে ছুটে আসে। স্লোগান ছিল ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। সারা বাংলাদেশ গর্জে উঠল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এ পরিস্থিতিতে হোটেল পূর্বাণীতে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আরো ঘোষণা করেন, ‘উই ক্যান নট লেট ইট গো আনচ্যালেঞ্জড।’ তিনি ২ মার্চ ঢাকায় পূর্ণ হরতাল ও ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেন। এবং সরকারকে চিন্তা করার জন্য তিন দিনের সময় প্রদান করে বঙ্গবন্ধু বলেন, আগামী ৭ মার্চ তিনি জনসভায় তাঁর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।

৫.

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ‘ষড়যন্ত্রবিষয়ক’ কথিত ধারণায় বদ্ধমূল হলেন। এ প্রসঙ্গে আসগর খানের বক্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একান্ত এক আলোচনায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কী রূপ নেবে ও অচলাবস্থার অবসান কিভাবে সম্ভব? উত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সহজ। ইয়াহিয়া খান প্রথম ঢাকা আসবেন, এম এম আহমদ (প্ল্যানিং কমিশনের প্রধান) তাঁকে অনুসরণ করবেন। ভুট্টো আসবেন তারপর। ইয়াহিয়া খান সামরিক অভিযানের আদেশ দেবেন এবং তার পরই পাকিস্তানের শেষ। এই সুযোগে কৌশলী বঙ্গবন্ধু দৃঢ় পদক্ষেপে স্বাধীনতার লক্ষ্যে এগিয়ে গেলেন।

 

লেখক : বাহাত্তরের সংবিধান প্রণেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী

মন্তব্য