kalerkantho


মনের কোণে হীরে-মুক্তো

বাংলাদেশে পেশাভিত্তিক নৈতিকতার হালহকিকত

ড. সা'দত হুসাইন   

১৪ মার্চ, ২০১৫ ০০:০০



বাংলাদেশে পেশাভিত্তিক নৈতিকতার হালহকিকত

কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে পেশাভিত্তিক পরিচয় একজন ব্যক্তির জন্য বেশ বড় হয়ে দেখা দেয়। কারো কারো নামের আগে-পিছে পেশার পরিচয়টি এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যায় যে পেশাযুক্ত পুরো নাম উল্লেখ না করলে তাকে চেনা কষ্টকর হয়ে পড়ে। মালেক উকিল, প্রফেসর রেহমান সোবহান, ডা. নূরুল ইসলাম, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, জাস্টিস ইব্রাহিম, জেনারেল ওসমানী, কবি শামসুর রাহমান, শিল্পী জয়নাল আবেদিন, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার রশিদ প্রমুখের নামের সঙ্গে পেশা না লেখা হলে অনেকে তাঁদের যথাযথভাবে চিনতে পারবে না। উপমহাদেশের অনেকে নিজের বা পূর্বপুরুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরনকে তাঁদের নামের পাশে সরাসরি জুড়ে দিয়েছেন; যেমন পালকিওয়ালা, ফার্নিচারওয়ালা, স্বর্ণকার, পাইলট, চাষি, মার্চেন্ট ইত্যাদি। শুধু পেশা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য নয়, ইন্টারনেট থেকে সব পেশা সম্পর্কে সহজেই একটা গ্রহণযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে, এর জন্য আলাদাভাবে কলাম লেখার প্রয়োজন হয় না।

এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রত্যেক পেশাজীবীর জন্য লিখিত বা অলিখিতভাবে তার পেশানির্দিষ্ট নৈতিকতাবিষয়ক যেসব অনুশাসন রয়েছে সে সম্পর্কে সূচনামূলক আলোচনা করা এবং বাংলাদেশে এসব অনুশাসনের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে রেখাপাত করা। সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য নৈতিকতাবিষয়ক কিছু সাধারণ বক্তব্য মাঝেমধ্যে উচ্চারিত হলেও তা এ নিবন্ধের মূল উপজীব্য হবে না; পেশাভিত্তিক নৈতিকতা সম্পর্কিত আলোচনাকে সমৃদ্ধ করার জন্যই তা ব্যবহৃত হবে।

চিকিৎসা পেশা দিয়ে আমরা শুরু করি। ছোটবেলা থেকে দেখেছি যে দুটি পেশার লোক নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি ও দক্ষতা ব্যবহার করে বাজারব্যবস্থার আওতায় তাঁদের সেবার গ্রাহক তথা মক্কেলদের কাছ থেকে সেবার মূল্য সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তার একটি হচ্ছে ডাক্তারি ও অন্যটি হচ্ছে ওকালতি। ডাক্তারের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। নোয়াখালী শহরে মাত্র দুজন পাস করা ডাক্তার অর্থাৎ ডিগ্রিধারী এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন। বাকিরা এলএমএফ বা সার্টিফিকেটধারী ডাক্তার। উকিল-মোক্তারের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। আমরা শুনেছিলাম যে ডাক্তারি পেশার ডিগ্রি পরীক্ষায় (এমবিবিএস) পাস করা খুবই কঠিন কাজ। প্রথমবার পরীক্ষায় কেউ পাস করতে পারে না। পাস করার জন্য কমপক্ষে তিন-চারবার পরীক্ষা দিতে হয়।

