৪৫ বছরের স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে-330643 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


কালান্তরের কড়চা

৪৫ বছরের স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে এবং কী দেয়নি?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



৪৫ বছরের স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে এবং কী দেয়নি?

আজ ১ মার্চ। আমাদের স্বাধীনতার মাসের প্রথম দিন। ৪৫ বছর আগে আমরা স্বাধীন হয়েছি। সুতরাং বলা চলে আমাদের স্বাধীনতা এখন বয়ঃপ্রাপ্ত। এই স্বাধীনতার ভালোমন্দ, আমাদের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির একটা হিসাব-নিকাশ এখন কেউ করতে চাইলে আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দীর্ঘকাল পরও মুসলিম লীগ শাসকরা বলতেন, দেশটি শিশুরাষ্ট্র। এই শিশুর সমালোচনা যেন কেউ না করে। তার ভালোমন্দের বিচার যেন কেউ না করে। এভাবে শিশুরাষ্ট্রের দোহাই পেড়ে সরকারের কাজের সব সমালোচনা বন্ধ করে তাঁরা ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে থাকতে চেয়েছিলেন।

পাকিস্তান একটি ভুঁইফোঁড় রাষ্ট্র। ধর্মের ভিত্তিতে কৃত্রিমভাবে এই রাষ্ট্রের স্থাপনা। অতীতের মুসলিম লীগ শাসকরা এই রাষ্ট্রের চিরকালের অভিভাবক হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। তাই শিশুরাষ্ট্রের ধুয়া তোলা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তা নয়। দেশটি কৃত্রিমভাবে গঠিত কোনো ভুঁইফোঁড় রাষ্ট্র নয়। বঙ্গ, বাংলা হাজার বছরের পুরনো নাম। বাঙালি জাতি হাজার বছরের পুরনো জাতি। তার রয়েছে হাজার বছরের পুরনো ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি। তবে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে তার অভ্যুদয় নতুন এবং তার স্বাধীনতাও বহুকাল পর আবার অর্জিত।

এই স্বাধীনতা এবং জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতক পর নিশ্চয়ই আমাদের ভালোমন্দ বিচার করার এবং চাওয়া-পাওয়ার একটা হিসাব-নিকাশ করার সময় এসে গেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সমর্থন জুগিয়েছিল বাংলাদেশের মুসলমান। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কৃত্রিমভাবে বাংলা ভাগ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল। পূর্ব বাংলার টাকায় গড়ে ওঠা কলকাতা শহরের ওপর পর্যন্ত দাবি ত্যাগ করেছিল।

কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বুঝতে শুরু করে, তাদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং ধর্মের আবরণে তাদের মাথায় নতুন দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মুখের ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি সবই কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের বাঙালি পরিচয়টুকুও মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য এতটা সীমা ছাড়িয়েছিল যে পূর্ব পাকিস্তানের ক্যাপিটাল (মূলধন) দ্রুত পাচার হচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। নতুন কোনো ক্যাপিটাল গড়ে উঠছিল না। বাংলাদেশের হাজার বছরের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি, উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনামূলক নিকৃষ্ট পণ্যের একচেটিয়া মার্কেট সৃষ্টির জন্য।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বছর না ঘুরতেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি বিদ্রোহী হয়। প্রথমে ভাষার দাবিতে। এরপর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের বিভিন্ন ইস্যুতে। এতকালের বাঙালিয়ানা অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনায় রূপান্তরিত হয় এবং একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম শুরু হয়। প্রথমেই ঘোষণা করা হয়েছিল, এই জাতিরাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হবে চারটি। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