এমন কষ্ট করে যাঁকে পাস করতে হয় তাঁর পেশাকে যে যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্মান দিতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া ডাক্তারি পেশাটি এমন যে এখানে একজন রোগী, যিনি ডাক্তারের মতোই একজন মানুষও বটে, বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁর বাঁচা-মরার প্রচেষ্টা বা কেস ডাক্তারের হাতে সঁপে দিয়ে আশ্বস্ত হন। তাঁর শরীরের প্রাসঙ্গিক যাবতীয় তথ্য, বিশেষ করে আক্রান্ত অংশের সমুদয় সক্ষমতা ও দুর্বলতা অকপটে ডাক্তারকে অবহিত করেন। এ ব্যাপারে কোনো লজ্জা, গোপনীয়তা বা আড়ষ্টতার অজুহাত তোলার অবকাশ নেই। রোগীর বয়স যত বেশি হোক কিংবা তাঁর সামাজিক বা সাংগঠনিক মর্যাদা যত উঁচুস্তরের হোক না কেন, একজন তরুণ ডাক্তার চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁর দেহের যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করে দেখার অধিকার রাখেন। এ প্রসঙ্গে একটি চটুল গল্প মনে পড়ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি পদোন্নতি কমিটির সভায় আমাদের এক যুগ্ম সচিব বন্ধু গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন স্বাস্থ্যসচিব, যিনি চাকরির অভিজ্ঞতা ও বয়স দুই দিক থেকেই বেশ সিনিয়র। ডাক্তারদের পদোন্নতির প্রস্তাবের ওপর আমাদের বন্ধু যৌক্তিকভাবে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন যেহেতু যৌক্তিক ছিল, তাই মিটিংয়ে এর বিপক্ষে কিছু বলা সম্ভব ছিল না। তবে এর ফলে বহুসংখ্যক ডাক্তারের পদোন্নতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল, যা প্রশাসনিক দিক থেকে স্বাস্থ্যসচিবের জন্য ছিল বিব্রতকর। এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রত্যুৎপন্নমতি সচিব আমাদের বন্ধুকে সভাকক্ষের এক কোনায় ডেকে নিলেন এবং তাঁর পিঠে আলতো হাত রেখে চুপিসারে বললেন যে ডাক্তারদের কেসগুলো সাধারণভাবে দেখলে চলবে না, এগুলো একটু ব্যতিক্রমী দৃষ্টিতে ভিন্নভাবে দেখতে হবে। কারণ হিসেবে তিনি বললেন যে একজন তরুণ ডাক্তার বয়সে যে হয়তো বা তাঁর ছেলের সমান হবে, চিকিৎসা করতে এসে তাঁর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেভাবে নাড়াচাড়া-ঘাঁটাঘাঁটি করেন, মুরব্বি পর্যায়ের নিকটাত্মীয়স্বজনও কখনো এর আশপাশে যেতে সাহস করবে না। সচিবের শব্দচয়ন এমন নিরেট দেহতাত্ত্বিক ছিল যে তা এখানে উল্লেখ করা যাবে না। তবে তাঁর অনুরোধ ছিল অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। আমাদের যুগ্ম সচিব বন্ধুটি সে অনুরোধে সাড়া দিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক ডাক্তারের পদোন্নতির পথ সুগম করেছিলেন। সচিব মহোদয় সে যাত্রায় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন।

অতি প্রাচীনকাল থেকে চিকিৎসা পেশার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কিছু নৈতিক অনুশাসন জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে হিপোক্রিটসের ১০ অনুশাসন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১০ অনুশাসনের কোনোটি উপেক্ষা করার মতো নয়। এসব অনুশাসনের আলোকে আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছি যে একজন ডাক্তারের কাছে রোগীই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রোগীর মধ্যেই তিনি যেন তাঁর প্রভুকে দেখতে পান। সে যেন প্রভুর প্রতিনিধি হয়ে তাঁর কাছে ধরা দিয়েছে। উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত তাঁর লেখায় প্রাঞ্জল ভাষায় এরূপ কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এর কার্যার্থক তাৎপর্য দাঁড়ায় রোগীর একমাত্র পরিচয় সে একজন অসুস্থ ব্যক্তি; তার চিকিৎসা করতে হবে। রোগী যদি শত্রুপক্ষের লোক হয় ও ডাক্তারের নিজের পক্ষের অতি আপনজনদের আক্রমণে আহত হয়ে থাকে, তবু ডাক্তারকে নির্দ্বিধায় তাকে সরল মনে সর্বোচ্চ সহমর্মিতা দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য নিজের আরাম-আয়েশ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর গোষ্ঠীর সুবিধা, আপনজনের চাপ ও নিজের জীবনের যাবতীয় বিপত্তি উপেক্ষা করে শত্রুপক্ষীয় রোগীর চিকিৎসার স্বার্থে ডাক্তারকে প্রয়োজনবোধে বড় রকমের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব্ব সম্পাদনে এগিয়ে যেতে হবে। এর থেকে বিন্দুমাত্র নড়চড় পেশাগত নৈতিকতার প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনের শামিল হবে। এ রকম পরিস্থিতির উল্লেখ করা যায়, যেখানে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ডাক্তারকে রোগীর জীবন রক্ষায় নির্ভীকভাবে এগিয়ে যেতে হয়। সে জন্যই তিনি ডাক্তার। অন্যদের চেয়ে আলাদা।

আজ যখন দেশে রোগীর চিকিৎসায় ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অবহেলা, অবজ্ঞা অথবা নিষ্ঠুরতার অভিযোগ ওঠে তখন তা প্রতিজন নাগরিককে হতাশ ও ব্যথিত করে। রোগীর আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির তারা হৈ-হুল্লোড় করে, ভাঙচুর করে, মারামারি করে। ডাক্তাররাও প্রত্যুত্তরে মারামারি ও ধর্মঘটে লিপ্ত হন। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে রোগী না দেখে সার্টিফিকেট দেওয়া, মিথ্যা সার্টিফিকেট দেওয়া, ফরেনসিক-ভিসেরা রিপোর্ট না দেওয়া বা বিলম্বে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ কেসেও কোর্টে গিয়ে সাক্ষ্য না দেওয়া এবং সর্বোপরি সাধারণ রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এসবই দুঃখজনক এবং ডাক্তারি পেশার জন্য প্রযোজ্য নৈতিকতার পরিপন্থী।

এরপর আসি বিচারকের জন্য নির্দিষ্ট নৈতিকতা প্রসঙ্গে। বিচারক বলতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ভূমি বোর্ডের সদস্য, কো-অপারেটিভের রেজিস্ট্রার ও আধা জুডিশিয়াল কোর্টের সিদ্ধান্তদাতা থেকে শুরু করে নিম্ন ও উচ্চ আদালতের বিচারককে বোঝানো হচ্ছে। সভ্যতার প্রায় আদিলগ্ন থেকে বিচারালয়কে নাগরিকের শেষ ভরসা ও আশ্রয়স্থল হিসেবে গণ্য করা হয়। যখন দেশের সব প্রতিষ্ঠান বিনষ্ট হয়ে যায় তখনো সুনাগরিকরা শেষ ভরসা হিসেবে বিচারকের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রায় সব ধর্মীয় অনুশাসনে বিচারকের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে বিচারককে ন্যায়পরায়ণতার প্রতি নিবেদিত থাকার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। প্রায় সব সমাজের ও বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশেও বিচারকদের নাগরিকরা তাদের মূল্যায়নে সুউচ্চ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে। চাকরির প্রথম জীবনে বিচারিক হাকিমের কাজ করার কারণে আমি নিজেও এ জন্য গর্ব অনুভব করি। অন্যায়কারী আপনজন, এমনকি সন্তান হলেও সুবিচারের আওতায় তাকে শাস্তি পেতে হবে, এই হচ্ছে বিচারকের জীবনের মূলমন্ত্র। হজরত ওমর (রা.) হবেন তাঁদের আদর্শ পুরুষ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, 'তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করিবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করিবে।' (সুরা নাস, আয়াত ৫৮) আপনজন বাদী বা বিবাদী হলে সে মামলা নিজের কোর্ট থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার ভূরি ভূরি নজির এ উপমহাদেশের বিচারাঙ্গনে রয়েছে। One cannot be the judge of his own cause- এ নীতি বিচারাঙ্গনে কঠোরভাবে অনুসরণীয় বলে অনেক বিজ্ঞ লোক মনে করেন। ব্যক্তিগত অনুরাগ, বিরাগ ও সখ্য যেন বিচারকাজে নির্মোহতা ও নিরপেক্ষতাকে ব্যাহত না করে সে জন্য সামাজিক পর্যায়ে অবাধ মেলামেশা ও গণ-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ওপর স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ মেনে চলা কষ্টকর। কিন্তু বিচারের গুণগত মান রক্ষার্থে মাননীয় বিচারকরা এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ যথাসম্ভব মেনে চলতে চেষ্টা করেন।

বিচারকাজের দুটি অংশ রয়েছে : Procedural ও Substantive. শেষোক্ত অংশের (Substantive part) ব্যাপারে আমাদের সমাজে বিশেষ ওজর-আপত্তি নেই। যা আছে, তা-ও আপিল-রিভিউর মাধ্যমে নিরসনযোগ্য। তবে Procedural অংশ, যেমন জামিন, রিমান্ড, কেসের তারিখ নির্ধারণ, পরওয়ানা-সমন জারি ও সামগ্রিকভাবে মামলা ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে পর্যবেক্ষক ও মামলা সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের একাংশের মধ্যে কখনো কখনো অসন্তুষ্টি লক্ষ করা যায়। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় প্রকাশ পাওয়া এ ধরনের অসন্তুষ্টি নিতান্তই তাদের ব্যক্তিগত অনুধাবন। তাদের বক্তব্য অবশ্য সর্বসম্মত নয়, এ ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর বিধায় এ ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি মন্তব্য না করাই সমীচীন হবে। বিচারকদের জন্য নির্দিষ্ট নৈতিক অনুশাসনগুলো বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা ভাবাক্ষরে মেনে চললে বিচারালয়ের ভাবমূর্তি অধিকতর সমুন্নত হবে। উল্লেখ্য, আইনজীবীদের পেশাভিত্তিক নৈতিকতা মাননীয় বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়াকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। আইনজীবীদের পেশাগত সংগঠন ও বিচারকরা একযোগে ব্যবস্থা নিয়ে আইনজীবীদের পেশাভিত্তিক নৈতিক অনুশাসন মেনে চলতে উৎসাহিত করতে পারেন।

নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য লিখিত ও অলিখিত বেশ কিছু নৈতিক অনুশাসন রয়েছে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নিরপেক্ষতা, দায়িত্ববোধ, আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য, জনস্বার্থের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা, লক্ষণীয় আত্মমর্যাদাবোধ, অসহায়-দুঃখী মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, সর্বোপরি রাষ্ট্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষার লক্ষ্যে একাগ্রতা প্রদর্শন নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য অবশ্য পালনীয় নৈতিক অনুশাসন হিসেবে এত দিনে সর্বমহলে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি উপর্যুক্ত অনুশাসন মেনে পেশাভিত্তিক নৈতিকতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে পারেন, তবে সাধারণ নাগরিকের দুঃখকষ্ট বহুলাংশে হ্রাস পাবে। সরকারের কর্মসূচি পালনকালে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা বজায় রাখলে জনগণের দুঃখকষ্ট না বাড়িয়ে, তাদের ক্ষতিসাধন না করেও কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা যায়। এখানে দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব মেধা, যোগ্যতা ও পারফরমেন্সের ওপর ভর করে এগিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ হলে সেই নির্বাহীকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। উত্তরণ তাঁর হবেই।

বাংলাদেশে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের গরিষ্ঠ অংশ পেশানির্দিষ্ট নৈতিক অনুশাসন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে বলে মনে হচ্ছে। ন্যায়পরায়ণতা, নিরপেক্ষতা, পেশাদারি আচরণ ও পারফরমেন্সকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না। এর পরিবর্তে তাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে তালাফি, তদবির, তাঁবেদারি, মোসাহেবি। লম্বা ব্যাচের নিচের দিকে অবস্থানকারী কর্মকর্তাদের অনেকে ওপরের দিকে অবস্থানকারী মেধাবী কর্মকর্তাদের অনৈতিকভাবে ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছেন। তাঁরা আঞ্চলিকতা, অপরাজনীতি, এমনকি সরাসরি আর্থিক দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন বলেও শোনা যায়। কর্মক্ষেত্রে তাঁরা দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আইনানুগ দায়িত্ব্ব পালন না করে অতিকথন, নৈতিকতাবিবর্জিত আচরণ ও গণদ্রোহী পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রকারান্তে নিয়ন্ত্রণকারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, এমনকি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেন। প্রকৌশলী, বন, ভূমি প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, পরিবহন ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আধিকারিকদের বিরুদ্ধে পেশানির্দিষ্ট নৈতিকতাপরিপন্থী আচরণের প্রভূত ঘটনা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের রাজস্ব আহরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভৌত অবকাঠামোর গুণগত মান ও জনস্বার্থ সম্পৃক্ত শৃঙ্খলা এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পেশাভিত্তিক নৈতিকতা উৎকটভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে ব্যাংকিং, ইনস্যুরেন্স, বিনিয়োগ, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট ও শেয়ার ব্যবসার ক্ষেত্রে। নির্বাহীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড এসব খাতে বড় বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে যুক্ত হয়েছে নিরীক্ষকদের দুর্নীতি ও পেশাপরিপন্থী অনৈতিক আচরণ। কতিপয় নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা সংস্থার অনৈতিক কর্মকাণ্ড সেবার গ্রাহকদের আস্থা চুরমার করে দিয়েছে। একটি মর্যাদাবান ও অত্যাবশ্যকীয় পেশা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এ অবস্থার অবসান দ্রুত কাম্য। কর্ম সম্পাদনে পেশাভিত্তিক নৈতিকতা শতভাগ নিশ্চিত করে নিরীক্ষা পেশার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা (Credibility) ফিরিয়ে আনতে হবে।

নৈতিকতার সর্বজনীন অনুশাসন একটি বিরাট ক্যানভাসে প্রসারিত। ভেবেছিলাম পেশাভিত্তিক অনুশাসনের বিষয়টি ছোট্ট পরিধিতে আলোচনা করা সম্ভব হবে। এখন দেখতে পাচ্ছি, পৃথিবীতে এত পেশা রয়েছে যে শুধু পেশাভিত্তিক নৈতিকতার ওপর একটি বিরাট আকারের নিবন্ধ রচনা করা যেতে পারে। এ লেখার কলেবর বৃদ্ধি না করে এই বলে ইতি টানতে চাই যে আমরা যেন নিদেনপক্ষে নিজ পেশার নৈতিক অনুশাসনগুলো মেনে নিজের জীবন ও জীবিকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। শুনেছি, চোর-ডাকাত, গুণ্ডা-মস্তানরাও নাকি পেশাভিত্তিক নৈতিকতা মেনে চলতে চেষ্টা করে। আমরা শিক্ষিত নাগরিকরা তার নিচে নামব কেন?

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান


মন্তব্য