ধর্ম ও ধনবাদ এই দুই ধরনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙেই বাংলাদেশের জন্ম। সুতরাং অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা ও সমাজতন্ত্রকে করা হয়েছিল এই রাষ্ট্রের অন্যতম দুই ভিত্তি। পাকিস্তানে ২২ পরিবারের উলঙ্গ শোষণ ও লুণ্ঠন বাঙালি প্রত্যক্ষ করেছে এবং শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। পাকিস্তানে গণতন্ত্রের বিপর্যয় এবং সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের অভিশাপে জনজীবন কিভাবে পিষ্ট হয়েছে তার অভিজ্ঞতাও তারা লাভ করেছে। তাই গণতন্ত্র ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থার কথা বাঙালি ভাবতে পারেনি এবং এখনো ভাবে না। ধর্মের নামে রক্তাক্ত দাঙ্গা, আত্মঘাতী বিবাদ থেকে বাংলাদেশের মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করেছে যে সব ধর্মের নিরাপত্তা ও সমানাধিকার যে ধর্মনিরপেক্ষব্যবস্থায় বিদ্যমান, সেই ব্যবস্থাই বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম।

আমাদের স্বাধীনতার সনদপত্র, যা ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে মুজিবনগরে পঠিত হয়েছিল, তাতেও রাষ্ট্রের এই চারটি মূল ভিত্তির কথা বলা হয়েছে। এবং ১৯৭২ সালে দেশের সংবিধানেও সন্নিবেশ করা হয়েছিল। এই রাষ্ট্রব্যবস্থাই ছিল বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া এবং এই চাওয়ার ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনকালের সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু জাতির জনকের এই চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতা, সাম্য, গণতন্ত্র ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকার স্থপতি জর্জ ওয়াশিংটন ও আব্রাহাম লিংকন কি কখনো ভাবতে পেরেছিলেন তাঁদের স্বপ্নের আমেরিকায় নিক্সন, রিগ্যান, বুশের মতো চরম প্রতিক্রিয়াশীল, ফ্যাসিবাদী প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় বসবেন এবং সারা বিশ্বকে সংঘাত, অশান্তি ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবেন? বঙ্গবন্ধু ও চার শহীদ জাতীয় নেতা হয়তো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি যে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি আমলের স্বৈরাচারী শাসনে এবং ধর্মান্ধতাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলবে। জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের মতো সামরিক শাসকরা ক্ষমতা দখল করতে পারবেন। ঘাতক জামায়াত আবার সন্ত্রাসীর বেশে রাজনীতিতে ফিরে আসবে। বিএনপি মুসলিম লীগের শূন্য আসন দখল করবে।

বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে গেলে তাই একটু বিভ্রান্তির ঘোরে পড়তে হয়। কোনটি তাঁদের জীবনে সত্য? দীর্ঘকালের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন, না এই স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই সেই স্বাধীনতার ফসলের নিষ্ঠুর লুণ্ঠন? বাংলাদেশের মানুষের সৌভাগ্য, নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মুখেও তার স্বাধীনতা টিকে আছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সুফল সর্বস্তরের জনগণের দুয়ারে পৌঁছতে পারছে না। জনজীবনকে গ্রাস করে ফেলেছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং একটি লুটেরা নব্য ধনী শ্রেণির বেপরোয়া লুণ্ঠন। পাকিস্তান আমলে ছিল সাম্প্রদায়িকতা। এখন হিংস্র ও ভয়াল মৌলবাদ বাংলাদেশকে গ্রাস করতে চাইছে। পাকিস্তানের শোষক ২২ পরিবারের স্থানে বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে নিষ্ঠুর শোষক ২২ হাজার পরিবার।

সুতরাং এই স্বাধীনতাকে বলা চলে আমাদের গৌরব ও অগৌরবের স্বাধীনতা। গৌরব এ জন্য যে একটি সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পেরেছি এবং সেই রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। আর অগৌরবের বিষয় হলো, এই স্বাধীনতার মূল চেতনাকে আমরা সর্বতোভাবে রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের একটি অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চরিত্র গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি, অপশাসন সর্বব্যাপ্ত হয়েছে। সন্ত্রাস ও হিংস্র মৌলবাদের থাবার নিচে দুর্বল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাটি শঙ্কায় কাঁপছে।

এটা অবশ্যই একটা দেশের জন্য বড় ধরনের খারাপ চিত্র। কিন্তু ভালো চিত্র এবং আশার দিকও আছে। সেদিকটি হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামো সব হুমকি ও ষড়যন্ত্রের মুখে এখনো টিকে আছে এবং টিকে থাকার জন্য এখনো লড়াই চালাচ্ছে। ভারত আমাদের চেয়ে অনেক বড় দেশ এবং গণতন্ত্র শক্ত কাঠামোর ওপর দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সে দেশে কট্টর হিন্দুত্ববাদকে মানুষ ভোট দিয়েছে এবং ক্ষমতায় বসিয়েছে। বাংলাদেশে কট্টর মৌলবাদী জামায়াতকে মানুষ ভোট দেয়নি এবং ক্ষমতায় বসায়নি। দীর্ঘকাল পর হলেও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচার ও দণ্ড দেওয়া সম্ভবপর হয়েছে। হেফাজতি অভ্যুত্থান দমন করা হয়েছে। একদিকে বিএনপি-জামায়াতের পৌনঃপুনিক সন্ত্রাসের রাজনীতি এবং অন্যদিকে পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট সুধীসমাজ, একটি শক্তিশালী মিডিয়াচক্র, একজন নোবেলজয়ীর অবিরাম চেষ্টা—এই সম্মিলিত অভিযানকে একটি গণতান্ত্রিক জোট ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছে এবং ক্ষমতায় টিকে আছে।

শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকা নয়, এত বাধাবিপত্তি, দুর্নীতির মধ্যেও দেশকে উন্নয়নের এমন একটি লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে যে সমালোচকরাও স্বীকার করছেন, বাংলাদেশের এমন উন্নয়ন গত ৪০ বছরে কখনো হয়নি। এই কৃতিত্ব হাসিনা সরকারের প্রাপ্য। এই সরকারের অনেক ভুলত্রুটি আছে। ছোট-বড় ব্যর্থতাও আছে। কিন্তু বড় বড় সমালোচকও এখন স্বীকার করেন, এই সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে এখনো ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা। এই শক্তি ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ এত দিনে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো রক্তাক্ত বধ্যভূমিতে পরিণত হতো।

বাংলাদেশে যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ খর্ব হয়েছে তার পেছনে আন্তর্জাতিক কারণও রয়েছে। সারা বিশ্বেই এখন সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির বিপর্যয়ের যুগ চলছে। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো পর্যন্ত তাঁর দেশে ভ্যাটিকানের পোপকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ব্রিটেনে ইসলামী শরিয়া কোর্টকে বেসরকারিভাবে তাদের কার্যক্রম চালানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস একটি তথাকথিত ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে। তার একটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশেও ঘটছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসকরা দেশটিকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পচনশীল লেজুড়ের সঙ্গে বেঁধে ফেলায় তার শিকল থেকে বেরিয়ে আসা কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেও এখন কঠিন। বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী শোষক শ্রেণি গড়ে উঠেছে। তারা দেশের বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার একটি বড় অংশকে কিনে ফেলেছে। তাদের প্রচারশক্তি অসীম। তাদের প্রচারণার সামনে সরকারি প্রচার অসহায়।

তবু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি নিরাশ নই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত নই। কথাটা রেটোরিক বা আপ্তবাক্যের মতো শোনায়। তবু বলছি, ৩০ লাখ মানুষের আত্মদানে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তাকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না। ৪৫ বছর আমরা কাটিয়েছি অনেক ভাঙাগড়ার মধ্যে। তার মধ্যে ভাঙার কাজটা অনেক বড়ভাবে লক্ষ করা গেলেও গড়ার কাজটাও অলক্ষ্যে চলছে। জাতি স্বাধীনতার মাধ্যমে যা চেয়েছে তা হয়তো পায়নি; কিন্তু পাওয়ার চেষ্টা থেকে সে বিরত হয়নি। স্বাধীনতাই তাকে এই পাওয়ার চেষ্টা চালানোর সাহস দিয়েছে।

লন্ডন, সোমবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

মন্তব্য